কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতায় এগুচ্ছে না বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো

বাদ যাচ্ছে না প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোও
কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতায় এগুচ্ছে না বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে। ছবি: সংগৃহীত

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোর বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ এগুচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প থেকে শুরু করে বিমানবন্দরগুলোর নানা রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সময়মতো না হওয়ায় নানা ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হলেও কাজ করার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কতিপয় কর্মকর্তা। এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন বেবিচকের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান। চাকুরি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করার পরও তার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট বিমানবন্দরের সকল কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান ও তার সিন্ডিকেট সদস্যদের নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিকবার তদন্তের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এ বিষয়গুলোকে পাত্তা না দিয়ে ওই সিন্ডিকেট আবারো নবউদ্যোমে তাদের কাজ শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে দেয়ার জন্য সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছিলো তারা। কিন্তু ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি প্রস্তাবটি প্রথম দফায় বাতিল করে তা তদন্তের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডিতে পাঠায়। আইএমইডি প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরলেও সেটি আবারো পাস করানোর জন্য তারা ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটিতে পাঠায়। কিন্তু কমিটি পরেরবারও প্রকল্প প্রস্তাবটি বাতিল করে দেয়। উল্লেখ্য, এটি ছিলো প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প।

দুদক সূত্রে জানা যায়, প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান ও সিন্ডিকেট সদস্যদের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ঘুষ-বাণিজ্য তদন্ত করার জন্য দুদক উদ্যোগ নেয়। সেসময় শাহজালাল, শাহ আমানত, সিলেট ওসমানী ও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাঁচটি প্রকল্পের ফাইল তলব করে দুদক। একই সঙ্গে দুদক এসব প্রকল্পের সংগে জড়িত তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানসহ নয় কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথি তলব করে। দুদকের চিঠিতে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তদন্ত করতে ১৯৯৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের বেতনভাতা, অগ্রিম/ঋণ (কর্তনসহ) খাতভিত্তিক প্রদানের জন্য বলা হয়। দুদক সূত্র জানায়, সংস্থা তার চিঠিতে যেসব প্রকল্পের নথি চেয়েছে সেগুলো হচ্ছে-রাডার মেরামত, কেলিব্রেশন, এক্সপ্লোসিভ ডিটেনশন সিস্টেম স্থাপন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক টার্মিনালে বিনা টেন্ডারে ১৬ কোটি টাকার কাজ, বোর্ডিং ব্রিজের স্পেয়ার পার্টস ক্রয়, এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত মেগাপ্রকল্প। এসব প্রকল্পের বিষয়ে দুদক কার্যালয়ে প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে পাঁচ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।

উল্লেখ্য এর আগে কক্সবাজার বিমানবন্দর কাজের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে টেন্ডারে নানা দুর্নীতির প্রমাণ পায় বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। এ অভিযোগ থেকে তাকে প্রকল্প পরিচালক থেকে অব্যাহতিও দেয়া হয়। এর পরেও প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে বিভিন্ন প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। বর্তমানে তিনি প্রকল্পের পরিচালক তিনি। এসব প্রকল্প হচ্ছে- কক্সবাজার, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের রানওয়ে এবং ট্যাক্সিওয়ে শক্তিবৃদ্ধিকরণ প্রকল্প। প্রকল্প এলাকায় প্রকল্প পরিচালকের থাকার কথা থাকলেও তিনি সবসময় অফিস করেন রাজধানীতে।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প নিয়েও নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্টসহ সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের কোন ধারাই মানা হয়নি এক্ষেত্রে। পোস্ট কোয়ালিফিকেশন ছাড়াই নির্বাচন করা হয়েছে সর্বোচ্চ দরদাতা। করোনার অজুহাত দেখিয়ে দলিলপত্র যাচাই না করেই সবকিছু চূড়ান্ত করেন হাবিবুর রহমান। কোম্পানির টার্নওভার সংক্রান্ত ব্যাংক ডকুমেন্টও দেখা হয়নি। জানা গেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে প্রকল্পে মোট আটটি কোম্পানি দরপত্র জমা দেয়। তিনটি প্রতিষ্ঠান যথাযথ ডকুমেন্ট জমা দিলেও দুটি প্রতিষ্ঠানকে অন্যায়ভাবে নন-রেসপনসিভ করা হয়েছে। যে কোম্পানিকে রেসপনসিভ করা হয়েছে সেটির প্যারেন্ট কোম্পানিকে ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংক কালো তালিকাভুক্ত করেছিলো। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের কাজেও একই কাণ্ড ঘটিয়েছেন হাবিবুর রহমান। সংশ্লিষ্ট কাজে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে বলা হলেও যে কোম্পানিকে কাজ দেয়া হয়েছে সেটির অভিজ্ঞতা মাত্র ১১ বছরের। যশোর এবং সৈয়দপুর বিমানবন্দরের প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল আধুনিকায়নের কাজের ক্ষেত্রেও নানা অনিয়ম হওয়ায় সেগুলোর কাজ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বলে জানা গেছে।

বিমানবন্দরের প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন অগ্রাধিকার প্রকল্পের কাজ আটকে থাকার কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে উল্লেখ করেছেন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, এসব অগ্রাধিকার প্রকল্পের কর্মকর্তা নিয়োগে আরো সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে বিমানবন্দরের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে আরো সতর্কতা অবলম্বন করা না হলে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) বাস্তবায়নের হারও শ্লথ হয়ে পড়বে।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত