উন্নয়নের সুষম বণ্টন: একটি পর্যালোচনা

উন্নয়নের সুষম বণ্টন: একটি পর্যালোচনা
ফাইল ছবি

বিংশ শতাব্দীর নির্যাতিত, নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের জন্য যারা আমৃত্যু আন্দোলন-সংগ্রাম করে শহিদ হয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নাগপাশ থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করে শুধু একটা দেশই উপহার দেননি; ’৭১-এর পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো ভেঙে পড়া একটি নতুন রাষ্ট্রের করুণ অবস্থা, সদ্য স্বাধীন হওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে একটি যুগোপযোগী রূপরেখায় দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির গুপ্ত মন্ত্রণা ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় নেতৃত্বের বাতি ক্ষণিকে নিভে যায়।

আজ বাংলাদেশ এসে দাঁড়িয়েছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারে। গত দুই দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের যে কোনো সূচকের বিচারে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের দিক যে, স্বাধীনতার পঞ্চাশটি বছর পেরিয়েও বৃহত্ উন্নয়নের সুষম বণ্টন বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বাড়লেও দেশে ধনী-গরিব বৈষম্য বেড়েছে। প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে সবাই পাচ্ছে না। সুবিধা তুলনামূলক বেশি পাচ্ছে সমাজের সচ্ছল শ্রেণি। গরিব শ্রেণির কাছে প্রবৃদ্ধির সুফল অধরা থেকে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম স্বপ্ন ছিল একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার, যেখানে থাকবে না ঘুষ-দুর্নীতি, অনাচার, কুসংস্কার ও ধর্মীয় মতভেদ। তিনি একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাঙালিকে একটি উন্নত সমৃদ্ধ মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সাহিত্য সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি সর্বত্রই একটি কথা বলি, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। সোনার মানুষ আকাশ থেকে পড়বে না, নিজকে গড়তে হবে।’ দেশের গণতন্ত্রকামী দেশপ্রেমিক মানুষ মাত্রই চায় নিজ দেশের উন্নয়ন বাড়ুক, সম্পদ বাড়ুক, কিন্তু সেই উন্নয়ন ও সম্পদের বণ্টন হতে হবে সুষম। এই বণ্টন হতে হবে ‘নৈতিক সমতার’ ভিত্তিতে। বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন ছিল এদেশের সব পেশার মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরের সার্বিক উন্নতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এক গভীর মানবিক সংগ্রামী দর্শন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার লড়াই ছিল আপসহীন। অতএব, যে কোনো সভ্য জাতি ও কল্যাণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো মানুষ মাত্রই গুরুত্বপূর্ণ, রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণে সবাই সমান। কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে প্রয়োজন সম্পদ ও উন্নয়নের সুষম বণ্টন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা রাষ্ট্রের অবহেলিত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের লক্ষ্যে গ্রামীণ কৃষক ও কৃষিবান্ধব নীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান। যেমনটা শিক্ষার হার বেড়েছে, তেমনটা শিক্ষিত বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুষ্ঠু প্রকল্প ফিরে আনবে উন্নয়নের প্রতি তরুণ সমাজের আস্থা।

শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে সরকারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত বদ্বীপ পরিকল্পনা, ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনের জন্য অবশ্যই সামাজিক-রাজনৈতিক ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অপরিহার্য এবং তা একমাত্র সম্ভব সবার অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত সাপেক্ষে উন্নয়নের সুষম বণ্টনের ভিত্তিতে বাংলাদেশে আর্থসামাজিক উন্নয়ন।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x