১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক (৭ মার্চ)

১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক (৭ মার্চ)
ছবি: ইত্তেফাক আর্কাইভ

সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইত্তেফাক হয়ে ওঠে গণমানুষের মুখপত্র। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল পত্রিকাটি। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে ইত্তেফাক। পত্রিকাটির এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।

স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান, আওয়ামী লীগ কমিটির জরুরি বৈঠক’। আগের দিন ৬ মার্চ দুপুরে বেতারে দেওয়া ভাষণে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল এ.এম ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তার ভাষণের বিবরণ প্রকাশিত হয় ইত্তেফাকের মূল খবরে। তিনি বলেন, ‘যাহাই ঘটুক না কেনো, যতদিন পর্যন্ত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আমার হুকুমে আছে এবং আমি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান আছি, ততদিন পর্যন্ত আমি পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশভাবে পাকিস্তানের সংহতির নিশ্চয়তা দেবো। পাকিস্তানের ঐক্য, সংহতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ওপর ন্যস্ত এবং এই দায়িত্ব পালনে তারা কখনো ব্যর্থ হয়নি।’

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার কারণ বর্ণনা করে ইয়াহিয়া খান বলেন, ‘পরিবেশ শাসনতন্ত্র রচনার উপযোগী ছিল না। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের বিপুলসংখ্যক প্রতিনিধি ৩ মার্চ অধিবেশনে যোগ দিতে অসম্মতি জানিয়েছিলেন। তাই ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন নিরর্থক হতো এবং এর ফলে জাতীয় পরিষদই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল। তাই অধিবেশন স্থগিত রেখে সংকট নিরসনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে আমাদের পূর্ব পাকিস্তানি নেতৃত্ব যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তাতে ধ্বংসকারী শক্তি রাস্তায় বের হয়ে জান-মালের ক্ষতি করছে।’

জাতির উদ্দেশে ইয়াহিয়া খানের সাড়ে ১২ মিনিটের ভাষণ প্রদানের পর আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে তার বাড়িতে দলটির কেন্দ্রীয় ও বাংলাদেশ শাখার ওয়ার্কিং কমিটির এক যুক্ত জরুরি বৈঠকে দেশের সবশেষ রাজনৈতিক পর্যালোচনা করা হয়। প্রধান আরেকটি খবর হিসেবে এই তথ্য ছেপেছে ইত্তেফাক। বৈঠকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমদসহ ঢাকায় অবস্থানরত দলীয় ওয়ার্কিং কমিটির সব সদস্য যোগ দেন। প্রেসিডেন্টের ভাষণ ঘরে বসেই শুনে জরুরি বৈঠক ডাকেন বঙ্গবন্ধু।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মন্তব্যে দুঃখ প্রকাশ করে কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা এয়ার মার্শাল (অব.) নুর খান বলেন, ‘আইনত শেখ মুজিবই দেশের শাসন পরিচালনার অধিকারী।’ তিনি অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিবন্ধকতা দূর করার আহ্বান জানান। দৈনিক ইত্তেফাকের ৭ মার্চের প্রথম পাতায় তার এসব কথা শিরোনাম করে একটি খবর প্রকাশিত হয়। লাহোরে ৬ মার্চ অনুষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী ও বুদ্ধিজীবী, ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীদের বিশাল সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। পরিষদ কক্ষে ছয় দফা সংক্রান্ত সব বিরোধের মোটামুটি নিষ্পত্তি সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তানে পরিস্থিতির অবনতির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর ইয়াহিয়া খান দোষ চাপানোর কারণে নুর খান দুঃখ প্রকাশ করেন। তার মন্তব্য, ‘শেখ মুজিবুর রহমান দেশকে বিচ্ছিন্ন করতে চাননি এবং এই ধরনের সন্দেহ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’

নুর খান মনে করিয়ে দেন, ‘নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট নিজেই বলেছিলেন, পাকিস্তানে এবারই সবচেয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।’ তার প্রশ্ন, ‘তাহলে দেশে গণতান্ত্রিক সংস্থাগুলোকে সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না কেনো?’

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ইত্তেফাকের প্রথম পাতার নিচের অংশে বাঁ-দিকে একটি শিরোনামে জানানো হয়- ঢাকার রাজপথে স্বাধিকারকামী জনতার দৃপ্ত পদচারণা, কণ্ঠে কণ্ঠে ক্ষুব্ধ গর্জন, প্রাণে প্রাণে সংগ্রামী শপথ’। ৬ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে ছিল এই প্রতিবেদন। এর ডান পাশে ছাপা হয় সংশ্লিষ্ট ছবির অ্যালবাম। যেমন- ছাত্রলীগের মশাল মিছিল, স্বাধিকারকামী শিল্পী সমাজের সমাবেশ, আওয়ামী লীগের মহিলা শাখার বিক্ষোভ মিছিল, স্বাধিকার-সচেতন সাংবাদিকদের শোভাযাত্রা এবং নার্সিং স্কুলের ছাত্রীদের বিক্ষোভ মিছিল।

আগের দিনের মতো ৭ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার নিচের অংশে প্রথম দুই কলামে বক্স করে আবারও জানানো হয়, ‘অদ্য রবিবার ৭ মার্চ বিকাল ২টায় রেসকোর্স ময়দানে গণ-সমাবেশ। বক্তৃতা করবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’।

ইত্তেফাক/জেএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x