তিক্ত হলেও সত্য

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর ‘ক’ ইউনিটে সমন্বিতভাবে পাশের হার মোট পরীক্ষার্থীর ১৩.০৫ শতাংশ। আবার ‘চ’ ইউনিটে পাশের হার ২.৫ শতাংশ। ভর্তি পরীক্ষায় পাশের এই হার যে কোনো সচেতন মানুষকে উদ্বিগ্ন করবে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় যারা অংশগ্রহণ করে, তারা মেধাবী ছাত্র হিসেবে স্বীকৃত। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সাফল্যের ধারাবাহিকতায় তারা সেখানে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়। তাই ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ফলাফলের এমন বিপর্যয় কেন ঘটছে, তা ভাববার বিষয়।

বিগত এক যুগে শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত বিশ্বের আদলে অনেকবারই পরিবর্তন করা হয়েছে। কখনো এমসিকিউ, কখনো সৃজনশীল ধারণা যুক্ত করে আমরা শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করেছি। কিন্তু এখনো আমরা নিশ্চিত নই যে কোন ব্যবস্থাটি আমাদের সংস্কৃতি, সমাজ ও জনসংখ্যার বিচারে সঠিক। আমার ছেলে এসএসসি টেস্ট পরীক্ষা দিচ্ছে। অঙ্ক পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে এসে বলল, ‘বাবা আমার এক বন্ধু ৩০টি এমসিকিউর মধ্যে প্রথম আটটিতে ‘এ’ অপশনে, দ্বিতীয় আটটিতে ‘বি’ অপশনে, তৃতীয় আটটিতে ‘সি’ অপশনে এবং বাকি ছয়টিতে ‘ডি’ অপশনে টিক দিয়েছে।’ দুর্বল জ্ঞান নিয়ে পাশ করার জন্যই তার এমন লটারি। বিভিন্ন পাবলিক, নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করা ঠেকাতে অনেক প্রতিষ্ঠানই এমসিকিউ প্রশ্নের ধারণা থেকে সরে এসে বর্ণনামূলক প্রশ্নের প্রবর্তন করছে। আমার পরিচিত একজন অভিজ্ঞ অঙ্ক শিক্ষক দুঃখের সঙ্গে বললেন, আজকাল স্কুলের বড়ো ক্লাসে অঙ্ক করানো যায় না। বোর্ডে অঙ্ক করাতে গেলেই পেছনে কথা বলে বা শব্দ করে। বারবার নিষেধ করলেও শোনে না। এর প্রতিকার কী? সবাইকে প্রতিকার নিয়ে ভাবতে হবে। অন্যথায় শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মানের পরিসমাপ্তি ঘটবে।

শিক্ষা বা অন্য কোনো বিষয়ে পরিবর্তন, পরিবর্ধনের জন্য আমরা সব সময় অনুসরণ করতে চাই ধনী দেশগুলোকে। এখানেই আমাদের মস্ত ভুল। কারণ দেশের উন্নয়নের জন্য দরকার জাতিকে সঠিক পথে পরিশ্রমী ও দক্ষ করার মাধ্যমে ধনী হওয়ার চেষ্টা করা। কিন্তু আমরা সেখানে চেষ্টা করি কোনো ধনী জাতির আয়েশি জীবনযাপন কপি করতে । কোনো দেশের জীবন পদ্ধতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জৌলুস অনুকরণের আগে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো জাতিটির প্রযুক্তিগত ও শিল্পায়নভিত্তিক উন্নয়ন বিবেচনা করা। পশ্চিমা বিশ্বের এমন অনেক দেশ আছে, যার জনসংখ্যা কম এবং আয়তনে বিশাল। খনিজ আকরিকের অফুরন্ত মজুত। খনিজ আকরিক বিক্রি করেই রপ্তানি আয়ের অধিকাংশ আসে। এরপর রয়েছে শিক্ষাব্যবসা, ট্যুরিজম এবং মাংস ও দুধের উত্পাদন। কিন্তু ভারী শিল্প বলতে যা বোঝায়, তা উল্লেখ করার মতো নয়, যা দুই-একটা শিল্প ছিল, সেগুলোও চীনের বাণিজ্য আগ্রাসনে মৃতপ্রায়। অথচ অর্থনৈতিক কারণে এবং কম জনসংখ্যার জন্য দেশটিতে জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত। কর্মহীন মানুষকে সেখানে বেকার ভাতাও দেওয়া হয়। এমন দেশটির জৌলুস দেখে উন্নত দেশের কাতারে ফেলে যদি আমরা একে অনুসরণ করতে যাই, তাহলে আমাদের মহাসর্বনাশ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেসব দেশে স্কুলশিক্ষা নিয়ে সেখানকার স্কুলশিক্ষকদের অভিযোগের অন্ত নেই। ছাত্রছাত্রী ক্লাসে হোমওয়ার্ক করে না গেলেও কিছু বলার উপায় নেই। স্কুল, কলেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রত্যয়ী শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারছে না। ফলে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি শিক্ষার্থীনির্ভর হয়ে পড়ছে। ডাক্তারি পেশায় দেশটিতে বেতন সবচেয়ে বেশি। স্কুল, কলেজের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ডাক্তারি পড়ার জন্য মনোনীত হয়। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই সেক্টর চলে যাচ্ছে চাইনিজদের হাতে। প্রতি বছর যত শিক্ষার্থী ডাক্তারি পড়ছে, তার ৯৬ শতাংশ চাইনিজ। আমার স্কুল ও কলেজ জীবনের সহপাঠী আমেরিকার ডেলওয়্যার ইউনিভার্সিটিতে একটি বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান। তার এক ছেলের বয়স ১০, অপরটির বয়স ৮ বছর। তিনি বলেন, আমেরিকার অবস্থাও ইউরোপের মতোই হবে। উন্নয়ন স্থির হয়ে যাবে। চাইনিজরা যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে ১৫ বছর পর আমেরিকায় চাকরি পেতে হলে চাইনিজ ভাষা জানতে হবে। তাই আমি আমার ছেলেকে বিদেশি ভাষা হিসেবে চাইনিজ ভাষা শেখাচ্ছি।

আমার চার সহোদর ভাই কানাডায় থাকেন। তারাও একমত যে চাইনিজরা অনেক বেশি এগোচ্ছে। কানাডায় চাইনিজরা এত বেশি বাড়ি কিনছে যে কানাডিয়ান সরকার বাড়ি কেনার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করা শুরু করেছে। তাদের শঙ্কা, চাইনিজ জনগোষ্ঠী সংখ্যায় বেশি হয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের উচিত অনুসরণ করা সেই শিক্ষাব্যবস্থা, যাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো পিছিয়ে পড়ছে। বিশ্লেষণ করা উচিত কী আছে তাদের শিক্ষাব্যবস্থায়, যার ক্যারিশমায় চাইনিজরা হয়ে উঠেছে দ্বিগ্বিজয়ী জাতি?

ঔপনিবেশিক শাসনামলের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার ক্ষেত্রে গ্রহণ করতে হবে সঠিক পদ্ধতি। এমন কিছু নয়, যা আমাদের একমাত্র সম্পদ মানবসম্পদকে দক্ষ করার পরিবর্তে দুর্বল ও আয়েশি করে তোলে। আফ্রিকার সবচেয়ে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা, যার সিংহদ্বারে লেখা রয়েছে—‘কোনো জাতিকে ধ্বংস করার জন্য পারমাণবিক হামলা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দরকার নেই। বরং সেই জাতির শিক্ষার মানকে খর্ব করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় প্রতারণার সুযোগ দিলেই হবে। কারণ এইভাবে পরীক্ষা দিয়ে তৈরি হওয়া ডাক্তারদের হাতে রোগীর মৃত্যু হবে, ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা দালানকোঠা, ইমারত ধ্বংস হবে এবং অর্থনীতিবিদদের দ্বারা দেশের আর্থিক খাত দেউলিয়া হবে। এছাড়া বিচারকদের হাতে বিচারব্যবস্থার কবর রচনা হবে। সুতরাং শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়া মানে হলো একটি জাতির অবলুপ্তি।’

n লেখক : অধ্যাপক