পরিকল্পনা সফলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

পরিকল্পনা সফলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
ছবি: ইত্তেফাক

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উত্পাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাতীয় উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন—সংবিধানের এই অনুচ্ছেদটি হলো অন্যতম ভিত্তি। জাতীয় পরিকল্পনা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে করা হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে ভারতের তদানীন্তন জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান মন্টেক সিং আহলুয়ালিয়ার বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, পরিকল্পনা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয় এবং সেসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তার জন্য প্রকল্প, কর্মসূচি, নীতিকৌশল প্রস্তুত করা হয়। পরিকল্পিত অর্থনীতির মূল কথা হলো অর্থনীতির উন্নয়নের টেকসই বৃদ্ধি, বাজার অর্থনীতির সঙ্গে সংহতি রক্ষার মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে উত্সাহিত করা। ব্যক্তি উদ্যোগকে সর্বোচ্চ নীতিসহায়তা দেওয়া। গত শতাব্দীর ১৯২০ দশকে সোভিয়েত রাশিয়ায় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রবর্তন করা হয়। এরই ধারাহিকতায় অন্যান্য কমিউনিস্ট রাষ্র্ব ও অন্যান্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্র পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা শুরু করে। সোভিয়েত রাশিয়ার ১৩তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৯১-১৯৯৫) সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার কারণে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ভারত অবশ্য এখন কেন্দ্রীয়ভাবে পাঁচশালা পরিকল্পনা প্রণয়ন বাদ দিয়েছে।

ভারতে পরিকল্পনা কমিশন গঠিত হয় ১৯৫০ সালে আর পাকিস্তানে ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৬ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট সরকারের অধীনে প্রথম প্রাদেশিক পরিকল্পনা বোর্ড গঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান পরিকল্পনা বিভাগ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৭১ সালে গঠিত হয় পরিকল্পনা কোষ। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্রুততম পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেন। পরিকল্পনা কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ১৯৭৫ সালে গঠিত হয় প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যুরো। এই ব্যুরোই বর্তমানে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমএডি)। ১৯৭৫ সালেই মন্ত্রণালয়/বিভাগসমূহে পরিকল্পনা কোষ গঠিত হয়। এর আগে বিভিন্ন সরকারের সময়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও কার্যত বাস্তবায়নে তেমন গুরুত্ব ছিল না। ২০০৩-২০০৯ বাংলাদেশে কোনো পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল না, যা সংবিধানের ১৫ (খ) অনুচ্ছেদ-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই সময়ের মধ্যে ছিল বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেওয়া দুটি দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্র। এসব কৌশলপত্রে প্রবৃদ্ধির কোনো হার নির্দিষ্ট ছিল না। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ফিরে আসে।

সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার দিনবদলের সনদ রূপকল্প ২০২১ নামে পরিচিতি লাভ করে। রূপকল্প ২০২১-কে বাস্তবে রূপ দিতে প্রণয়ন করা হয় বাংলাদেশের প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১। দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় ঘটে ‘প্যারাডাইম সিফট’। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-এর মূল লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা। দীর্ঘ মেয়াদে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে রূপকল্পের অভীষ্ট অর্জন সহায়ক হয়েছে। অন্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল—২০১০ সালের পরে যত দ্রুত সম্ভব প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করে ২০১৪ সালের পর নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তিতে পর্যাপ্ত দক্ষতাসহ শিক্ষিত মানুষের দেশে পরিণত করা। দারিদ্র্যরেখার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা জনসংখ্যার ১৩.৫ শতাংশে নামিয়ে এনে দারিদ্র্য বহুলাংশে নিরসন করা। প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা দুটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। এই দুটি পরিকল্পনাই ছিল লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক কৌশলগত পরিকল্পনা। এই দুটি পরিকল্পনাই বাজেট ও বার্ষিক কর্মসূচির সঙ্গে সুন্দর সমন্বয় ঘটানো হয়। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি সাধিত হয়। এর কারণ হলো—পরিকল্পনা একটি ভবিষ্যত্মুখী প্রক্ষেপণ। আগামী পাঁচ বছরে অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন হবে তার একটি কৌশল চিত্র ও কর্মসূচি তুলে ধরা হয়। এই সময়ের মধ্যে সব খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন স্থির করা হয়। সে অনুযায়ী বাজেট এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। সে কারণে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সব মন্ত্রণালয়/বিভাগের মতামত একত্রিত করে তা সমন্বয় করা হয়। এটি বেশ কঠিন ও কষ্টসাধ্য কাজ। এর ফলে পরিকল্পনা ও বাজেটের মধ্য সমন্বয় হচ্ছে, যা আগে ছিল না। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ হতে অর্থ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামো তৈরি করা হয়। কোনো প্রকল্প নিতে হলে সে প্রকল্পটির সঙ্গে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না, তা যাচাই করা হয় এবং কোন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাহায্য করবে তা উল্লেখ করতে হয়। বলতেই হবে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট প্রচেষ্টা এবং সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও ব্যবহারের ফলে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।

এই দশকের আগে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে আটকে ছিল। এটাকে কেউ কেউ ৬ শতাংশের ফাঁদ বলে উল্লেখ করেছিলেন। একসময় মনে হয়েছিল এই ফাঁদ থেকে বের হওয়া বেশ কঠিন হবে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ সময়ে বাংলাদেশ ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এই সময়ে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য মাইলস্টোন অর্জন করে। বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন-আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়। বাংলাদেশ ২০২১ সালের লক্ষ্যমাত্রা ২০১৫ সালেই অর্জন করতে সমর্থ হয়। বলা বাহুল্য, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কারণে আমাদের সরকারপ্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খেতাবে ভূষিত হন এবং পুরস্কার লাভ করেন।

২০২৪ সালেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে পারত কিন্তু করোনার আকস্মিক অভিঘাতের কারণে যে ধকল অর্থনীতিতে গেছে, তার জন্য অন্যদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে আরো দুই বছর উত্তরণ পেছানোর প্রস্তাব রাখা হয় এবং এই প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার একটি অনন্য দিক হলো পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্যবর্তী ও শেষ এর মূল্যায়ন। এই মূল্যায়ন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এর ফলে ভুলত্রুটি (course correction) শোধরানোর সুযোগ থাকে এবং পরবর্তী পরিকল্পনায় শিক্ষণীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ফলাফল সব মন্ত্রণালয়/বিভাগের কর্মকর্তাদেরকে অবহিত করা হয়।

ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময়ে কিন্তু বড় অর্জন উল্লেখ করা প্রয়োজন। ষষ্ঠ ও সপ্তম পরিকল্পনাকালে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ও মাথাপিছু আয় সর্বোচ্চ বেড়েছে। চাল, মাছ ও আলু উত্পাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জিত হয়। প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল ৭২.৬-এ পৌঁছায়। মাতৃমৃত্যুর হার ১ লাখ জন্মে ১৬৫-তে নেমে আসে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে জেন্ডার সমতা অর্জিত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ স্থানে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বিগত দশকে যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তা মোটামুটি সবার গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। দেশের ভেতরে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বা প্রেক্ষিত পরিকল্পনা নিয়ে সুশীল সমাজের মধ্যে বিরূপ সমালোচনা হয়নি। পরিকল্পনাগুলো সবার কাছে সমাদৃত হয়েছে। স্মরণ করা যায়, একটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সাংবাদিকবৃন্দ পুড়িয়েছিলেন। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে তাদের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্ব দরবারে আলোচিত হয়েছে। বলা যায়, বাংলাদেশে স্মরণকালে অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরে সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীল পরিস্থিতি পেয়েছে। এটা অর্থনীতির জন্য বিরাট এক শুভ লক্ষণ। কারণ, অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। যেখানে অনিশ্চয়তার আধার থাকবে, সেখানে ব্যবসায় কার্যক্রম বাড়তে পারে না। ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশ এগিয়ে চলছে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের আলোকে ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে চরম দারিদ্র্য এবং ২০৪১ সালের মধ্যে নিরক্ষরতা নির্মূলের প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশ অগ্রসর হচ্ছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে বাংলাদেশ এমন সব মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যা আগামী দিনের উন্নত দেশ গড়ার শক্ত বুনিয়াদ হিসেবে কাজ করবে। তবে উন্নত দেশ হওয়ার জন্য শুধু মাথাপিছু আয় বা উন্নত অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয়। দুনিয়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে জ্ঞানবিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে ও মানবসম্পদে সমৃদ্ধ হতে হবে। সে কারণে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১-এ জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য সম্মুখে তাকানো শতবর্ষী পরিকল্পনা বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ জাতীয় উন্নয়ন যাত্রাপথকে প্রায় শত বছর ধরে আলোকিত করবে। পরিকল্পনা মাফিক এগোনো এবং সফলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সদস্য (সিনিয়র সচিব), সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x