স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অগ্নিঝরা মার্চ

‘ট্যাকা লাগব না স্যার, দ্যাশ স্বাধীন হইলে দিয়েন’

‘ট্যাকা লাগব না স্যার, দ্যাশ স্বাধীন হইলে দিয়েন’
প্রখ্যাত গীতিকার মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান। ফাইল ছবি+

১৯৭১ সালের মার্চ মাস যেন বহু আকস্মিকতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ আমাদের জাতীয় জীবনে। অনেক অনিশ্চয়তা এবং অবিশ্বাসের মধ্যেও আমরা ভাবছি, ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে ঢাকায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ভেতরে ভেতরে পশ্চিম পাকিস্তানে যেমন চলছিল বিশ্বাসঘাতকতার গোপন চক্রান্ত, তেমনি পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।

বঙ্গবন্ধুর ছয় দফায় কোথাও স্বাধীনতার কথা লেখা না থাকলেও তার অন্তর্নিহিত মর্মকথা বুঝতে ভুল করেনি এদেশের সচেতন মানুষ।আশঙ্কাই সত্য হলো। অকস্মাৎ পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ সংসদ অধিবেশন স্থগিতের আদেশ দিলেন। স্ফুলিঙ্গের মতো কোটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল সংগ্রাম ও বিদ্রোহের আগুন। কিন্তু প্রকৃত রাষ্ট্রনেতা তো আবেগে ভেসে যেতে পারেন না। তিনি চললেন পরিকল্পিত পথে। এর মধ্যে ছাত্রনেতারা তৈরি করে ফেলেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

এরপর ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। কী আছে ৭ই মার্চের ভাষণে? তার চেয়ে বরং প্রশ্ন তোলা যায়, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কী নেই সেই ভাষণে? শান্তির কথা? হ্যাঁ, আছে। মুক্তি এবং স্বাধীনতার কথা? হ্যাঁ, তা-ও আছে। ‘সংগ্রাম’ শব্দটির যত অর্থ অভিধানে আছে, তার প্রথমটিই হলো যুদ্ধ। তাহলে যুদ্ধের কথাও আছে। এই ভাষণ সরাসরি বেতারে প্রচারের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বন্ধ করে দেয় পাকিস্তানের সামরিক শাসক। কিন্তু বেতারের এক সাহসী কর্মী নাসার আহমেদ চৌধুরী তা গোপনে রেকর্ড করে ফেলেন। যে রেকর্ড পরদিন বেতারে প্রচার করতে দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানের এখানকার প্রতিনিধি।

আমি তখন সিলেট বেতার কেন্দ্রে। নতুন বদলি হয়ে রাজশাহী থেকে পরিবার নিয়ে যাব। পরিবার বলতে আমার স্ত্রী, আড়াই বছরের বড় মেয়ে ও এক মাস বয়সি ছোট মেয়ে। ১৭ মার্চ প্রায় কপর্দকহীন অবস্থায় সিলেটে যাওয়ার জন্য যাত্রা শুরু করি। তখন ট্রেন সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত যেত। ওখানে নেমে স্টিমারে নদী পাড়ি দিয়ে জগন্নাথগঞ্জ থেকে আবার ট্রেনে উঠতে হতো। আমার সমস্ত মালপত্র ঘাটের কুলিরা ওপার থেকে নামিয়ে এপারে ট্রেনে তুলে দিয়েছে। আমার আর্থিক অবস্থা জেনে বুক ফুলিয়ে বলেছে, ‘ট্যাকা লাগব না স্যার, দ্যাশ স্বাধীন হইলে আইসা দিয়া যাইবেন।’ তাদের সেই দৃপ্ত মুখ দেখে বিশ্বাস তীব্র হয়েছে, দেশ স্বাধীন হবেই।

২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় হিংস্র হায়েনার মতো অতর্কিতে নিরস্ত্র নিরীহ মানুষের ওপর কাপুরুষের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী। শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। প্রতিরোধ শুরু হয় ইপিআর, পুলিশ ও ছাত্র ব্রিগেডের সাহসিকতায়। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেসযোগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তার পরপরই পাকিস্তান বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যায় মেতে ওঠে। ফলে গ্রামগঞ্জের মানুষও জড়িয়ে পড়ে যুদ্ধে। এরই মধ্যে শুরু হয় সাধারণ মানুষের দেশত্যাগ। ভারতে পাড়ি জমাতে থাকে তারা। আমার তখন হতবিহ্বল অবস্থা। মাত্র সাত দিন হলো পরিবার নিয়ে এসেছি। কোলে এক মাসের বাচ্চা।

ওদিকে ভারতীয় বেতারে শুনলাম ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের লাশ পড়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তায়। যদিও ভুল করে তারা অন্য মনিরুজ্জামান সাহেবকে মেরেছিল। কিন্তু আমি কী করে জানব? আমার ছোট ভাই আসাদুজ্জামানের যুদ্ধে যাওয়ার খবরও পেলাম আব্বার চিঠিতে। কিন্তু তিনি নিজে যে ধৃত হয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্টে সাত দিন ধরে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তা জানাননি।

আমি চরম এক অনিশ্চয়তায় পড়ে গেলাম। এই শিশু বাচ্চা নিয়ে কোথাও যে চলে যাব, সেটাও নিরাপদ মনে হয়নি। কারণ সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গেও পরিচয় ঘটেনি। আমার বাড়িওয়ালার ছেলে নিজামউদ্দিন লস্কর ময়না সিলেট সদর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। সে-ও আমার পরিবারকে নিয়ে যেতে সাহস পায় না। ময়নার বাড়ির সবাই গ্রামে চলে গেছে। ময়না একা আমার পরিবারের সাথে অবস্থান করছে।

আমার শুধু মার্চ নয়, প্রায় সারা একাত্তর কাটল নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে। ময়নার পাঠানো মুক্তিযোদ্ধারা আসত। তরুণ তরুণ সব ছেলে। দিনে বাইরে তালা দিয়ে থাকতাম সবাই। রাতে ওরা বেরিয়ে রেকি করে চলে যেত। পরে সেই সব জায়গায় অ্যাকশন হতো। একপর্যায়ে ময়না পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে ভারতের হাসপাতালে ভর্তি হয়। আবার সুস্থ হয়ে যুদ্ধে ফেরে। ছেলেদের কাছ থেকেই খবর পেতাম।

এত ঘটনাবহুল মার্চ, প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কার মাস মার্চ, তবু আজ আমার সবচেয়ে গৌরবের মাস। আমার স্বাধীনতার মাস। এই স্বাধীনতার জন্য আমার ভাই শহিদ হয়েছে। আমার বাবা নির্যাতিত হয়েছেন। আমার বড় ভাই গ্রামেগঞ্জে ইয়াহিয়া খানের হুলিয়া কাঁধে নিয়ে ঘুরেছেন। আমার সর্বংসহা মাকে নিয়ে তাই যেমন লিখেছি, ‘সেই রেললাইনের ধারে, মেঠো পথটার পাড়ে দাঁড়িয়ে।’ তেমনি লিখেছি, ‘আমি আর কাঁদব না/ লাখো সন্তান হারানো স্বদেশ তোমাকে কথা দিলাম/ তোমারই মতন করে বিশ্বাসে বুক বাঁধলাম/ আমি তো হারানি একটি ছেলের মা/ আমি আর কাঁদব না।’

লেখক :প্রখ্যাত গীতিকার

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x