স্মৃতিগল্প 

মহামানবের তীরে

মহামানবের তীরে
ফাইল ছবি

খড়ের গাদার মাথায় উঠে সামনে তাকাল। ঐ তো দেখা যাচ্ছে গাড়ির জোড়া হেডলাইটের আলো। এগিয়ে আসছে এদিকেই। মনটা নেচে উঠল বাবলুর। সোল­াসে চিৎকার করে উঠল: আসছেন। তিনি আসছেন।

গাদার নিচে তার অন্য বন্ধুরা। কয়েকজন প্রায় সমবয়সি কিশোর শুয়ে গড়িয়ে বসে। বাবলুর চিত্কারে উঠে দাঁড়াল। জিপের আওয়াজ তারাও পাচ্ছে। আনন্দে তাদেরও মন নেচে উঠল। বাবলু ওপর থেকে তখন চেঁচাচ্ছে: লিডার আসছেন।

স্মৃতিগল্প : মহামানবের তীরে

এক লাফে সে ওপর থেকে নেমে এলো। উত্তেজনায় টগবগ ফুটছে। নিচে নেমে আসতে না আসতেই আর্ত চিৎকার। চমকে উঠল সবাই।

খড়ের গাদায় শুয়েছিল আবদুল হাই। লিডার আসছেন শুনেই সে ধড়ফড় করে উঠতে যাচ্ছিল। এ সময়ই খড়ের গাদায় লুকনো সাপের ছোবল।

বাবলুর মাথায় চট করে বুদ্ধি খেলে গেল। পরনে তার সদ্য কেনা নতুন শার্ট। আর কিছু ভাবার সময় নাই। কালবিলম্ব না করে সে তার গায়ের শার্টটাই এক টানে ফরফর করে ছিঁড়ে ফেলল। তাই দিয়ে বাঁধল আবদুল হাইয়ের হাত।

বাবলু এসে দাঁড়াল রাস্তার মাঝখানে। এই পথে নেতা গিয়েছেন। আবার তিনি এত রাতেও এই পথেই ফিরছেন। রাত যতোই হোক, তিনি ফিরছেন। নেতা এখন একজনই। তিনিই বঙ্গবন্ধু।

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আগমনী বার্তা: বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টি ও মুক্তির পথে চূড়ান্ত যাত্রা  

সিরাজগঞ্জের বেলকুচি চৌহালি থানার বন্যার্ত মানুষগুলোর দুর্দশা দেখে তাদের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে দিতে এসেছেন নেতা। ভোর থেকেই ওয়াপদা বাঁধের চালায় মানুষের ঢল। প্রিয় নেতাকে এক ঝলক দেখতে। তাঁর মুখের কথা শুনতে।

বঙ্গবন্ধু ঢাকা থেকে ঠিক সময়েই রওয়ানা দিয়েছিলেন। আসার পথে জায়গায় জায়গায় জনসমাবেশে বক্তৃতা দিতে হয়েছে। তিনি যখন ওয়াপদা বাঁধের চালায় এসে পৌঁছালেন, তখন সূর্য প্রায় ডুবু-ডুবু। তখনো উত্তাল জনতা।

এখানে ভাষণ দেয়ার পর বঙ্গবন্ধু রওয়ানা দিলেন দীঘলকান্দির দিকে। এই চালা থেকে ১৫-২০ মাইল দূরে। উঁচু-নিচু এবড়ো-থেবড়ো মাটির পথ। এখন এত রাতে বঙ্গবন্ধু সেই একই জিপে একই পথে তাঁর সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে ফিরছেন। সারা দিন হয়ে এত রাত পর্যন্ত প্রায় অভুক্ত।

বাবলুরা বঙ্গবন্ধুর ফেরার প্রতীক্ষায়। জিপের হর্নের আওয়াজে সচকিত হয়ে উঠল সবাই। রাস্তায় এসে দাঁড়াল ওরা। জিপ ওদের সামনে থামল। বাবলু এগিয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু বাবলুকে ভালো করেই চেনেন। তিনি এত রাতে রাস্তার ওপর এভাবে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ জানতে চাইলেন। বাবলু কারণগুলো জানাল। আবদুল হাইকে সাপে কাটার ঘটনাটাও শোনাল।

অমর অবিনশ্বর বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে এলেন। আবদুল হাইকে দেখে ওকে গাড়িতে ওঠাতে বললেন, তিনি তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গীদের একজন খানিকটা আপত্তি জানিয়ে বললেন, এ ছেলের চিকিত্সা এরাই স্থানীয়ভাবে সেরে নিতে পারবে।

এ কথা শুনেই বঙ্গবন্ধু প্রচণ্ড খেপে গেলেন। ড্রাইভারকে ডেকে বললেন: এ ছেলেটাকে আপনি আমার সিটে বসিয়ে নিয়ে যান। সিরাজগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করে দিবেন। আমি উনাদের সাথে যাব না। এই ছেলেদের সাথেই এখানে আছি। পারলে কাল সকাল আটটায় এখানে এসে আমাকে নিয়ে যাবেন। তা না হলে এই ছেলেরাই আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে।

তিনি আর কোনো দিকে তাকালেন না। ওয়াপদা বাঁধ থেকে সোজা নেমে গেলেন যমুনার ঢালে। চন্দ্রপ­াবিত যমুনার অথৈ জলের দিকে নির্ণিমেষ তাকিয়ে রইলেন। আর সবাই বাকরুদ্ধ বিমূঢ় দাঁড়িয়ে।

খানিক পর বাবলু সাহস সঞ্চয় করে বঙ্গবন্ধুর পাশে এসে দাঁড়াল। তাঁর হাত স্পর্শ করে বলল: রাগ করবেন না। আপনি গাড়িতে বসুন। আমরা দেখছি কীভাবে ওকে পাঠাতে পারি।

বঙ্গবন্ধু আর দ্বিরুক্তি করলেন না। তিনি জিপে উঠে তাঁর সিটে বসলেন। আবদুল হাইকে তাঁর কোলে তুলে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।

বঙ্গবন্ধুর জেলজীবনের খতিয়ান

হাইকে নিজের কোলেই তুলে নিলেন বঙ্গবন্ধু। গাড়ির পেছনে স্থানীয় একজনকে নিলেন গাইড হিসেবে। সিরাজগঞ্জ হাসপাতালে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত সাড়ে তিনটা। হাসপাতালে তখন ডাক্তার নেই। শহরেই তাঁর বাসা। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধু এলেন ডাক্তারের বাসায়। তাঁকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে এলেন হাসপাতালে। আরেক সমস্যা। রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় যে ইনজেকশন তার স্টক নেই হাসপাতালে। এবার ফার্মেসির খোঁজ। ফার্মেসির শাটারে তালা। পাশের দোকানের একজনকে পাওয়া গেল যে ফার্মেসির মালিকের বাসা চেনে। তাকে সঙ্গে নিয়ে সেই বাসা থেকে মালিককে নিয়ে এসে ফার্মেসি খুলে ইনজেকশন সংগ্রহ এবং হাসপাতালে ডাক্তারের হাতে পৌঁছে দেয়া হলো। পুরো দৌড়-ঝাঁপের কাজগুলো বঙ্গবন্ধু নিজে করলেন।

ইনজেকশন পুশ করার খানিক পর আবদুল হাই চোখ খুলে তাকাল। বঙ্গবন্ধু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।ওরা সবাই তো তাঁরই স্বজন।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x