বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২০, ২৮ আষাঢ় ১৪২৭
২৮ °সে

রাজস্ব আয়ের সর্বোচ্চ খাত তামাক থেকেও আয়ে পিছিয়ে এনবিআর

স্থিতিশীল নীতিমালা জরুরী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
রাজস্ব আয়ের সর্বোচ্চ খাত তামাক থেকেও আয়ে পিছিয়ে এনবিআর
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)

সরকারের রাজস্ব আয় নিশ্চিত করতে স্থিতিশীল নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ । রাজস্ব আয়ের বড় খাতগুলোকে সঠিক নীতিমালার আলোকে দেখলে রাজস্ব আদায় বাড়বে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন জরুরি।

বৈশ্বিক মহামারীর সময়ে দেশের আর্থিক খাতের সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রাজস্ব খাতের দিকে নজর বাড়াতে হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ ভবিষ্যতে অর্থনীতি চরম বাস্তবতার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে, যার প্রভাব হতে পারে মারাত্মক। তাই আসন্ন এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে সহযোগিতা প্রদানের লক্ষ্যে বড় ধরণের রাজস্ব ঘাটতি কাটিয়ে আনতে কেমন কর ব্যবস্থা করতে হবে, তা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদেরকে এখনই নির্ধারণ করতে হবে। কারণ, সরকারের আয়ের বৃহত্তম উৎস হচ্ছে কর। সেজন্যই অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে রাজস্ব খাত সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নীতিনির্ধারকদের এই খাতেই বিশেষ করে বৃহত্তর আয়কর ইউনিটের (এলটিইউ) দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের এলটিইউ খাতের অন্যতম বৃহত্তম অংশ হলো তামাক শিল্প। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে এই খাত থেকে সরকারের আয় হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা, যা ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের তুলনায় ২৫% বেশি। কোন একটি বিশেষ খাত থেকে জাতীয় কোষাগারের জন্য এই আয়ই সর্বোচ্চ। এই শিল্প থেকে বিগত পাঁচ বছরে প্রায় ১৫% যৌগিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার (সিএজিআর) বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসামঞ্জস্য ভাবে তামাক পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সরকারে রাজস্বও কিছুটা কমে যাচ্ছে। এছাড়া প্রিমিয়াম, উচ্চ এবং মধ্যম স্তরের সিগারেটের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় তামাকের বাজারেও দেখা দিয়েছে মন্দা। যার ফলে এই খাতের রাজস্ব আদায়ের হারও আশানুরূপ হতে পারেনি, যা জুলাই ২০১৯ থেকে মে ২০২০- এই এগার মাসের হিসেব বিশ্লেষণ করলেই পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে উঠে।

এদিকে, প্রিমিয়াম, উচ্চ এবং মধ্যম স্তরের তামাক পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রাহক নিম্ন স্তরের তামাক পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এর একটি বিশেষ কারণ হতে হচ্ছে, নিম্ন স্তরের তামাক পণ্যের যে দাম বেড়েছে তা করের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাবই পড়ে নি। ফলে গ্রাহকদের জন্য নিম্ন স্তরের তামাক পণ্য বেছে নেওয়াটাই খুব সহজ হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভেস (জিএটিএস) থেকে পাওয়া ২০০৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ধূমপানের মাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা থেকে পণ্য পরিবর্তন সম্পর্কিত তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছে। এতে দেখা যায়, বেশি দামি ব্র্যান্ডের সিগারেট ছেড়ে কম দামি ব্র্যান্ডের সিগারেটের দিকে ঝুঁকে আসা গ্রাহকের হার ২০০৬ এ ছিল মাত্র ২৮%, ২০১৭ সালে এসে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯% এ।

এর ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, নিম্ন স্তরের তামাক পণ্যের বাজার এখন মোট বাজারের ৭২% (৫ হাজার কোটি শলাকা) দখল করে নিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথমেই যে চিন্তা আসে, তা হলো সরকারের রাজস্ব হারানো। যেখানে কী না অতি সম্প্রতি ২০২০-২১ সালের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে রাজস্ব হারানোর কোন সুযোগ নেই।

