দেশ গড়ার সংগ্রামের ইতিবৃত্ত

দেশ গড়ার সংগ্রামের ইতিবৃত্ত
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বাঙালির হাজার বছরের আশা-আকাঙ্ক্ষা, বৈষম্য-বিক্ষোভ ও আবহমান ঐতিহ্যকে নিজের চেতনায় আত্মস্থ করেছেন বঙ্গবন্ধু। বাঙালির মুক্তির জন্য নিজের জীবনের সুখ-দুঃখের প্রতি তিনি কখনো তাকাননি। শৈশব থেকেই তিনি বাঙালির মুক্তির কথা ভেবেছেন। স্কুলের ছাত্র অবস্থায়ই শেখ মুজিব জেল খেটেছেন। নিজের শিক্ষাজীবন নষ্ট করেছেন বাঙালির খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার ও দাবি আদায়ের সংগ্রামের জন্য। স্কুলে পড়ুয়া অবস্থায় সাত দিনসহ সর্বমোট ৪ হাজার ৬৮২ দিন শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে কাটিয়েছেন।

ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, আবেগ-আকাঙ্ক্ষা তার ছিল না। বাঙালির সুখ-দুঃখই ছিল তার সুখ-দুঃখ। বুকফাটা আর্তনাদ-অন্তর্দহনে তার হূদয় থেকে রক্তক্ষরণ হলেও বাঙালি মুক্তির কথা ভেবে তিনি তা প্রকাশ করেননি। বার বার সুযোগ পেয়েও তিনি ক্ষমতার চেয়ারে বসেননি। সাত কোটি বাঙালির চূড়ান্ত মুক্তির জন্যে বারবার তিনি নিজের জীবন বাজি রেখেছেন। ২৬ মার্চ কালরাত্রে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তিনি সাত কোটি বাঙালিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন, বাঙালির চূড়ান্ত মুক্তির কথা ভেবেই বন্দিত্বকে বেছে নিয়েছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি অবস্থায় বঙ্গবন্ধু ‘রাজনীতির কবি’ উপাধি পেয়েছেন। ৭ই মার্চের ভাষণেই তিনি বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশল জানিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু সময়ের প্রভাবশালী নিয়ামক, কিংবদন্তি এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাঙালির মুক্তির দিশারি। তার সমগ্র জীবনই ত্যাগ ও উদারতায় পরিপূর্ণ। তার সকল কর্মে, সব পদক্ষেপেই মহানুভবতার দৃষ্টান্ত, শোষিত-শৃঙ্খলিত মানুষের মুক্তির বার্তায় পরিপূর্ণ। যে কোনো বাঙালির স্বীকৃতিকেই তিনি নিজের স্বীকৃতি মনে করতেন। বাংলার মানুষও স্বদেশ ও দেশপ্রেমকে তার মধ্যে উপলব্ধি করেছেন। তখনকার সাত কোটি মানুষের পরিবারের সবাই ছিল তার স্বজন, আপনজন, আত্মার আত্মীয়। তিনি ছিলেন সেই পরিবারের প্রধান। প্রত্যহ, জীবনের অন্তিমমুহূর্ত পর্যন্ত দেশ ও দেশবাসীর প্রতি আত্মনিবেদনে উন্মুখ ও অবিচল শেখ মুজিবুর রহমান বারবার প্রায় মন্ত্রোচ্চারণের মতো বলেছেন, আমার দেশের জনসাধারণকে আমি ভালোবাসি, তারাও ভালোবাসে আমাকে। এই বাক্য উচ্চারণের সময় গর্বে ভরে উঠত তার বুক।

বঙ্গবন্ধু, বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। তিনি ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্রের নামকরণেরও জনক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শোষিত-শৃঙ্খলিত মানষের মুক্তির অন্যতম মহানায়ক। যত দিন যাচ্ছে ততই শানিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর লড়াই-সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষার ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা দিয়েছেন বলেই বাংলার মানুষ আজ পেট ভরে ভাত-মাছ খায়। উত্সবে নতুন জামা-কাপড় পরে। বাংলাদেশ পোশাক, মাছ, চাল রপ্তানি করে। বঙ্গবন্ধুর সোনার ছেলেরা আজ ক্রিকেট খেলে, বিশ্বকাপ মাতিয়ে বেড়ায়। বঙ্গবন্ধুর জন্যই বাঙালিরা আজ বাংলা ভাষায় বিশ্বে মাথা উঁচু করে কথা বলে। বঙ্গবন্ধুর প্রাণের জাতীয় সংগীত আজ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীত। বঙ্গবন্ধুর পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেতু। বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে এগিয়েছে, এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন বলেই আজ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র।

বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতিটি স্তরেই রয়েছে সুখী-সমৃদ্ধি বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামের ইতিবৃত্ত, বাঙালি জাতির মুক্তির সাধনা। বঙ্গবন্ধুই কালোত্তীর্ণ মুক্তি-দর্শনের পথ। বাঙালি উন্নত জীবনের অধিকারী হোক, বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক—এই ছিল বঙ্গবন্ধুর আজীবন কামনা। বঙ্গবন্ধুই একমাত্র বাঙালি, যিনি একটি স্বাধীন দেশ, স্বাধীন জাতি, স্বাধীন চেতনা, স্বাধীন ভাষা, স্বাধীন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলার ইতিহাসে অনেক মহান ব্যক্তিই রয়েছেন, যারা বাঙালির মুক্তির জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, নিজের জীবন উত্সর্গ করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মতো কেউ জীবনের প্রতি ক্ষণে, প্রতি মুহূর্তে, প্রতি নিঃশ্বাসে বাঙালির কথা ভাবেননি। সমগ্র বাঙালির জীবনবোধকে নিজের জীবনবোধ বলে উপলব্ধি করেননি। তাই, বঙ্গবন্ধু ব্যতিক্রম, অনন্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।

১৭ মার্চ ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। বাঙালি আজ বঞ্চিত তার স্নেহ, সান্নিধ্য ও নেতৃত্বে থেকে। বঙ্গবন্ধুকে সশরীরে না পেলেও তার নির্দেশনা, স্মারক, গ্রন্থ, ভাষণ ও অন্যান্য কর্ম থেকে বাঙালি মুক্তির পথ দেখে। বাঙালি এখনো বঙ্গবন্ধুকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি, প্রতিক্ষণে তার আদর্শ অনুভবে রাখতে পারেনি। তবে, বাঙালি ভুলে নাই, ভুলবে না কোনো দিন আগস্টের সেই কালরাত্রির কথা। বাঙালি ভুলে নাই ‘বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারণের ফলে নষ্ট-পথভ্রষ্টদের হাতে লক্ষ-কোটি মুজিবপ্রেমীর নিগৃহীত, আঘাত-নির্যাতনে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার কথা। বঙ্গবন্ধু আছেন বাঙালির হূদয়ে, মননে, চেতনা ও মুক্তির দর্শনে। এদেশের জনগণ আজও ভাবে বঙ্গবন্ধু, বাঙালি ও বাংলাদেশ অভিন্ন। মুজিবের আদর্শই বাঙালি সমাজের বৃহত্তর ঐক্যের প্রতীক।

এই দিনটি উত্সাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দের। ১৭ কোটি বাঙালির জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালনের দিন। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোর দিন। বঙ্গবন্ধুর জয়ধ্বনিতে উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হওয়ার দিন। স্বাধীন বাংলার আকাশ-বাতাস, চন্দ্র-তারার সুখের দিন। আজ যদি জাতির পিতা দেখতেন, বিশ্ববাসী তাকে কতটা ভালোবাসে। কতটা মহান আনন্দ-চিত্তে বাঙালি তার জন্মদিন পালন করছে। তাহলে বাঙালি আরও গর্বিত হতো। কতিপয় ঘৃণিত খুনি চক্রকে ঘৃণা জানিয়ে সশ্রদ্ধ চিত্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে জানাই শুভ জন্মদিন।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x