বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের মাস

বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের মাস
ছবি: ইত্তেফাক

ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০২১ সালের মার্চ মাস শেষ হয়ে গেল। আবার মার্চ মাস ফিরে আসবে ২০২২ সালে। তখন আমরা কেউ থাকবো, কেউ থাকবো না। তবে বাঙালির কাছে মার্চ কোনো সাধারণ মাস নয়, এক অনন্যসাধারণ মাস।

ক্যালেন্ডারের পাতার মতো হূদয়ের খাতায়ও জ্বলজ্বলে একটি আখ্যান। রক্তের অক্ষরে লেখা সেই আখ্যানের পৃষ্ঠা জুড়ে আছে ৩০ লাখ মানুষের আত্মদানের কথা, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বেদনা ও ক্ষোভ। মার্চ মানে আত্মত্যাগ, রক্তদান, বহু প্রাণের বিসর্জন, করুণ রোদন, শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি, মুষ্টিবদ্ধ কোটি হাত এবং একটি নতুন পতাকা।

মার্চ বাঙালির গর্বের অধ্যায়। কোটি বাঙালির কণ্ঠে স্বাধীনতা, মুক্তি, সংগ্রাম, স্বাধীকার, সার্বভৌমত্ব ও নতুন পতাকার কথা ১৯৭১ সালের এই মার্চেই উচ্চারিত হয়েছে জোরেশোরে। বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ লড়াই চূড়ান্ত রূপ নেয় এই মাসেই। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস এক অগ্নিগর্ভ সময়। অসম যুদ্ধে বিপুল মনোবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতির সময়। ঘরের বাঁধন ছিন্ন করে রাজপথে নেমে আসার সময়। আর ১৯৭১-এর ৭ই মার্চ হলো বাঙালির হূদয়ে জ্বলতে থাকা অগ্নিকুণ্ডলীকে দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার দিন। রেসকোর্স ময়দানে রক্তে আগুন জ্বালানো বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাঙালিকে অবতীর্ণ করে হানাদারদের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক যুদ্ধে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণে সেদিন সংগ্রাম, স্বাধীনতা, মুক্তির মতো শব্দগুচ্ছ বারবার ধ্বনিত হতে থাকে। সেদিন থেকে স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ বাঙালির হয়ে ওঠে। কবিকণ্ঠে ধ্বনিত হয় : ‘তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল/হূদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার/সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি /‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’/সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’

পাকিস্তানি শাসনের অন্তঃসারশূন্যতা, বাঙালির আত্মত্যাগ ও প্রয়োজনে আরো রক্তদানের প্রস্তুতির কথা বাঙালিকে বুঝিয়ে দেয় সামনের দিনে অসীম সাহস নিয়ে লড়তে হবে। ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও সর্বাত্মক প্রতিরোধের প্রস্তুতির আহ্বান বাঙালি জাতির জন্য মাইলফলক হয়ে রয়েছে। এই ভাষণে লুকিয়ে রয়েছে বাঙালির জাতীয় জীবনের বাঁক বদলের প্রকৃত সূত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগাম, মুক্তি, চেতনা, আন্দোলন—সবকিছুর ইতিহাস মিশে আছে মার্চ মাসের সঙ্গে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস না এলে এই দেশটা আমাদের হতো না। এই লাল-সবুজের পতাকা পেত না বাঙালি। একটি স্বাধীন ভূখণ্ড সৃষ্টির পেছনে বিশেষ করে একটি মাসের অবদান খুবই ইতিহাস স্বরণীয়। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঘোষিত হয় স্বাধীনতাসংগ্রামের পূর্ণাজ্ঞ রূপরেখা, যা ইতিহাসে আজ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে একই দিনে পাঠ করা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহার। এই ইশতেহারে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা, জাতীয় সংগীত, জাতির পিতা এবং জাতীয় স্লোগান ঠিক করা হয়। এই দিনে ঠিক করা স্লোগান, পতাকা, জাতীয় সংগীত মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ তত্কালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় পার্লামেন্টারি পার্টিগুলোর নেতাদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করে। এই বৈঠকে ইয়াহিয়া নানা ধরনের কৌশলী প্রস্তাব দেন বঙ্গবন্ধুকে। তখন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেসব প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেন। বৈঠক থেকে উঠে এসেই বঙ্গবন্ধু দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন। ঐ দিন বিকেলে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ আয়োজিত জনসভায় বঙ্গবন্ধুর সামনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ। সে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ছাত্রলীগের তত্কালীন সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী। তখন থেকেই বাঙালি বীর সন্তানেরা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া বড় অনুপ্রেরণা পায়, যা ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করে। ঘোষিত ইশতেহারে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৭ কোটি মানুষের জন্য স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাম বলা হয়। বাঙালির স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ইশতেহারে বলা হয়—৫৪ হাজার ৫০৬ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য আবাসভূমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ। এই দিন থেকে পূর্ব পাকিস্তান নামটি ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ হয়। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ গঠনের জন্য কয়েকটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় এই তারিখেই। লক্ষ্যগুলো হলো—১. স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে পৃথিবীর বুকে একটি বলিষ্ঠ বাঙালি জাতি সৃষ্টি এবং বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি বিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। ২. স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে অঞ্চলে অঞ্চলে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য নিরসনকল্পে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করে কৃষক-শ্রমিক রাজনীতি কায়েম করতে হবে। ৩. স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে ব্যক্তি, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ নির্ভেজাল গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে।

সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ ছাড়াও আরো কিছু কর্মপন্থা ঠিক করা হয় এই ইশতেহার ঘোষণার দিন। বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার জন্য গৃহীত কর্মপন্থাগুলো হলো—১. বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, থানা, মহকুমা, শহর, জেলায় স্বাধীনতা সংগ্রাাম কমিটি গঠন করতে হবে। ২. সব শ্রেণির জনসাধারণের সহযোগিতা কামনা ও তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। ৩. শ্রমিক এলাকায় শ্রমিক ও গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের সুসংগঠিত করে গ্রামে গ্রামে, এলাকায় এলাকায় মুক্তিবাহিনী গঠন করতে হবে। ৪. হিন্দু-মুসলমান ও বাঙালি-অবাঙালি সাম্প্রদায়িক মনোভাব পরিহার এবং সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। ৫. স্বাধীনতাসংগ্রামকে সুশৃঙ্খলতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা এবং লুটতরাজসহ সব ধরনের সমাজবিরোধী ও হিংসাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে। কর্মপন্থাগুলো ঠিক করার সঙ্গে সঙ্গে পালন করতে থাকে বাঙালি বীরসেনারা। দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে এবং সম্মুখে এই কর্মপন্থাগুলো বলবর্ধক হিসেবে কাজ করেছে মুক্তিবাহিনীর জন্য।

দেশ স্বাধীনের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই কর্মপন্থা ঠিক করা হয়, যা বাস্তাবায়ন শুরু হয় ইতিহাসের স্মরণীয় মাস মার্চ থেকেই। আমাদের মহান নেতা জাতির স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ দেন এই মার্চে। দেশ স্বাধীনের ঘোষণা দেওয়ার পরই বঙ্গবন্ধুকে প্রেফতার করে পাকিস্তানিরা। তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে রাখা হয়। সেই দিন থেকে আমাদের মহান নেতা ২৮৮ দিন পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে থাকেন। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের রাতেই বাংলাদেশে পাকিস্তানি হায়েনারা গণহত্যা চালায়। ২৫ মার্চ জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস পালন করছি আমরা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকাশ থাকে যে, আমাদের জাতির পিতা দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এই মার্চ মাসেই। তার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। এই মহান নেতাও জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। তাই বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও বাংলাদেশে স্বাধীনতা একই সুতায় গাঁধা।

২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের কবল থেকে মুক্তির আশায় মানুষ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করলেও অল্পকালের ব্যবধানে দুটি পৃথক ভূখণ্ডে পাকিস্তান রাষ্ট্রের যৌক্তিকতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। এ যেন ফুটন্ত কড়াই থেকে জলন্ত উনুনের অবস্থা বাঙালির জন্য। ব্রিটিশ শাসন বিদায় নিয়ে এলো পাকিস্তানি শোষণ-নিষ্পেষণ। ঢাকার টাকায় পশ্চিম পাকিস্তানি শহর রাওয়ালপিন্ডি, লাহোর ও করাচিতে গড়ে উঠতে লাগল সুরম্য প্রাসাদ। পশ্চিম পাকিস্তানিদের তুলনায় শিক্ষা, চাকরি, সম্মান ও মর্যাদা—সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে দেওয়া হলো বাঙালিকে। গড়ে উঠতে থাকল বৈষম্যের বিরাট দেওয়াল। বাঙালির স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার লড়াই তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষা অন্দোলন, আইয়ুববিরোধী অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনের লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা বাঙালিকে একাত্তরে মুক্তির সাধ এনে দেয়। এসব লড়াইয়ে যিনি মহানায়ক ও বাঙালির মুক্তির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমাদের প্রাণের পুরুষ। তিনিই বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রকৃত কান্ডারি।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x