কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর উত্তরণ ও বাংলাদেশ

কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর উত্তরণ ও বাংলাদেশ
[ফাইল ছবি]

ঔপনিবেশিক রাজনীতির প্রান্তিক লগ্নে নেতৃত্ব হস্তান্তরের মহারণে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আর রায়টের কুরুক্ষেত্র ভারতবর্ষের অধুনাতন শহর কলকাতায় রাজনৈতিকভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের উন্মেষ ঘটে। পরোপকারী, আপসহীন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও নেতৃত্বগুণে পরিপূর্ণতার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক স্কুলে অধ্যয়নকালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীর আনুকূল্য পেতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের সহচর্যে আসার প্রবল আগ্রহ ও প্ররোচনায় কলকাতার তত্কালীন প্রখ্যাত ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন তেজোদীপ্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। প্রবল সাহসী কিন্তু শিক্ষাগুরুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র-শিক্ষকদের আস্থায় মুজিব হয়ে উঠলেন।

ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান এবং জনসাধারণের চাওয়া-পাওয়াকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি যখন দিন-রাত নিজের খাওয়াদাওয়া ভুলতে বসেছিলেন, তখনই শিক্ষকদের নজর পড়ল শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর। তাই শিক্ষকদের নির্দেশ ছিল তাকে নিজের ওপর নজর রাখতে হবে। আব্দুস সাত্তার, যিনি পরে এমএলএ ছিলেন, তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রুমমেট। সাত্তার সাহেবের একান্ত বন্ধু নীহাররঞ্জন চক্রবর্তী। বাংলাদেশের চাঁদপুরের মানুষ মি. চক্রবর্তী কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন করে কলকাতায় আসেন। মুক্তিযুদ্ধে কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে সহযোগিতার ক্ষেত্রে যার অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে, তিনি তার বাসভবনে বসে বলছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার চার বছরের বড় হলেও আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন অসুস্থতার কারণে তিনি আইএ ক্লাসে পড়তেন। তবে তার অসাধারণ নেতৃত্বগুণের কারণে আমরা তার কথা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।

নীহাররঞ্জন অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে বলেন, বাঙালি ছাত্রদের পক্ষে মুজিব ছিলেন ধর্মের ঊর্ধ্বে। কী ভীষণ সাহসী সুপুরুষ! তাকে না দেখলে অনুমান করা কঠিন। অবশ্য আব্দুস সাত্তার ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের স্নাতক পর্যায়ের সহপাঠী। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন গোপালগঞ্জের স্কুলজীবনের সহপাঠী শাহাদাত্ হোসেন। টুঙ্গিপাড়ার গিমাডাঙ্গা গ্রামের দরিদ্র বচন মিয়ার সহজ-সরল ছেলে শাহাদাত্ হোসেনের বেকার হোস্টেলের আর্থিক ভার নিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বেকার হোস্টেলের তিনতলার দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নারের ২৪ নম্বর কক্ষটি ছিল কলকাতার তখনকার মুসলিম ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার। এই কক্ষ থেকেই নির্ধারণ করা হতো ছাত্র আন্দোলনের রূপরেখা।

তত্কালীন বিশ্বের সেরা আইনজীবীদের একজন ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কতটা থাকলে উচ্চমাধ্যমিকের একজন ছাত্র তার তত্ত্বাবধানে যুক্তিসংগত রাজনৈতিক তর্কে অংশ নিতে পারে? একজন ছাত্রনেতা থেকে রাষ্ট্রের অধিকার নিয়ে তীক্ষ, ধারালো ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা এসেছে মূলত ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের কৌশলী আন্দোলনের প্রবক্তাদের সান্নিধ্য পাওয়া ও প্রভাবিত হওয়ার কারণেই। শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ জনগণের জন্য নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেননি বাল্যকাল থেকেই। তা আরো জাগ্রত হতে লাগল যখন কলকাতায় সরাসরি দেখলেন মহাত্মা গান্ধীর অহিংস মতবাদ ও সত্যগৃহ আন্দোলনে জনসাধারণকে কেমন করে সম্পৃক্ত করা যায়।

কলকাতার তত্কালীন প্রাণপুরুষ যিনি বিশ্বরাজনীতিতে ঝড় তুলেছিলেন, সেই নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ভারতবর্ষের শিক্ষা পরিকল্পনা, নারী মুক্তি, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, কৃষ্টি ও শিক্ষা ভাবনাকে আধুনিকায়ন করে কীভাবে ভারতবর্ষের চূড়ান্ত মুক্তি অর্জন করা যায়, সেই রূপরেখা প্রত্যক্ষ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। সুভাষ চন্দ্রের বলিষ্ঠ আদর্শিক নেতৃত্ব কীভাবে মানুষকে আলোড়িত করে মুক্তির নেশা জাগিয়ে চূড়ান্ত সফলতায় পৌঁছানো যায়, তা বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনে নিয়েছেন একান্তভাবে। মানুষকে কীভাবে জাগিয়ে তোলা যায়, কীভাবে আন্দোলনকে দুর্বার গতিতে সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা যায়, বঙ্গবন্ধু তার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মাধ্যমে।

বঙ্গবন্ধু নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের অনুরক্ত ছিলেন ইসলামিয়া কলেজে পড়াকালীন। নেতাজি এলগিন রোডে গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় একবার শেখ মুজিবুর রহমান তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, যা ঐ সময়ের নিরাপত্তারক্ষীদের আশ্চর্যের বিষয় ছিল। বাঙালির রাজনীতির প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের সব উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হলেন—মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাশ ও নেহরু। শেখ মুজিবুর রহমান এসব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আলোকিত দিকগুলো গ্রহণ করেছেন প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪২ সালে এন্ট্রাস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে আইএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। তত্কালীন মুসলিম ছেলেদের জন্য প্রভাবশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো ইসলামিয়া কলেজ। আবাসস্থল হলো বেকার হোস্টেল। রাজনীতির আদর্শস্থান হিসেবে পেলেন বেকার হোস্টেলকে তিনি।

রাজনীতি করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শস্থান হয়ে উঠল বেকার হোস্টেল, যেহেতু তিনি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে পড়াকালীন ১৯৩৮ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পরিচত হন। শেখ মুজিব তাদের সংবর্ধনায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। সেই সঙ্গে তিনি তার সাহসিকতা ও যোগ্যতার প্রমাণ ঐ সময়ে দিয়েছিলেন। তাই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার বিস্তারিত তথ্য নিয়েছিলেন। শেখ মুজিবকে কলকাতা আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ফলে কলকাতা ছিল শেখ মুজিবের জন্য রাজনীতি করার আদর্শ জায়গা। এদিকে ফজলুল হক সাহেব মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলে ১৯৪৩ সালে খাজা নাজিম উদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। এ সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বেসরকারি সরবরাহ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন। রাজনীতির গুরু সোহরাওয়ার্দী এ দায়িত্ব পাওয়ার পর বিভিন্ন দিক দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতি করার সুযোগ প্রসারিত হতে লাগল। এভাবে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উন্মেষকাল।

ভারতবর্ষের সংস্কৃতির তীর্থভূমি কলকাতায় অবস্থানকালে (১৯৪২-১৯৪৭) তত্কালীন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নির্যাস সাহিত্যের ধ্রুপদি সৃষ্টির রস ও প্রগতিবাদী সংগীত বঙ্গবন্ধুকে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের দিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঈশ্বরচন্দ্র, মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা ও সাহিত্য বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের উদ্রেক করে। প্রাজ্ঞ, রাজনীতিসচেতন ব্যক্তিদের সান্নিধ্য শেখ মুজিবুর রহমান নিজের জীবনে সচেতনভাবে সন্নিবেশ করেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও খুব কাছ থেকে তার বাবা বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন রপ্ত করেছেন। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে শত্রুতা নয়’ এমন অমোঘ মানবতার দর্শনে বিশ্বাসী শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখেছেন নিবিঢ়ভাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের চাওয়া ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, করিডর সমস্যার সমাধান, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নসহ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

লেখক: প্রথম সচিব (প্রেস), বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন, কলকাতা

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x