বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২০, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭
৩১ °সে

ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে ডিবি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ

ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে ডিবি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ
পুলিশ হেফাজতে ডা. সাবরিনা চৌধুরী।

ভুয়া করোনা টেস্ট রিপোর্ট তৈরির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর আগে সোমবার রাতে মামলাটি তেজগাঁও থানা থেকে তদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে এ ব্যাপারে তেজগাঁও থানার ওসি বলেন, আমরা মামলার ডকেট ও আসামিকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। এই মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে পাওয়া আসামি ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে ডিবি জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

এর আগে, সোমবার করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট তৈরির অভিযোগে গ্রেফতার জাতীয় হূদেরাগ ইনস্টিটিউটের সাসপেন্ডকৃত কার্ডিয়াক সার্জন ডা. সাবরিনা শারমিন হুসাইন ওরফে সাবরিনা আরিফ চৌধুরীকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে পুলিশকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন আদালত। ঢাকার মহানগর হাকিম শাহিনুর রহমান পুলিশের চার দিনের রিমান্ডের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে এই আদেশ দেন।

জাতীয় হূদেরাগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করে আসা ডা. সাবরিনা চৌধুরী গুলশানের ওভাল গ্রুপের চেয়ারম্যান। তিনি এই গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফুল হক চৌধুরীর চতুর্থ স্ত্রী। ওভাল গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান হলো জোবেদা খাতুন সার্বজনীন চিকিত্সা সেবা (জেকেজি হেলথ কেয়ার)। এই জেকেজি থেকে করোনার ভুয়া টেস্ট রিপোর্টের বিষয়টি আরো তদন্ত করতে পুলিশ ওভাল গ্রুপের সাত জন পরিচালককে খুঁজছে। এছাড়া ডা. সাবরিনার সঙ্গে জাতীয় হূদেরাগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের একজন সিনিয়র চিকিত্সকের গভীর সখ্য থাকার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। ঐ সিনিয়র চিকিত্সক কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের একটি ইউনিটের প্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ডা. সাবরিনার মোবাইল ফোনের কল লিস্টে রনিসহ বেশ কয়েক জন ব্যবসায়ীর যোগাযোগ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এদের সঙ্গে ভুয়া করোনা টেস্ট রিপোর্ট তৈরির বিষয়টি জড়িত কি না, তা পুলিশ তদন্ত করছে।

আইইডিসিআরের অনুমোদন নিয়ে জেকেজি হেলথ কেয়ার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য ৪৪টি বুথ স্থাপন করে। এই বুথ থেকে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হতো। শর্ত ছিল—সরকার নির্ধারিত ল্যাবরেটরিতে নমুনা পাঠাতে হবে। গুলশানের কনফিডেন্স টাওয়ারের ১১, ১৪ ও ১৫ তলায় জেকেজি হেলথ কেয়ারের অফিস। কিন্তু আরিফুল ও তার স্ত্রী ডা. সাবরিনা বুকিং বিডি ও হেলথ কেয়ার নামে দুটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন। ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফুল চৌধুরীর নিজস্ব কর্মীবাহিনী ছাড়াও সিন্ডিকেটে যোগ দেয় দালাল চক্র। জেকেজি হেলথ কেয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা ২৭ হাজার করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ১৫ হাজার ৪৬০টি মনগড়া ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছেন। বাকি ১১ হাজার ৫৪০টি রিপোর্ট দিয়েছেন আইইডিসিআরের মাধ্যমে। জেকেজির গুলশানের অফিস থেকে ১৫ হাজার ৪৬০টি ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে এই দম্পতি হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৮ কোটি টাকা।

গত ২৩ জুন কল্যাণপুরের কামাল হোসেন নামে এক কেয়ারটেকার ভুয়া করোনা টেস্ট রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগে জেকেজির বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় মামলা করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ গুলশানের কনফিডেন্স টাওয়ারের জেকেজি হেলথ কেয়ার অফিস থেকে আরিফুল চৌধুরী, হুমায়ন কবীর, হুমায়নের স্ত্রী তানজিনা পাটোয়ারীসহ ছয় জনকে গ্রেফতার করে। ঐ দিন রাতেই আরিফুলের ক্যাডার বাহিনী আসামিদের ছিনিয়ে নিতে তেজগাঁও থানায় হামলা চালায়। থানার গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। ঐ ঘটনায় পুলিশ থানার ভেতর থেকে ১৮ জনকে গ্রেফতার করে। পরদিন আদালতে হুমায়ন কবীর ও তার স্ত্রী তানজিনা এ ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আরিফুলসহ চার জনকে পুলিশ দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুনুর রশিদ জানান, জেকেজির বিরুদ্ধে মোট চারটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি প্রতারণার মামলা এবং একটি থানায় হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে। আরিফের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে দুই জন ব্যবসায়ী তেজগাঁও থানায় আরো দুটি মামলা করেন। এর একটিতে ১২টি ল্যাপটপ ভাড়া নেওয়ার নামে আত্মসাত্ করা এবং অন্যটিতে দুটি আর্চওয়ে ও ২০টি ওয়াকিটকি কিনে টাকা না দেওয়ার অভিযোগ করা হয়।

ভুয়া করোনা টেস্ট রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তেজগাঁও থানার পুলিশ ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে চার দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠায়। পুলিশের রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতা করে সাবরিনার পক্ষে জামিনের আবেদন করেন ওবায়দুল হক, সাইফুল ইসলাম সুমনসহ কয়েক জন আইনজীবী। আদালতে রিমান্ড ও জামিন আবেদনের ওপর শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম সুমন আদালতকে বলেন, ডা. সাবরিনা ‘সরল ও সত্ বিশ্বাসে’ তার স্বামীর প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। তিনি জেকেজির অপকর্মের কথা ‘আগে জানতে পারেননি’। এটা জানলে সম্পর্কচ্ছেদ করতেন।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে আদালত পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কমকর্তা এসআই ফরিদ মিয়া বলেন, সাবরিনা তার স্বামীর সহযোগী হয়ে কাজ করেছেন। রোগীদের ভুয়া কোভিড-১৯ সনদপত্র সরবরাহ করে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে।

এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ডা. সাবরিনা বিচারকের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। ডা. সাবরিনা বলেন, ‘জেকেজির চেয়ারম্যান নই আমি। এটা তো একটা ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠান। আমি কেন চেয়ারম্যান হতে যাব?’ শুনানি শেষে বিচারক জামিন আবেদন নাকচ করে এই চিকিত্সককে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।

ডা. সাবরিনার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল কমিশন বিভিন্ন উত্স থেকে পাওয়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ যাচাই-বাছাই করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত