এই ঢাকা গেট সেই ঢাকা গেট

এই ঢাকা গেট সেই ঢাকা গেট
ঢাকার সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে সাড়ে তিন শত বছরের প্রাচীন এই তোরণ ঢাকা গেট । অযত্ন অবেহলায় পড়ে আছে ঢাকা গেট—ছবি সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দোয়েল চত্বর পেরিয়ে বাংলা একাডেমি যেতে চোখে পড়বে হলদে রঙের মোগল আভিজাত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষয়িষ্ণু তোরণটি। ঢাকার সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে ৩৫০ বছরের প্রাচীন এই তোরণ ‘ঢাকা গেট’। সড়কের দুই পাশে গেটটির দুটি অবশিষ্টাংশ। দুই বিচ্ছিন্ন দেওয়ালের মাঝখানে সড়কবিভাজকে প্রত্যক্ষ সংযোগহীন একক স্তম্ভ দাঁড়িয়ে রয়েছে।

স্থাপনাটির বর্তমান ভগ্নদশা দেখে সাধারণ চোখে কেউ জানতেই পারছে না যে, এটি ঐতিহ্যবাহী ‘মীর জুমলার গেট’ বা ‘ঢাকা গেট’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত মোগলদের নান্দনিক সৌন্দর্যে গড়া গেটটি সম্পর্কে জানেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীও। বর্তমান চেহারায় গেটটিকে যতটা ছোট দেখা যায়, আগে তা এত ছোট ছিল না। অযত্ন-অবহেলায় এবং চারদিকে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠায় গেটটির আকার ছোট হয়ে গেছে। ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলি, জাদুঘরের আর্কাইভ এবং প্রাচীন অ্যালবাম উলটালে ঢাকা গেটের যে অবয়ব পরিলক্ষিত হয় তার সঙ্গে এই ঢাকা গেটের অবয়ব-আকারের ফারাক অনেক।

তবু এখনো যতটুকু টিকে আছে তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় না এই সেই গেট। সে কালের আলোকচিত্রে দেখা যায়, একটি গেটের সামনে একদল হাতি, সারি সারি স্তম্ভ, পেছনে সবুজ বৃক্ষ-পল্লব, মন্দিরের একটি চূড়া। এক অনুপম তোরণ। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, মোগল আমলে বুড়িগঙ্গা নদী হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে ব্যবহার করা হতো এই তোরণ। সেই সময় এর নাম ছিল ‘মীর জুমলার গেট’। পরে কখনো ‘ময়মনসিংহ গেট’ কখনো ‘ঢাকা গেট’ এবং অনেক পরে নামকরণ করা হয় ‘রমনা গেট’। এ গেট রমনায় প্রবেশ করার জন্য ব্যবহার করা হতো বলে পরে সাধারণ মানুষের কাছে এটি রমনা গেট নামেই পরিচিতি পায়। তবে বাংলাদেশ সরকারের গেজেট অনুসারে এ তোরণ এবং আশপাশের জায়গার নাম দেওয়া হয়েছে ‘মীর জুমলার গেট’।

মোগল আমলে তখন আওরঙ্গজেবের শাসন। আওরঙ্গজেব বাংলার সুবেদার করে পাঠান মীর জুমলাকে, যিনি ছিলেন একজন ইরানি তেল ব্যবসায়ীর ছেলে। বাংলার সুবেদার হওয়ার পরে তিনি এই গেট নির্মাণ করেন নগর নিরাপত্তা ব্যূহ হিসেবে। তত্কালীন বাংলার রাজধানী ঢাকা প্রায়ই বহিরাগত দস্যু দ্বারা আক্রান্ত হতো। ১৬৬৩ সালে মূলত মগ দস্যুদের থেকে ঢাকাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে ঢাকার উত্তর দিকে এই গেট নির্মাণ করেন। সেই সময় মীর জুমলা গেটসংলগ্ন এলাকায় একটি নয়নাভিরাম বাগান গড়ে তোলেন, যার নাম ছিল বাগ-ই-বাদশাহি বা সম্রাটের বাগান।

ব্রিটিশ আমলে এই বাগানটিকে ঘোড়দৌড়ের জন্য ব্যবহার করা হতো, যেখান থেকে এই বাগানের নাম হয় ‘রেসকোর্স ময়দান’। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সেই বাগানের নাম আরো এক দফা পরিবর্তন করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নাম দেওয়া হয়, যা বর্তমানে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত অন্যতম জনপ্রিয় পার্ক। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ‘ঢাকা কোষ’-এ বলা হয়েছে, মীর জুমলা ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে ঢাকার সীমানা চিহ্নিত করতে এবং স্থলপথে শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এটি নির্মাণ করেছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর ঢাকার আগের জৌলুস হারাতে থাকে।

কলকাতাকেন্দ্রিক ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা উজ্জ্বল ঢাকার আলোকে অনেকাংশেই ফিকে করে দেয়। অন্যান্য অনেক মোগল স্থাপনার মতো ঢাকা গেটও হয়ে ওঠে জৌলুসবিহীন। সংস্কারের অভাব, অবহেলা, অযত্নে স্থাপনাটি হয়ে পড়ে জীর্ণ। ব্রিটিশ শাসনামলে, তত্কালীন বাংলার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস স্থাপনাটিকে ব্রিটিশ স্থাপত্যকলা অনুসারে পুনরায় নির্মিত করেন। যার ফলে স্থাপনাটি মোগল শাসনামলের হলেও এর স্থাপত্যধারা ইউরোপীয় স্থাপত্যধারাকে প্রতিনিধিত্ব করে। স্থাপনার দেওয়ালে কার্নিশ আকৃতির ডিজাইন এবং কেন্দ্রীয় স্তম্ভের গোলাকার আলংকারিক কাঠামো ইউরোপীয় স্থাপত্যধারার এক অনবদ্য উদাহরণ। পার্টিশন তথা দেশ ভাগের পরে পাকিস্তান সরকার এই স্থাপনার আরো সংস্কার করে। ১৯৫০ সাল নাগাদ এই স্থাপনাসংলগ্ন এলাকাতে রাস্তাঘাট এবং বসতবাড়ি গড়ে ওঠে। যার ফলে সেই সময় স্থাপনাটি আরেক দফা সংস্কার করা হয়।

ঢাকার যে কয়টি নিদর্শন ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উত্স তার মধ্যে মোগল আমলের ঢাকা গেট উল্লেখযোগ্য। ঢাকা গেট তত্কালীন ঢাকার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিকসহ অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এবং গুরুত্ববহ এই স্থাপনার সংরক্ষণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ইতিমধ্যে অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপনাটির চুন সুরকির আস্তরণ ঝরে গিয়ে এর হতশ্রী রূপ বেরিয়ে এসেছে অনেক জায়গায়। স্থাপনাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর দায়িত্ব নিতে চায় না। আবার প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্থাপনাটিকে ‘হেরিটেজ সাইট’ ঘোষণা করেই তাদের দায় সেরেছে। তারাও এর দায়দায়িত্ব নিতে চায় না।

ঐতিহ্যবাহী ঢাকা গেট সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত হলেও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। আমরা বড়জোর গেটের বতর্মান অবস্থা সম্পর্কে তাদের অবহিত করতে পারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের ঢাকার যে কয়টি নিদর্শন ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উত্স, তার মধ্যে মোগল আমলের ঢাকা গেট অন্যতম। এর সঙ্গে ঢাকার অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ অনেক ইতিহাস জড়িত। এটি নষ্ট হলে আমাদের স্মৃতিহীন হয়ে যেতে হবে।’

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত