চলো খেলি

চলো খেলি
আশিকুর রহমান।ছবি: ইত্তেফাক

আশিকুর রহমানের জন্ম তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ায়। পিতার কর্মক্ষেত্রের বদলির কারণে শিক্ষাজীবন কাটিয়েছেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। পড়াশোনা শেষে ব্যবসাকেই পেশা হিসেবে নেন তিনি। তবে দেশপ্রেম আর দেশের জন্য কিছু করার ক্ষুধা কোনোভাবেই তাকে শুধু ব্যবসার গণ্ডির মধ্যে বেঁধে রাখতে পারেনি। খেলাধুলাও খুব ভালোবাসতেন। আর সে কারণেই তিনি শুরু করেন ‘চলো খেলি’।

আগামী ১৭ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া মুজিব জন্মশতবর্ষকে সামনে রেখে দারুণ একটি উদ্যোগ গ্রহণ করছে ‘চলো খেলি’। এই ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে নিয়ে আসছে ‘কালো মানিক’ খ্যাত ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি ফুটবলার পেলেকে। আশিক জানান, বাংলাদেশের ফুটবলের পুরোনো গৌরব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এবং এর ঐতিহ্যকে জাগ্রত করতে পেলেকে আনা হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকেই বাংলাদেশে আসতে পারেন এই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য এবারই প্রথম ‘চলো খেলি’র উদ্যোগে সংবর্ধনা দেওয়া হবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্যদের। তাদের সঙ্গে খেলা হবে প্রীতি ম্যাচ।

খেলা ও বিশেষ করে ফুটবলের প্রতি নিজেদের ভালোবাসা থেকে ২০১৩ সালে গড়ে ওঠে ‘ফুটি হাইগ’। এর শুরু থেকেই ছিলেন আশিকুর রহমান। সেই সঙ্গে এর সদস্য হন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের ফুটবলপ্রেমীরা। সেখান থেকেই নিজেদের দেশপ্রেম আর দেশের জন্য কিছু করার লক্ষ্যে পা বাড়ানো শুরু করেন। বেছে নেন দেশের ভবিষ্যত্ গঠনের মূল হাতিয়ার নতুন প্রজন্মকে। সেই চিন্তা থেকেই ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘চলো খেলি’।

তবে এটিকে শুধু শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়ার লড়াই করে যাওয়া কোনো সংগঠন বা ফাউন্ডেশন বললে হয়তো ভুল হবে। কেননা ট্রাস্টটি মূলত কাজ করে যাচ্ছে মূল চারটি বিষয়কে সামনে রেখে :শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিয়মিত খেলাধুলা ও সামাজিক উন্নয়ন। আর আশিকুর রহমানের বিশ্বাস, এই চারটি বিষয়ের প্রতিটি একে অপরের পরিপূরক। তাই একটিকে ছাড়া অন্যটিতে সাফল্য অর্জনও অসম্ভব। এ কারণেই ‘চলো খেলি’কে শুধু খেলাধুলাকেন্দ্রিক ট্রাস্ট বা ফাউন্ডেশন না বলে বরং দেশ ও সমাজের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাওয়া সংগঠনই বলা যায়।

আশিকুর রহমান বলেন, ‘মানুষের শরীর ও মন সুস্থ রাখতে নিয়মিত খেলাধুলা খুবই জরুরি। আগে বাবা-মা বাচ্চাদের খেলতে পাঠাতেন, আর এখন এই পরিস্থিতি পুরো উল্টে গেছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে মাঠের স্বল্পতা। আমরা চাই, তাদের সেই সুযোগ করে দিতে। খেলাধুলাই মানুষকে খুব তাড়াতাড়ি একত্রীভূত করার ক্ষমতা রাখে বলেই আমরা এর মধ্য দিয়েই পুরো কাজটা করতে চাচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘নিয়মিত খেলাধুলার জন্য দরকার সুস্বাস্থ্য। শহরের বাইরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশু-কিশোরদের স্বাস্থ্য, তথা পুষ্টির অভাব পূরণ করার লক্ষ্যেই কাজ করছে ‘চলো খেলি’ ট্রাস্ট। পাশাপাশি নবীনদের যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করছে ট্রাস্টটি।’

সাক্ষাত্কারের একপর্যায়ে আশিকুর রহমান বলেন, ‘ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এই দেশ আমাদের বাসস্থান দিল, উপার্জনের উপায় বের করে দিল, এত ভালো আর উন্নত জীবনব্যবস্থা দিল, কিন্তু এত কিছু পাওয়ার পরও আমরা এদেশের নাগরিক হিসেবে দেশকে কী দিয়েছি। আমি চাই, দেশকে কিছু দিতে, দেশের জন্য কিছু করতে। সেই চিন্তা থেকে চলো খেলি ট্রাস্টের পথচলা।’

এরপর তিনি বলেন, ‘আমি মূলত দুজনের কাছ থেকে কাজের উৎসাহ পাই। এক. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আর দুই. বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমার মনে করি, আমি হয়তো বাংলাদেশের সব শিশুর কাছে আমার কাজ পৌঁছে দিতে পারব না কিংবা এটা সম্ভবও না। তবে আমি চাই, আমার এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে অন্তত পরিবর্তনের দিকে বা উন্নতির দিকে পথচলার শুরু হোক।’

মুজিব জন্মশতবর্ষে কেনো পেলেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে আশিকুর রহমান জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই পেলের দারুণ ভক্ত ছিলেন। তার সময়ে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো নক্ষত্র ছিলেন এই ফুটবলার। তার মেয়ে শেখ হাসিনাও পেলের ভক্ত। তাই মুজিব জন্মশতবর্ষে কাউকে আনতে হলে পেলেই হবেন সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতেই পেলেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার চেষ্টা।’

শুধু খেলাধুলা কিংবা ফুটবল নয়, বরং বক্সিং, কারাতে, সাঁতারের মতো আরো মোট ১৮টি খেলা নিয়ে কাজ করতে যাচ্ছে ট্রাস্টটি। আগামী দশ বছর পর অন্তত ফুটবলে এশিয়ার দেশগুলোর বিরুদ্ধে জয় নিয়েই টিকে থাকবে বাংলাদেশিরা। এটাই এই ট্রাস্টের মূল লক্ষ্য। তাদের বিশ্বাস, জনসংখ্যাই আমাদের সবচেয়ে বড়ো শক্তি। এই ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে অনেকেরই প্রতিভা রয়েছে। আর আবিষ্কারের অভাবে তা দেশের কোনো কাজ আসছে না। তাই দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেই সব প্রতিভাবানদের খুঁজে বের করে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন তারা। আশিকুর রহমান জানান, ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ, তাদের খেলতে উদ্বুদ্ধ করা, সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে একটি সুন্দর সমাজব্যবস্থা গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছেন তিনি।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত