বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০, ৩১ আষাঢ় ১৪২৭
২৯ °সে

জীবন যুদ্ধে হার না মানা এক সৈনিকের গল্প

জীবন যুদ্ধে হার না মানা এক সৈনিকের গল্প
ছবি: সংগৃহীত

একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার পিছনে একটি গল্প থাকে। তেমনি এক গল্প হলো এটি। অথবা তারও কিছু বেশি। এই গল্প রূপকথাকে হার মানানো এক অপ্রতিরোধ্য সৈনিকের জীবনযুদ্ধে জয়ী হবার গল্প।

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের লোকাল ফেসিলিটেটর হিসাবে কাজ করছেন এক যুগ ধরে। তিনি বাংলাদেশের অত্যন্ত সফল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রধান নির্বাহী এবং হেড অব স্কুল হিসাবে কাজ করছেন ২০১৬ সাল থেকে। ২০১৯ সালে অন্তর্জাতিক বক্তা হিসেবে অংশ নেন মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শিক্ষা সম্মেলনে। একই বছর তিনি যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডুকেশন লিডারস কনফারেন্সে যোগ দেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও লক্ষ্য নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন এবং দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় আমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি আমন্ত্রিত হয়ে সবার জন্য শিক্ষা বিষয়ের ওপর বক্তব্য দিয়ে প্রায় ১০০ দেশের আমন্ত্রিত অতিথিদের কাছে প্রশংসিত হন। তিনি এরই মধ্যে ৩৩টি একাডেমিক বই রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। দেশের একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক বক্তা, আমাদের সম্পদ।

ইতিমধ্যেই নিজের গ্রামে বাবা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং সমাজ সেবক মোহাম্মদ আলী খানের দান করা জমির ওপর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছেন সমাজের সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য খুব সম্ভাবত পৃথিবীতে সর্বপ্রথম, সকল আধুনিক সুবিধাসহ কমপ্লিট ইংলিশ মিডিয়াম ইসলামিক ব্রিটিশ স্কুল ‘সালেহা স্কুল অব উইসডম’। বাবার নামে ‘মোহাম্মদ আলী খান এডুকেশন ফাউন্ডেশন’ নামে জয়েন্ট স্টক থেকে নামের ছাড়পত্র পাওয়ার সাথে সাথেই শুরু করেছেন সুবিধা বঞ্চিতদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ। প্রতিদিন ৩০ থেকে ১০০ জন ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য এক বেলা খাবার, শীতের কাপড়, শিক্ষার ব্যবস্থা ইত্যাদি করছেন। কিন্তু সব কিছুই তিনি করে যাচ্ছেন নিজের ব্যক্তি উদ্যোগে। নিজেকে সবসময় প্রচারণার আড়ালে রাখতে চাওয়া সৈনিকের জীবন যুদ্ধ অনেকটা সিনেমাকেও হার মানায়।

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগের শিক্ষাজীবন শুরু ১৯৮৭ সালে আমিরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস ওয়ানে ভর্তির মাধ্যমে। শিক্ষাজীবনে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে স্কলারশিপ পান। তিনি ১৯৯৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৯৯ সালে বরিশাল সরকারি হাতেম আলী কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ১৯৯৯ সালে বুয়েটের অধীন ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ এএম আইই (বিএসসি ইঞ্জি সিভিল) এ ভর্তি হন।

ছাত্র রাজনীতি ও কর্মজীবন

ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে বিএম কলেজে বাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ থেকে এক বছর পরে বিএম কলেজ এ বি এসসি অনার্সে ভর্তি হন এবং ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে কাজ শুরু করেন।

২০০১ সালে জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আনিসুর রহমান সোহাগের এলাকার একটি কুচক্রিমহল এবং তার বাবার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত কিছু খারাপ লোকজন তার বাবার বিরুদ্ধে ৩৩টি রাজনৈতিক মামলা দিয়ে তাদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে। ওই একই গ্রুপের বিএম কলেজে সীমাহীন অত্যাচারে তিনি বিএম কলেজ ছাড়তে বাধ্য হন এবং ঢাকায় এসে ঢাকা ইপিজেডে চাকরি নেন। কর্মক্ষেত্রেও তিনি বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হন এবং সে কারণে আরও তিনটি কোম্পানিতে চাকরি বদল করতে হয়েছে।

২০০৯ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশে এ ছোট্ট পরিসরে লোকাল বিজনেস পার্টনার হিসাবে কাজ করার সুযোগ পান এবং চাকরি ছেড়ে নিজের ব্যবসার সূচনা করেন। ২০১২ সালে মারিয়ট কনভেনশন সেন্টার লীজ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। আস্তে আস্তে ব্রিটিশ কাউন্সিলে কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। এক সময় দেশের প্রায় সকল এক্সাম ভেনু ইভিএম এবং ইডিএম’র কাজ করা শুরু করেন।

তার প্রাণের ক্যাম্পাস বিএম কলেজে প্রবেশ করতে বারবার ব্যর্থ হয়েও হার না মানা এই সৈনিক ২০১২ সালে ব্যবসায় আরও সফল হওয়ার জন্য ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশনে অ্যান্ড ইনফর্মেশন সিস্টেম ইউনিভার্সিটিতে (ইবাইস) এ ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ভর্তি হন এবং অনেক ভালো স্কোর নিয়ে ব্যাচেলর শেষ করে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ অর্জন করেন। ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-তে এমডিপি ইন এইচ আরএম প্রোগ্রামে চান্স পান এবং সেখান থেকেও কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিখ্যাত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীন সেলটা, ইউনিভারসিটি অব লিবারেল আর্টস ইউলাব এ এম এ ইন ইংলিশ এবং বিশ্ববিখ্যাত আরেক বিশ্ববিদ্যালয় গ্রিন উইচ এ পিএইচডি গবেষণা অধ্যয়ন করছেন।

তার স্বপ্ন ছিল বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে চাকরি করার, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে এখন তার হাত ধরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বের হচ্ছে, যারা আগামী দিনে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার সম্ভাবনাময় মেধাবী। তার কাজ করা বিদ্যালয় এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ইতিমধ্যে ও লেভেল এর প্রথম ব্যাচ ওয়ার্ল্ডের সর্বোচ্চ স্কোর ৯ (৯ এর মধ্যে) পেয়েছ।

এই শিক্ষকের ভাষায়, ‘আমি চাই. প্রতিটি ছাত্র এভাবে কঠোর অধ্যবসায় আর শ্রম বিনিয়োগ করে যাক। একদিন না একদিন সফলতা তাকে ধরা দিতে হবে। আমাদের সমাজে এভাবে প্রতিটি ছাত্র যদি তার নিজের অবস্থান থেকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য কাজ করে যায় ও স্বপ্ন দেখে, তাহলে একটি সুখি আর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন অনেকাংশে সহজ হবে। তাই সমাজের বিত্তবানেরা গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়ালে সমাজ হতে অপরাধ ও বেকার সমস্যা দূর হবে এবং তার পাশাপাশি সমাজের মঙ্গল সাধিত হবে। পরিশেষে বলতে চাই, আগে কর্ম তারপর ফলের আশা। যার মনে স্বপ্ন নেই তার জীবনের কোনো মূল্য নেই।’

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত