গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান: আলবার্ট আইনস্টাইন

গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান: আলবার্ট আইনস্টাইন
আলবার্ট আইনস্টাইন

অণু বলল-বাবা এবার আইনস্টাইন সম্পর্কে বলো।

নীলকান্তবাবু বললেন-আলবার্ট আইনস্টাইন ১৪ মার্চ ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির উলম শহরে জন্মেছিলেন এবং ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়।

বিন্দু বলল-কিন্তু তাঁর ছেলেবেলার কথা তো আমরা জানি না।

হ্যাঁ বলছি, বললেন নীলকান্তবাবু। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে পিতা হেরম্যান আইনস্টাইন মা পলিনসহ মিউনিখ শহরে চলে আসেন। সেখানে একটি বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা স্থাপন করেন। আলবার্ট আইনস্টাইন মিউনিখ শহরে কয়েকটি বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। সঙ্গীতেও তালিম নিয়েছিলেন তিনি। একটা বেহালা তার সাথে থাকত বড় হবার পরেও।

সঙ্গীতের কথা শুনে রেখা খুশি হলো। বলল-আইনস্টাইন কি ছোটবেলা থেকেই ভালো ছাত্র ছিলেন?

মোটেই না, বললেন নীলকান্তবাবু। স্কুলের শিক্ষদের কাছ থেকে প্রায়ই অভিযোগ আসত এই অমনোযোগি ছাত্র সম্পর্কে। ক্লাসে কেউ তার সঙ্গী ছিল না। সবসময় পিছনের বেঞ্চে গিয়ে বসে থাকতেন। শুধু তাই নয়, তার জন্য অন্যরাও মনোযোগি হতে পারত না। তাই স্কুল শেষে তাঁর সাজা হতো। পনের বছর বয়সে ইতিহাস, ভূগোল এবং ভাষাতত্ত্বে যথেষ্ট খারাপ গ্রেড নিয়ে এবং কোনও ডিগ্রি না নিয়েই স্কুল ত্যাগ করতে হয় তাঁকে। পিতার ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে মিউনিখ ছেড়ে মিলানে চলে যান ১৮৯৪ সালে।

আইনস্টাইন একা একা থেকে গেলেন? বলল সীমা।

হ্যাঁ, তিনি পরে সুইজারল্যান্ডের একটি পলিটেকনিক স্কুলে ভর্তি হলেন। কিন্তু সেখানেও প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না।

বিন্দু, সীমা, অণু সবাই মুখ টিপে হাসছে আইনস্টাইনের এই খবর শুনে।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিকুল মনোভাব দেখে আলবার্ট ১৮৯৬সালের ২৮ জানুয়ারি সরকারিভাবে জার্মান নাগরিকত্ব বর্জন করেন। অবশ্য ১৯১৪ সালে জার্মানরা তাঁকে আবার নাগরিকত্ব সনদ প্রদান করে।

ভর্তি পরীায় ফেল করার পর অনন্যোপায় হয়ে আরাউ ক্যান্টন স্কুলে ভর্তি হতে হয় তাঁকে। সেই শহরটি জুরিখ থেকে বেশি দূরে নয় এবং সেখান থেকে পাশ করলে সরাসরি পলিটেকনিক স্কুলে ভর্তি করা হয়। সেই পলিটেকনিক স্কুলেই তিনি চার বছর পদার্থবিদ্যা অধ্যয়ন করেন।

এই স্কুলটি তখন সারা পৃথিবীর সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। পলিটেকনিক শিক্ষা শেষ করে ১৯০২ সালে সুইজারল্যান্ডের প্যাটেন্ট অফিসে তিনি প্রযুক্তি কর্মকর্তার চাকরি নিলেন। সেখানে কাজের চাপ তেমন ছিল না। ফলে অফিসে বসেই বিভিন্ন গবেষণার কাজ করতে পারতেন।

চন্দ্রা বলল-আর পড়াশুনা করেননি?

হ্যাঁ, সেখানে চাকরিরত অবস্থায়ই ১৯০৫ সালে তিনি জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে এর আগেই ১৯০৩ সালে তিনি মিলেভা মারিচ নামের সহপাঠিনীকে বিয়ে করেন।

আকাশ বলল-কিন্তু তাঁর গবেষণাকর্ম কখন প্রকাশ হতে থাকে?

নীলকান্তবাবু বললেন-১৯০৫ সালে জার্মানির পদার্থবিদ্যা বিষয়ক মাসিক পত্রিকা এনালিন এ তিনি তার গবেষণা প্রকাশ করেন এবং এর মাধ্যমেই পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এই বছরই এই পত্রিকায় তাঁর আরও চারটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। একটি প্রবন্ধে আইনস্টাইন বলেন-আলো স্বতন্ত্র কণা দ্বারা গঠিত, যা তরঙ্গধর্ম ছাড়াও কণার ক্ষেত্রে অন্যান্য ধর্ম প্রদর্শন করে। আলোর আঘাতে কঠিন পদার্থের ইলেকট্রন বের হয়, যার নাম আলোক তড়িৎ ক্রিয়া। আইনস্টাইন এই তত্ত্বেরও ব্যাখ্যা দেন।

আকাশ অবাক হয়ে বলল-আলো থেকে বিদ্যুৎ?

সীমা বলল-কিন্তু আমরা তো দেখি বিদ্যুৎ থেকে আলো আসছে, তাপ আসছে।

নীলকান্তবাবু বললেন-আলো থেকেও বিদ্যুৎ আসে, এ নিয়ে আইনস্টাইনের একটি সমীকরণ রয়েছে।

কমলা বললেন-তাহলে আপেকি তত্ত্ব কখন প্রকাশ করলেন?

ষোল বছর বয়সে একটি প্রবন্ধ দিয়ে তাঁর আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের কাজ শুরু হয়। সেখানে তিনি বলেন-যদি সকল প্রাসঙ্গিকতায় আলোর বেগ ধ্রব হয়, তবে সময় এবং বেগ দর্শকের কাছে আপেক্ষিক মনে হবে। পরবর্তীতে এই তত্ত্ব দিয়েই তাঁর বিখ্যাত সমীকরণ E = mc2E = mc2 প্রকাশ করেন।

নীলকান্তবাবু বললেন-আইনস্টাইন তখন প্যাটেন্ট অফিসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রাগ এর জার্মান ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা শুরু করেন।

আইনস্টাইনের ছেলেমেয়ে কয়জন ছিল? বললেন কমলা।

প্রথম স্ত্রী মিলেভা মারিচ এর এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয় ১৯০২ সালে। এর নাম রাখা হয় লির্সাল। লির্সালকে আইনস্টাইন কখনোই দেখেননি। কারণ মেয়েটিকে দত্তক দেয়া হয়েছিল এবং মিলেভা মারিচ এর সাথে আইনস্টাইনের সম্পর্ক বেশিদিন টেকেনি। ১৯০২ সালে আইনস্টাইনের বাবা হেরম্যানও অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯০৪ সালে আইনস্টাইন-মিলেভা দম্পতির প্রথম পুত্র হান্স অ্যালবার্ট এবং ১৯১০ সালে দ্বিতীয় পুত্র এডওয়ার্ড এর জন্ম হয়। ১৯১৯ সালে আইনস্টাইন এবং মিলেভার মধ্যে চিরদিনের জন্য ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার এলসাকে বিয়ে করেন এবং এই দম্পতির দুটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়।

আকাশ বলল-আইনস্টাইন যে বললেন, আলো বেঁকে যায়, এ নিয়ে কোনও পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়নি?

হয়েছে, বললেন নীলকান্তবাবু। ব্রাজিলের সোব্রালে ও আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল প্রিন্সিস দ্বীপ থেকে ১৯১৯ সালের ২৯ মে একটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে পারার কথা। লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি সূর্যগ্রহণের মুহূর্তে আলোকরশ্মির বেঁকে যাওয়ার ঘটনা পরখ করার সিদ্ধান্ত নিলো। এ উদ্দেশে বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন এর নেতৃত্বে একটি দল চলে গেল আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে, অন্য একটি দল গেল ব্রাজিলে। উদ্দেশ্য-সূর্যের কিনার ঘেঁষে দূরের যে নক্ষত্রটি দিনের বেলা দেখতে পারা যায় না, গ্রহণের সময় কালো আকাশে ঢাকা পড়া সূর্যের কাছ ঘেঁষে এটি দেখা যায় কি-না। এর আগেই হিসাব নিকাশ করে নক্ষত্রটি কোথায় থাকবে, তার নকশা করা হয়েছে।

পূর্বের তোলা ছবির সাথে মিলিয়ে দেখা গেল নক্ষত্রটি যে বিন্দুতে থাকার কথা, সেখান থেকে সরে গেছে। বিজ্ঞানী এডিংটন অত্যন্ত খুশি হলেন এটি দেখে এবং গণিতবিদ লিটলউড এর মাধ্যমে বার্টান্ড রাসেলকে টেলিগ্রাম করে জানালেন-আইনস্টাইনের তত্ত্ব সম্পূর্ণরূপে সমর্থিত। এরপর ৬ নভেম্বর রয়্যাল সোসাইটি ঘোষণা করল, আলো বেঁকে যায়, যা নিউটনের তত্ত্বে নেই, আছে আইনস্টাইনের আপেকিতাবাদ তত্ত্বে।

তখন আইনস্টাইন কী করলেন? বলল বিন্দু।

আইনস্টাইন কৌতুক করে বললেন, আপেক্ষিক তত্ত্ব সঠিক প্রমাণিত হলে জার্মানরা বলবে আমি জার্মান, সুইসরা বলবে আমি সুইস নাগরিক আর ফরাসিরা বলবে আমি বিশাল এক মহৎ বিজ্ঞানী। কিন্তু যদি ভুল প্রমাণিত হতো, তখন জার্মানি বলত আমি ইহুদি, সুইসরা বলত আমি জার্মান আর ফরাসিরা বলত আমি সুইস।

সীমা বলল-আইনস্টাইনকে কি এই জন্যই নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে?

না, বললেন নীলকান্তবাবু। আইনস্টাইনকে নোবেল পুরস্কার দেয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিলো।

কেন সংশয়? কমলা বললেন।

পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারের নিয়মটা হলো, এমন কাউকে দেয়া হবে যাঁর আবিষ্কার সরাসরি মানুষের কল্যাণে আসে। কিন্তু আপেক্ষিক তত্ত্ব যুগান্তকারী হলেও সরাসরি মানুষের কল্যাণে লাগেনি। তখন স্থির হলো আলোক তড়িৎ ক্রিয়াকে আবিষ্কার হিসেবে মানুষের কল্যাণে লাগানো সম্ভব। তাই তাঁর নাম ঘোষণা করা হলো।

চন্দ্রা বলল-যাক, শেষ পর্যন্ত পেয়েছেন তো!

বিন্দু বলল-কিন্তু তিনি পুরস্কারের টাকা দিয়ে কী করলেন?

কণিকা এতক্ষণ চুপ করেছিল। সে বলল-কী করবেন, সিঙ্গাড়া কিনে খেলেন!

সবাই হেসে ফেলল। নীলকান্তবাবু বললেন-বিবাহ বিচ্ছেদের শর্তানুযায়ী প্রথম স্ত্রী মিলেভাকে সকল অর্থ পাঠিয়ে দিলেন।

কমলা বললেন-কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের সময় আইনস্টাইন তো ভালো কাজ করলেন না। তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে পরমাণু বোমা তৈরি করতে প্ররোচিত করলেন।

নীলকান্তবাবু বললেন-না, বিষয়টি সেরকম সরল নয়। ফ্যাসিবাদী হিটলার ১৯৩৩ সালে জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে মতামত পাকাপোক্ত করার পর তাঁর দম্ভ প্রকাশিত হতে থাকে। এর মধ্যে বিভিন্ন দেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় আইনস্টাইনকে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসার আমন্ত্রণ জানায়। তবে তিনি ১৯৩২ সালেই জার্মানি ছেড়ে বেলজিয়াম চলে যান। সেখান থেকে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে। এরপর নিউ জার্সির প্রিন্সটনে অবস্থিত ইন্সটিটিউট অব এডভান্স স্টাডিতে চলে আসেন ১৯৩৩ সালে। তখন আইনস্টাইন আবার জার্মান নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন এবং ঘোষণা দেন-আর কোনওদিনই জার্মানে ফেরত আসবেন না এবং আসেনওনি। ১৯৪০ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনকে আমেরিকার নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। তবে তিনি সুইজারল্যান্ডেরও নাগরিক ছিলেন এই সেই নাগরিকত্ব কখনও বর্জন করেননি।

