বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭
৩১ °সে

‘বাংলাদেশের রাজনীতি নারীবান্ধব নয়’

‘বাংলাদেশের রাজনীতি নারীবান্ধব নয়’
বাংলাদেশের রাজনীতি নারীবান্ধব নয়। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আরোমা দত্ত বলেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি নারীবান্ধব নয়। অথচ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামহ সকল গণতান্ত্রিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীরা গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক রাজনৈতিক দল সমূহের নিবন্ধন আইন ২০২০(প্রস্তাবিত) বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে অনলাইনে এক মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন তিনি। শনিবার (৪ জুলাই) বিকাল সাড়ে ৩ টায় এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সম্প্রতি ইলেকশন কমিশনকে আইন সংস্কারের প্রস্তাব বিষয় উল্লেখ করে আরোমা দত্ত বলেন, ‘এর মাঝে একটি গভীর ষড়যন্ত্র আছে।’ এটি কিভাবে কোন কোন দলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে হলো সেটি সকলকে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

দলগুলোর মতামত ছাড়া প্রস্তাবিত আইনের খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘গণতন্ত্র প্রক্রিয়াকে উল্টে দেওয়ার একটা বড় ষড়যন্ত্র।’ এ বিষয়ে ইলেকশন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ করে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে সচেতন থেকে প্রতিহত করার আহ্বান জানান আরোমা দত্ত।

উক্ত আলোচনা সভায় আলোচক হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন-সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিল, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য, সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি খালেকুজ্জামান, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর শম্পা বসু ও মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ঝর্ণা বাড়ই।

নারীদের সমঅধিকারের কথা উল্লেখ করে সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিল বলেন, ‘যার যতটুকু যোগ্যতা আছে, সে ততটুকু নিয়ে এগিয়ে যাবে। সেজন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ ও শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ, সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ থাকতে হবে।’

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩৩% থেকে ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাবে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন অসীম কুমার উকিল। মহামারির সংকটের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে আরপিও সংশোধনের বিষয়টি স্থগিত রেখে বরং করোনা সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতামূলক কাজ করে সরকারকে সহায়তা করার আহ্বান জানান তিনি।

স্বাগত বক্তব্যে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন নতুন যে প্রস্তাবিত আইন ওয়েবসাইটে দিয়েছে সে বিষয়ে বলেন, ‘মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই নারী। কিন্তু নারীর কণ্ঠস্বর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জোরালো তেমন নয়। পূর্বের আইনটি একটি যৌক্তিক আইন ছিল যা সকল রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে গৃহীত হয়। কিন্তু এই আইনটি বাতিলের জন্য সম্প্রতি ইসি যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা অত্যন্ত পশ্চাদমুখী যা নারীর ক্ষমতায়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।’ এই অবস্থায় তিনি আগের আইনটি বলবৎ রাখার দাবি জানান।

সভার শুরুতে বক্তারা চলমান কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল সমূহের নিবন্ধনের আইন (২০০২) বিষয়ক যে প্রস্তাবনা করেছে সেটি স্থগিত রাখার পক্ষে মতামত দেন এবং আইনটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী ও নারীর ক্ষমতায়নের পরিপন্থী হওয়ায় উপস্থিত সকলে আইনটির বিরোধিতা করেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দশক ধরে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের অর্জন হলো রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীর ৩৩ শতাংশ অংশগ্রহণের দাবি নিশ্চিত করা। নারী রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করেছে। এই সক্ষমতা এগিয়ে নেবার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশনের বর্তমান সিদ্ধান্তে নারীর মতামত নেওয়া হয় নাই।’

আলোচক হিসেবে উপস্থিত ঐক্য ন্যাপের সভাপতি রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘ইলেকশন কমিশনের আরপিও সংশোধনের বিষয়টি বেশ রহস্যময়। কেননা অতীতের নানা রাজনৈতিক অবস্থায়ও আরপিও নিয়ে কাজের বিষয়টি আসেনি। এখনো নারীর অধিকার সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নারী সংগঠনগুলোকে এখনো আন্দোলন করতে হয়। নারীকে সম্মানের সাথে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে হলে মৌলবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে হবে।’ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান যে যথেষ্ট শক্ত নয় তার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেই তিনি দায়ী করেন তিনি।

রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের ৩৩% অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করে প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এটি বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন ছিল।’ এসময় তিনি আরপিও পরিবর্তনের চেয়ে সংস্কারের পক্ষে নিজের মত প্রকাশ করেন।

তিনি আরো বলেন, ‘তবে এই সংস্কার করার আগে নির্বাচন কমিশন পলিটিক্যাল পার্টির জন্য রোডম্যাপ তৈরি করতে পারত, প্রগেস রিপোর্ট নিতে পারত।’ তিনি নির্বাচন কমিশনকে এর জন্য জবাবদিহিতা করার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, ‘নারীদের ৩৩% রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ কেবল একটি সংখ্যা নয়। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নারীদের যে অবস্থান অর্জিত হয়েছে তা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে খুব বেশি হয়েছে সেটি বলা যাবে না। সহিংসতা বর্তমান সময়ে থেমে নেই। প্রায় ১১২৫ টি পারিবারিক নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শুধু পদায়ন দিয়ে ক্ষমতায়ন হয় না। এর জন্য রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ইলেকশন কমিশনকে আইন সংস্কারের প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘নারীদের অবদান সম্পর্কে অপপ্রচার চালানো হয়, তাদের ঘরের কাজের মধ্যে আবদ্ধ রাখার প্রচার চালানো হচ্ছে।’ এসব অপপ্রচার বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ণের জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘মোট জনগোষ্ঠীর ৩১% নারীকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। আরপিও এর মেয়াদ ৬মাস থাকা সত্ত্বেও এই দূর্যোগকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনের আইন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করে। রাজনীতিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে নারীর প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে।’

শম্পা বসু বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন শর্তপূরণের যে সময়সীমা তুলে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে তা যৌক্তিক নয়, নারীর অগ্রগতিতে বাধাগ্রস্ত করবে, মৌলবাদ বৃদ্ধি করবে। বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়া নারীবান্ধব নয়। রাজনীতি মানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার না হওয়া পর্যন্ত এর মূল লক্ষ্য অর্জিত হবে না।’

মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ঝর্ণা বাড়ই বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নারীর ক্ষমতায়নে সবসময়ই কাজ করে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়নের পূর্বে বা সংস্কারের আগে সকল দলের মতামত গ্রহণ করবে। নারীরা কিন্তু তাদের কাজের জায়গায় স্বচ্ছ এবং দক্ষ।’

সভায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং সম্পাদকমন্ডলীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত আন্দোলন সম্পাদক রেখা চৌধুরী।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত