বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান

হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন তাঁর মাতার নাম মোসাম্মত্ কায়সুন্নেসা এবং পিতার নাম আক্কাস আলী মণ্ডল তিনি খালিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীতে স্থানীয় একটি নৈশবিদ্যালয়ে খুব সামান্য লেখাপড়া শেখেন দিনমজুর পিতার দারিদ্র হামিদুর রহমানের পড়াশুনার জন্য অনুকূলে ছিল না পিতা আক্কাস আলী মণ্ডল ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পৈত্রিক ভিটা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার চাপড়ার ডুমুরিয়া গ্রাম ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসেন দিনমজুরি করে অন্যের ঘরদুয়ার বেধে দিতেন তিনি একটু বয়স হলে হামিদুর রহমান নিজেই পূর্ণাঙ্গ দিনমজুর হয়ে গেলেন

এরপর তিনি আনসার বাহিনিতে যোগ দেন ১৯৭০ সালের শেষ দিকেআনসার বাহিনি ছেড়ে দিয়ে ১৯৭১এর ২ ফেব্রুয়ারি সিপাহি হিসেবে যোগদান করলেন হামিদুর চট্টগ্রামে পাঠানো হলো তাঁকে প্রশিক্ষণের জন্য ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে তাঁর সৈনিক নম্বর বিএসএস নং ৩৯৪৩০১৪

তখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভাঙ্গাগড়ার খেলা চলছে পাকিস্তানি শাসকরা ছলে-বলে কৌশলে বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে চাইছে ৭ কোটি বাঙালিকে দাবায়ে রাখতে পারবা না, বলে দিয়েছেন বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

পাকিস্তান সেনাবাহিনি প্রধান জেনারেল হামিদ খান চট্টগ্রামে এসে ২০ বালুচ রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফাতমির সাথে শলাপরামর্শ করেন, কী করে বাঙালি সৈনিকদের হত্যা করা যায় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সকল সৈনিকদের অস্ত্রাগারে অস্ত্র জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হয় বাঙালি অফিসাররা বিষয়টা বুঝে ফেলে তখন হঠাত্ করেই লেফটেন্যান্ট ফাতমির নির্দেশে বাঙালি সেনা ও অফিসারদের হত্যা করতে শুরু করে পাকসেনারা সেই সময় হামিদুরও ব্যারাকে ছিলেন জীবন বাঁচাতে আরও কয়েকজনের সাথে ব্যারাকের পশ্চিমপাশের জঙ্গলঘেরা পাহাড়ে আশ্রয় নেন তিনি সেদিন এক হাজারের ওপর বাঙালি সেনাকে হত্যা করা হয়

পরদিন তিনি পাহাড়ের অন্যপাশ দিয়ে নিচে নামতে থাকেন এরপর অন্য কোনও যানবাহন না পেয়ে হাঁটতে থাকেন বাড়ির দিকে দশদিন হেঁটে বাড়ি ফিরে এলেন রাস্তায় দেখলেন সারা দেশেই পাকবাহিনির বর্বরতার চিহ্ন

বাড়িতে মায়ের সাথে দেখা করে পরদিনই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন আসার সময় মাকে বলে আসেন, ঈদে খরচ পাঠাব, কোনও চিন্তা করো না আর তোমরা এখান থেকে কোথাও যেও না, আমি যেন ফিরে এসে এখানেই দেখি

হামিদুর রহমান যোগ দিলেন মুক্তিযুদ্ধে বাড়ি থেকে বের হয়ে চৌগাছা ইপিআর এর ৪নং উইংএর একটা কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করলেন একদিন লেবুতলা অপারেশনে যাবার সময় হামিদুরকে সঙ্গে নেয়া হলো লেবুতলা চৌগাছা থেকে আট মাইল দূরে সেই অপারেশনে সাহসের সাথে যুদ্ধ করলেন হামিদুর পাকবাহিনির প্রায় পঞ্চাশজনের মতো সৈন্য নিহত হয় সেইদিন সেই সময় সি কোম্পানির দায়িত্ব দেয়া হয় লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমকে তিনিও বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সফলভাবে পরিচালনা করেন ২১ সেপ্টেম্বর এই কোম্পানি রৌমারী-কোদালকাঠি সীমান্তে অবস্থান নেয় এর কাছেই পাকবাহিনির অবস্থান তারা ভারি অস্ত্রসহ মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ করে সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে হামিদুর সবার আগে এগিয়ে গেলেন গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলেন তাঁকে দেখে অনেকের মনোবল বেড়ে গেল এবং পাকবাহিনিকে পিঁছু হটতে বাধ্য করল এতে করে হামিদুরের সাহসিকতার পরিচয় সবার সামনে উন্মোচিত হলো এবং কমান্ডারসহ সবাই তাঁকে বাহবা দিতে থাকলেন হামিদুর রহমান বিষ্ময়বালক হিসেবে সবার সামনে পরিচিত হলেন সি কোম্পানির এক দুর্ধর্ষ সৈনিকরূপে আত্মপ্রকাশ করলেন তিনি

সিলেট জেলার শ্রীমঙ্গল থানার ধলই চা বাগানের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত ধলই আউটপোস্ট এই চা বাগানটি পূর্ব পাকিস্তানের শেষ সীমায় অবস্থি্ত সেখানে ছিল ইপিআর ক্যাম্প যুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানি সেনারা এই ক্যাম্পে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে এই ঘাঁটি অত্যন্ত শক্তিশালি ছিল মুক্তিবাহিনির জওয়ানরা অনেক উদ্যোগ নিয়েও তা দখল করতে পারেনি ধলই চা বাগান থেকে ভারতীয় সীমান্ত প্রায় এক কিলোমিটার

ধলই সীমান্তে একটু দূরে দূরেই প্রায় শখানেক বাংকার তৈরি করেছিল পাকবাহিনি এর মধ্যে দুটো বাংকার এখনও বিজিবি যত্ন করে সংরক্ষণ করে রেখেছে

ধলই চা বাগানে সেখানে অসংখ্য মা-বোনদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো সেই সকল মা বোনদের ত্যাগের বিনিময়েই আমাদের এ স্বাধীনতাবাগানের পাশ দিয়ে ধলই নামে একটি নদী বয়ে চলেছে ওপারে ভারতীয় ভূখণ্ড এবং ভারতের একটি সীমান্ত চৌকির কাছেই মুক্তিবাহিনির কমলপুর সাবসেক্টর ক্যাম্প আর এদিকে পাকবাহিনির বিরাট বহর এবং মজুদ অস্ত্রশস্ত্র কাজেই অবস্থানগত এবং সামরিক দিক দিয়ে ধলই চা বাগানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে মুক্তিবাহিনির কাছে প্রতীয়মান হয় আর তাই মুক্তিবাহিনির সামরিক অফিসাররা এই বাগান আক্রমণ করে পাকসেনাদের কাছ থেকে নিজেদের দখলে নেবার পরিকল্পনা করেন

প্রথম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট তখন মেজর জিয়াউর রহমানের জেড ফোর্সের অধীনে প্রথম ইস্টবেঙ্গল ব্যাটালিয়নে চারটি কোম্পানি এ, বি, সি ও ডি কোম্পানি সি কোম্পানির কমান্ডার ক্যাপ্টেন আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী

সি কোম্পানির ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয় ধলাই অপারেশনের দীর্ঘ পাঁচদিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলে ধলই চা বাগানে এতে পাকবাহিনির ৩০ তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টের প্রায় দুই কোম্পানি সৈন্য (প্রায় ২০০জন) নিহত হয় এবং বহু সৈন্য আহত হয়

১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে গঠিত দলটির নেতৃত্ব দেয়া হয় ক্যাপ্টেন আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীকে অনেক চিন্তা-ভাবনা পরিকল্পনার পর ঠিক হলো ২৮ অক্টোবর ধলই চা বাগানে আক্রমণ রচনা করা হবে ২৭ অক্টোবর রাতের খাবার খেয়ে দশটার পর মুক্তিযোদ্ধারা রওয়ানা হলেন সামনে নিয়মিত বাহিনি, পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরাট বাহিনি এই বাহিনির নেতৃত্বে কমলপুরের সহকারী ক্যাম্প কমান্ডার সাজ্জাদুর রহমান

শত্রুর কাছাকাছি পৌঁছালেও ঘন কুয়াশায় চারদিক আচ্ছাদিত থাকায় আক্রমণ শুরু করা সুবিধাজনক মনে হচ্ছে না ক্যাপ্টেন কাইয়ুম হাবিলদার মকবুলকে একটি গাছের ওপর উঠে শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে বললেন মকবুল গাছে চড়ে পরখ করতে গেলেন তখন সম্ভবত পাকবাহিনিও ক্যাম্প থেকে তাঁকে দেখে ফেলে ফলে মকবুল গাছ থেকে নামতেই হঠাত্ করে পাকিস্তানি সৈন্যরা আক্রমণ শুরু করে প্রচণ্ড গোলার আঘাতে চারদিকে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় ডিফেন্স নিয়ে ক্যাপ্টেন কাইয়ুম ওয়্যারলেসে গোলন্দাজ বাহিনির সাহায্য চাইলেন, যাতে শত্রুর লক্ষ বদল হতে পারে গোলন্দাজ বাহিনি সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে শত্রু অবস্থানের ওপর কামানের গোলা নিক্ষেপ করল এর ফলে শত্রুঘাঁটিতে আগুন ধরে যায়

এদিকে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম একপ্লাটুন ডানে, একপ্লাটুন পেছনে এবং একপ্লাটুন বামে সাজিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলেন শত্রুপক্ষের গুলিবর্ষণ থেমে যেতেই ঘাঁটির ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু হলো শত্রুরাও মরণপণ প্রতিআক্রমণ করতে লাগল তারা আগেই ভূমি মাইন পুঁতে রেখেছিল মাইনের বিস্ফোরণের আঘাতে মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় মুক্তিযোদ্ধারা দমে না গিয়ে দ্বিগুণ উত্সাহে ঝাপিয়ে পড়লেন প্রাণের মায়া তুচ্ছ কিন্তু একেবারে কাছে গিয়েও তাঁরা ঘাঁটি দখল করতে পারছেন না ঘাঁটির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটি এলএমজি পোস্ট থেকে অনবরত গোলা আসছে সেই মেশিনগান নিষ্ক্রিয় করতে না পারলে চূড়ান্ত বিজয় সম্ভব হবে না অধিনায়ক কাইয়ুম হামিদুর রহমানকে ডেকে বললেন-ওই এলএমজিটা থামাতে হবে

অদম্য সাহসী বীর হামিদুর বুকে হেঁটে ক্রলিং করে শত্রুর চোখ ফাঁকি দিয়ে মেশিনগান পোস্টটির কাছে পৌঁছে গেলেন

হামিদুর বুকে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছেন তাঁর সামনে, পেছনে, ডানে বাঁয়ে, মাথার ওপর দিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি ছুটছে তিনি ভয় পাচ্ছেন না তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ওই এলএমজি পোস্টে পৌঁছানো নিশ্চিত মৃত্যুর হাতছানি তার মনোবলকে দমাতে পারছে না তিনি তো বাড়ি থেকে বের হবার সময় মাকে কথা দিয়ে এসেছিলেন-দেশকে শত্রুমুক্ত করে তবেই বাড়ি ফিরবেন কাজেই আর কিসের ভয় শত্রুকে তো নিশ্চিহ্ন করতেই হবে পাহাড়ি খালের মধ্যদিয়ে বুকে হেঁটে গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ শুরু করলেন তিনি দুটি গ্রেনেড এলএমজি পোস্টে আঘাত হানে এক পর্যায়ে তিনিও গুলিবিদ্ধ হন কিন্তু নিজের দিকে খেয়াল দেবার তাঁর এতোটুকুও সময় নেই লক্ষ একটাই, এলএমজি পোস্ট আরও একটু কাছে গিয়ে পোস্টের পিছনে থাকা পাকবাহিনির দুইজন সৈনিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি হাতাহাতি যুদ্ধের বদৌলতে এলএমজি থেকে গোলাবর্ষণ বন্ধ হয়ে গেল সেই সুযোগে মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে এসে সীমানা ফাঁড়িটি দখল করতে সমর্থ হন এবং এই দুইজন আহত পাক সৈন্যকে গ্রেফতার করেন কিন্তু হামিদুর রহমানকে আর জীবিত উদ্ধার করা যায়নি তিনি হাতাহাতি যুদ্ধেই মৃত্যুবরণ করেন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁর এই সাহসী লড়াই সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় এবং বাঙালি জাতি যে বীরের জাতি, তা স্বীকার করে নিতে বাধ্য করেসহযোদ্ধারা হামিদুর রহমানের মৃতদেহ সীমান্তের অল্পদূরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আমবাসা গ্রামে দাফন করেন

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ,সিলেট

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x