তাই বলে পারমাণবিক বোমা তৈরির পক্ষে মত দেবেন তিনি? কমলা বললেন।

নীলকান্তবাবু বললেন-সেই সময় পরীক্ষায় জানা গেল ইউরেনিয়াম ২৩৫ থেকে বিপুল পরিমাণে পারমাণবিক শক্তি উদ্ধার করা সম্ভব এবং এই তেজস্ক্রিয় ধাতু বেলজিয়াম এর অধিকারভুক্ত কঙ্গো উপত্যাকায় পাওয়া যায়। বিজ্ঞানী সম্প্রদায় হিটলারের রাজ্যলিপ্সা দেখে আতংকিত হলেন। ইউরেনিয়াম যদি হিটলারের হাতে পড়ে তাহলে তারা পরমাণু বোমা বানাতে বিলম্ব করবে না এবং গোয়েন্দা রিপোর্ট পাওয়া গেল জার্মান বিজ্ঞানীরা সে চেষ্টা করছে। জার্মান বাহিনি এই বোমা নিক্ষেপের আগেই আমেরিকাকে এর তৈরি এবং ব্যবহার করতে হবে।

ফলে ১৯৩৯ সালের ২ আগস্ট জুলিয়ো কুরি, এনরিকো ফার্মি, লিথোসিলার্ডসহ অন্যান্য অনেক বিজ্ঞানী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে একটি চিঠি লিখেন। চিঠিটি এরকম-পারমাণকি শক্তি বানানো সম্ভব। নাৎসি জার্মানির বিজ্ঞানীরাও এর ওপর কাজ করছেন। চূড়ান্ত কৌশলগত অস্ত্রের মতা পারমাণবিক শক্তির রয়েছে। অতএব এমতাবস্থায় কী করা উচিত এই ব্যাপারে প্রেসিডেন্টকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এর ফলেই রুজভেল্ট ম্যানহাটন প্রজেক্টের জন্য অর্থ মঞ্জুর করেন। তবে শেষদিকে আইনস্টাইন চেয়েছিলেন এই গবেষণা বন্ধ হোক এবং বিজ্ঞানী ম্যাক্স বর্নকে বলেছিলেন, পরমাণু বোমা তৈরির আবেদনপত্রে সই করাটা তাঁর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।

কমলা বললেন-এই ভুলেই তো হিরোসিমা নাগাসাকিতে কতগুলো নিরীহ মানুষ মারা গেল।

তা তো অবশ্যই। তবে আমেরিকা না বানালে হয়তো জার্মানরাই বানাত এবং তখন হিরোসিমা নাগাসাকির মানুষ না মরে আমেরিকা ব্রিটেনএর সাধারণ মানুষ মৃত্যুবরণ করত। তখন বিশ্বযুদ্ধটা না থেমে আরও দীর্ঘায়িত হতো-বললেন নীলকান্তবাবু।

কমলা বললেন-সেটা অবশ্য ঠিক।

নীলকান্তবাবু বললেন-আইনস্টাইন কিন্তু দুই বোমার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা দেখার পর মর্মাহত হয়ে বলেন, যদি জানতাম বোমার প্রতিক্রিয়া এমন ভয়াবহ হবে, তবে আমি মুচির পেশাই বেছে নিতাম। তিনি পরে জনসাধারণের কাছে ক্ষমা চান।

এতক্ষণ ধরে এইসব যুদ্ধ-যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা বিন্দুর ভালো লাগছে না। সে বলল-বাবা আইনস্টাইনের কিছু মজার ঘটনা বলো না।

নীলকান্তবাবু হাসলেন। বললেন-সব বিজ্ঞানীদের কিছু না কিছু মজার কাহিনি থাকে। আইনস্টাইনেরও রয়েছে।

তাড়াতাড়ি বলো-বলল বিন্দু।

নীলকান্তবাবু বললেন-আপেক্ষিক তত্ত্ব তো জনসাধারণের বোধগম্য ছিল না। এমনকি বিজ্ঞানীদের মধ্যেও সকলে এটি ভালো করে বুঝতে পারতেন না। কিন্তু সকলেই এটি নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করত। একদিন এক তরুণ সাংবাদিক আপেক্ষিক তত্ত্ব সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলতে বলায় আইনস্টাইন বলেন-যখন একজন লোক কোনও সুন্দরী মেয়ের সাথে এক ঘণ্টা গল্প করে, তখন তার মনে হয় সে এক মিনিট বসে আছে। কিন্তু যখন তাকে কোনও গরম চুলার কাছে এক মিনিট দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়, তখন তার মনে হয় সে যেন এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছে। এটিই আপেক্ষিকতা।

সবাই হো হো করে হেসে ফেলল। নীলকান্তবাবু বললেন-আইনস্টাইন এতবড় বিজ্ঞানী হলেও তাঁর মন খুব ভুলো ছিল। জার্মানি থেকে ইহুদি বিতাড়ন শুরু হবার পর আইনস্টাইন যখন কয়েকটি দেশ ঘুরে আমেরিকা স্থির হলেন, তখন প্রিন্সটন কর্তৃপক্ষ তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেন এবং তাঁকে গোপন জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। কারণ গুপ্তঘাতকের দল আমেরিকায়ও তাঁকে আঘাত করতে পারে। কিন্তু এভাবে থাকতে তাঁর তো ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন। একদিন সন্ধ্যেবেলা প্রিন্সটনের ডিরেকটরের বাড়িতে ফোন এলো-দয়া করে আইনস্টাইনের বাড়ির নম্বরটা জানান। আইনস্টাইনের বাড়ির নম্বর কাউকে জানানো হয় না, বলে ডিরেকটর ফোন কেটে দিলেন। একটু পরে আবার ফোন এলো, আমি আইনস্টাইন বলছি, বাড়ির নম্বর আর রাস্তা দুটোই ভুলে গেছি, যদি দয়া করে বলে দেন।

মজার ঘটনা তো, বলল সীমা।

হ্যাঁ, আরও একদিন এক সহকর্মী আইনস্টাইনকে টেলিফোন নম্বর দিতে বললে তিনি বই থেকে খুঁজে নিতে বলেন। কারণ হিসেবে আইনস্টাইন বলেন-যেটা বইতে পাবেন, সেটা মুখস্ত করতে মস্তিষ্কের দরকার কী?

আইনস্টাইন রাজনীতিতে জড়াননি? প্রশ্ন অণুর।

সরাসরি কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না যদিও এরপরও বিশ্বশান্তির জন্য তিনি কাজ করেছেন। ১৯৩১সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হিসেবে তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং ১৯৩২ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বনিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ সংগ্রহ শুরু করেন। তিনি তাঁর বিষয় সম্পত্তি সব হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়কে উইল করে দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুন ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হলে আইনস্টাইনকে রাষ্ট্রপতি হবার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো। তিনি সবিনয়ে এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর মতে-আমি মনে করি রাজনীতির চেয়ে সমীকরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনীতি লেখা হয় বর্তমানের খসড়া খাতায়, আর সমীকরণ লেখা থাকে মহাকালের অজর গ্রন্থে।

একটু থেমে নীলকান্তবাবু আবার শুরু করেন-এই মহান বিজ্ঞানীর কিছু কিছু উক্তি খুবই প্রণিধানযোগ্য। যেমন তিনি বলেছেন, কল্পনাশক্তি জ্ঞানের শক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাফল্যমণ্ডিত মানুষ হওয়ার চেয়ে মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হবার চেষ্টা করাই শ্রেয়। বিদ্যালয়ে শেখানো বিষয়গুলো ভুলে থাকার পর যা মনে থাকে তা-ই শিক্ষা।

বিন্দু এতে খুশি হয়ে উঠল। বলল-বাঃ, তাহলে তো আমি ক্লাসের পড়া সব ভুলে যাব ইচ্ছা করে।

সবাই হেসে উঠল।

নীলকান্তবাবু বললেন-আইনস্টাইন কিন্তু কবিতাও লিখেছেন।

অবাক হলো সবাই। রেখা বলল সত্যি?

হ্যাঁ, সত্যি। কবিতাটির নাম-মানুষ মানুষের জন্য

এখানে মানুষ মানুষের জন্য

মানুষের হাসি মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য

এবং সর্বোপরি আমাদের সকলের সুখ

যার ওপর নির্ভর করে।

সেই অগণিত আত্মার আকুতি

যার সাথে আমাদের নিয়তি বিজড়িত

একই সহানুভূতিসূত্রে গাঁথা।

প্রতিদিন আমার বহুবার মনে পড়ে

তাঁদের কথা, যাঁদের দানে সমৃদ্ধ আমার জীবন।

মৃত অথবা জীবিত।

এবং কতটা আমি করতে পেরেছি;

যতটা আমি পেয়েছি।

[কবিতাটি অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক এম এ আজিজ মিয়া এবং ‘বিজ্ঞান পাঠ’ দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা মার্চ-এপ্রিল ২০১৬ থেকে নেয়া হয়েছে]

লেখক:সহকারী অধ্যাপক(পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ,সিলেট

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x