উচ্চ স্তরের (৮১%) তামাক পণ্যের তুলনায় নিম্ন স্তরের (৭৩%) তামাক পণ্যের মূল্য ও করের পরিমাণ কম হওয়ায় তামাক খাতে সরকার বড় অংকের রাজস্ব হারাতে যাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রাহকের ক্রয় অভ্যাস পরিবর্তনের কারণে সরকার মধ্যম মানের তামাক পণ্যের করও হারাতে যাচ্ছে, যা থেকে এই শিল্পের প্রায় ৪০% কর আসার কথা। একই সাথে নিম্ন স্তরের তামাক পণ্যের কর কম থাকায় তামাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কর ফাঁকির ফাঁক ফোঁকর বের করে ভোক্তাদের নিচের দামে নামিয়ে আনতে চেষ্টা করছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্বও হারাবে।

কেননা এ মূল্যবৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি ও জাতীয় আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাছাড়া বর্তমান বাজেটে নিম্ন স্তরের সিগারেটের উপর যে কর আরোপ করা হয়েছে এটি বাস্তবায়ন হলে সিগারেট সেবনের হারও আরও বাড়বে (বিশেষত তরুণদের মধ্যে)। তামাকের মতো স্বাস্থ্য হানিকর পণ্য থেকে তরুণ সমাজকে দূরে রাখতে নিম্ন স্তরের তামাক পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি করে ধূমপান সামগ্রীর দাম তরুণ প্রজন্মের নাগালের বাইরে রাখা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তাই বলা যায়, ধোঁয়াবিহীন তামাকের মূল্য ও কর বৃদ্ধি হলেও নিম্ন স্তরের তামাক পণ্যের কর বৃদ্ধির প্রস্তাবনা অত্যন্ত হতাশাজনক। ফলে কোম্পানির মুনাফা বাড়ানোর জন্য এ যেন বরাবরের মতোই শুভংকরের ফাঁকি।

এছাড়াও, বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে সিগারেটের বৈধ বাজারের ১%-৬% দখল করে নিয়েছে অবৈধ সিগারেট এবং গত কয়েক বছরে ধরে এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০১৮ সালের জুনে কর বৃদ্ধির ফলে, সরকারকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশে বাজার মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে সিগারেট বিক্রি করে অনেক বেশি লাভবান হয়েছে অবৈধ তামাক পণ্য ব্যবসায়ীরা।

এর ফলে একদিকে সরকারের রাজস্ব কমছে, অন্যদিকে নিম্ন মানের সস্তা তামাক পণ্য গ্রহণের কারণে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয়ও বেড়ে চলেছে।

তবে, সব ধরণের সমস্যারই কোন না কোন সমাধান রয়েছে। এটি গ্রাহককে পণ্য পরিবর্তনের সুযোগ করে দেয় অনেক বেশি। এক্ষেত্রে সরকার যদি নিম্ন স্তরের সিগারেটে প্রতি প্যাকেটের (১০ শলাকার প্যাকেট) মূল্য ৪২ টাকা নির্ধারণ করে, তাহলে শুধুমাত্র তামাক খাত থেকেই সেক্ষেত্রে সরকারের সম্ভাব্য আয় হতে পারে ১০৯৫ কোটি টাকা।

চলমান মহামারীর কারণে সম্ভাব্য আর্থিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে সরকারের রাজস্ব খাতের সম্ভাব্য সব ধরণের আয় নিশ্চিত করতে এগিয়ে যেতে হবে। সেইসাথে করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠে দাঁড়াতে এবং দেশের স্বাস্থ্য খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হলেও এটি অত্যন্ত জরুরী।

সিগারেট খাত দেশের রাজস্ব আদায়ের সবচেয় বড় উৎস। দেশের অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ আয়ের সর্ববৃহৎ এই খাতের আয় নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে এখনই সঠিক রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। অবৈধ বাণিজ্য নির্মূল এবং শিল্পের স্থায়িত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় নিশ্চিত করতে স্থিতিশীল নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ইত্তেফাক/আরএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত