মোদি সরকারের সময় ভারত-বাংলাদেশ

মোদি সরকারের সময় ভারত-বাংলাদেশ
নরেন্দ্র মোদি। ছবি: সংগৃহীত

একটি মজবুত সড়ক তৈরি হলে তা সচল রাখতে হয় এবং সড়কের রক্ষণাবেক্ষণেরও প্রয়োজন পড়ে। নচেত্ সেই সড়ক কিছুদিন পর আর চলাচলের জন্য উপযুক্ত থাকে না।

বৃষ্টির পানিতে সড়কে শ্যাওলা ধরে যায়, আশপাশের গাছের ডালপালা সড়কে পড়ে তা চলাচলের পথ রুদ্ধ করে। যে কোনো দুটি দেশের সম্পর্কের বিষয়টিও সড়কের মতো। দুটি, বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশের মধ্যে যোগাযোগ যত বাড়ে, যাতায়াত যত বাড়ে, ততই মসৃণ হয় চলার পথ। সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে বৃদ্ধি পায় আত্মিক সম্পর্ক।

এই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন হয়, তেমনি সরকার পরিচালনায় যারা থাকেন তাদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। দুটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক এমন উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব যে এক দেশের আনন্দ, অর্জনে আরেক দেশ হয়ে উঠতে পারে অংশীদার। অতীব আনন্দের বিষয়ে, ভারতে নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সর্বোচ্চ চূড়ার দিকে হাঁটছে। ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার ও বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের সম্পর্ক এতটাই বিশ্বস্ততা ও প্রতিশ্রুতিশীলতার দিকে এগিয়েছে যে বারবার দুটি দেশে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের কথা মানুষ স্মরণ করছে।

একথা ঠিক, রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সময়েও ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা এসে সামনে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন সময় তা সমাধানে যে সাহসী ভূমিকার দরকার ছিল এবং যে দৃঢ় সিদ্ধান্তের দরকার ছিল তা নানা কারণে পুরোপুরি হয়ে ওঠেনি। যেমন আঙ্গরপোতা-দহগ্রাম সীমান্ত সমস্যাটি ছিল দীর্ঘকালের। এ জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা নিয়েও তা করে ওঠা যায়নি। ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতৃত্বে যখন এল কে আদভানী ছিলেন তখনো একবার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে দুই দেশ ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি টার্গেট করেছিলেন, যে করেই হোক এই সীমান্ত নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে তিক্ততা মেটাবেনই। ফলে এক অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিলে।

নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সাল থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা নিয়ে যে বিতর্ক ছিল তা নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আদালত (পার্মানেন্ট কোর্ট অব অ্যাট্রিবিউশন) ১৯ হাজার ৪৬৭ কিলোমিটার বাংলাদেশ সমুদ্র অঞ্চলের পক্ষে রায় দেয়। ভারত এ রায় নিঃশব্দে মেনে নেয়। নরেন্দ্র মোদি সরকারের তত্কালীন বিদেশ মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, আমরা দুই দেশই এই আন্তর্জাতিক আদালতের রায় সশ্রদ্ধচিত্তে মেনে নিচ্ছি। ফারাক্কা নিয়ে এখন আর শোরগোল শোনা যায় না, কিন্তু তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশের কিছু দাবি-দাওয়া আছে। সেটা নিয়ে একটি সমাধানে আসতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর যে আগ্রহের কোনো ঘাটতি নেই এ কথা সবার কাছেই পরিষ্কার।

বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে আরো একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্ব রয়েছে বিবিআইএন এবং বিমসটেক (বিআইএমএসটিইসি) ইনিশিয়েটিভের মধ্য দিয়ে। অত্যন্ত ব্যস্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাতৃসুলভ একটি নজর বাংলাদেশের প্রতি আছে সেটা লক্ষ করা যায়। তিনি সময় পেলেই বাংলাদেশ সফরে আসার চেষ্টা করেন। তিনি একাধিক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, তার প্রিয় মানুষের তালিকার প্রথম দিকে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নেতৃত্বের মধ্যে কেবল রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিক সম্পর্কই যথেষ্ট নয় বলে আমাদের ধারণা। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, একের প্রতি অন্যের আন্তরিকতা রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলে। সেই জায়গায় দুই দেশের নেতৃত্ব ‘কোড়া কাগজ’-এর মতো। এই সম্পর্ক অব্যাহত রাখা এবং বন্ধন আরো সুদৃঢ় করা দুটি জাতির জন্যই অপরিহার্য। এক দিন নরেন্দ্র মোদি থাকবেন না, এক দিন শেখ হাসিনাও থাকবেন না। কিন্তু আমরা আশা করি, এমন একটি সম্পর্ক তারা প্রতিষ্ঠা করে যাবেন যা বিশ্বের অপরাপর দেশের জন্য উদাহরণ হয়ে দেখা দেবে; দুই দেশের মানুষের মধ্যে পরম ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশে স্বাগত।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x