পারভীন, এক সংগ্রামী অনুপ্রেরণা

পারভীন, এক সংগ্রামী অনুপ্রেরণা
ছবি: সংগৃহীত

আবেদ আলী ব্যাপারীর বাবা মারা যান খুব ছোট বেলায়। মা অন্য একজনকে বিয়ে করলে নতুন বাবা সব সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে তাদের নিঃস্ব করে দেয়। কৃষিকাজ করে সাতটা ছেলেমেয়ে নিয়ে দিন পার করে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের আবেদ আলী ব্যাপারী। কিন্তু তার আকস্মিক মৃত্যুতে সংসারে নেমে আসে ভয়ানক বিপর্যয়। তিনটা অবিবাহিত মেয়ে ঘরে। অথৈ সাগরে পড়ে যায় পারভীনের মা। পারভীন -আবেদ আলী ব্যাপারীর তিন নম্বর মেয়ে।

বয়স তখন ১৩ বছর, চাচীর মাধ্যমে ঢাকার গেন্ডারিয়ায় এক ধনাঢ্য যৌথ পরিবারে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ নেয় পারভীন। চাচী চলে যাবার সময় পারভীনের দু’চোখ অশ্রুবিন্দুতে ভরে যায় গ্রামে ফেলে আসা অসহায় পরিবারের কথা মনে করে। কথা হয় শুধু একটা বাচ্চাকে দেখাশোনা করবে আর বাড়ির ছোটখাটো কাজ এটুকুই। কিন্তু বাড়ির কেউ ঘুমালেও ওকে ঠায় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এমনকি একদিন ওকে দিয়ে ১ কেজি শুকনো মরিচ বাটিয়ে নেয়। সারা রাত বাচ্চা মেয়েটা হাতের জ্বালাপোড়ায় ঘুমোতে পারেনি। শুধু মায়ের কথা মনে হয়েছে আর কেঁদেছে। পারভীন ক’দিনেই কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ে। যদিও ঐ বাড়িতে খাবারের কোনো অভাব ছিলো না। কিন্তু বাচ্চা সামলিয়ে ভারী কাজের চাপ আর নিতে পারছিলো না মেয়েটি ।তাই একদিন চাচীকে ডেকে বিদায় করে দেয়া হয় পারভীনকে ।

পারভীনের বড় ভাই ঢাকায় রিকশা চালায় , গ্রামে বেশ কিছু ধার-দেনা হয়েছে সেসব শোধ করতে। দু ভাই-বোন থাকে কামরাঙ্গি চরের একটি ছোট্ট কামরায়। পারভীন খুব একটা ভাত খায় না ,ভাতের মাড় খেয়ে থাকে যেন চাল ফুরিয়ে না যায়।ভাইকে তো টাকা জমাতে হবে তাই। একদিন ভাই ডেকে বলে, কিরে পারভীন, দুই কেজি কইরা চাল কিনি দুই সপ্তাহেও শেষ হয় না কেন, তুই ভাত খাস না?তোর মুখ চোখ ওমন শুকনা দেহায় ক্যা? মিষ্টি চেহারার আদুরে বোন মাথা নামিয়ে বলে, হ ভাই আমি ভাত খাইনা, তোমার টাকা বাঁচাইতে। কামে দিছিলা থাকি নাই ভাবী রাগ করে তাই লজ্জা লাগে। বোনের এমন কথা শুনে গলাটা ধরে আসে ভাইয়ের। কাছে ডেকে বলে, ধুর বোকা তুই আর কয়ডা ভাত খাবি। আমি কি এমনি এমনি রিকশা চালাই? খাওনের লেইগাই তো কাম করি। পেট ভইরা ভাত খাবি। ভাইয়ের এমন স্বান্তনায় খুশিতে মেয়েটির চোখে মুখে আনন্দের আবির খেলে যায় ।

ইতিমধ্যে ভাবীও বাচ্চাসহ ঢাকায় চলে আসে। অভাবের সংসারে এভাবে বসে খেতে ভালো লাগে না তার। তাই মহল্লার মেয়েদের সাথে পারভীন কাজ নেয় লালবাগের এক পোশাক কারখানায়। বয়স কম , বিদেশী ক্রেতারা এলে ঝামেলা হতে পারে ভেবে প্রথম দিকে ওকে কাজে নিতেই চায়নি কিন্তু অন্য সব মেয়েদের অনুরোধে কারখানায় কাজটা হয়। ভালই চলছিল সবকিছু। পারভীনের সুতা কাটার কাজ করতে একটুও খারাপ লাগছিল না।তাছাড়া বয়সে ছোট বলে সবাই তাকে বেশ আদরও করে।

একদিন ওর ভাবী বলল, আমার জন্য তোদের কারখানা থেকে একটু সুতা এনে দিস, আমি কাঁথা বানাবো। সেদিনই প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া দুটো সুতার ববিন হাতে নিয়ে অফিস শেষে পারভীন বের হতে যাচ্ছিল, এমন সময় চেকার ডেকে বলে, কিরে পারভীন তোর হাতে সুতার ববিন কেন? তুই সুতা চুরি করেছিস?

নাতো, চুরি করি নাই তো। ভাবী চাইছে তাই দুইটা নিছি।

কাকে বলে নিয়েছিস?

কাউরে তো কই নাই।

তাহলে তো চুরি করাই হলো। দাঁড়া স্যারকে ডাকি ।

স্যার এসে হুলুস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়ে ফেললো। তুই না বলে সুতা নিয়েছিস, চোর তুই? এই বলে ছোট্ট মেয়েটার নরম কচি আঙুলের ডগায় তুলতুলে নখের ভেতরে সূচ ফোটানো হলো শাস্তি স্বরূপ ।

দু’চোখ বেয়ে পানি গড়াচ্ছে ১৩ বছরের পারভীনের। খুব কষ্ট হচ্ছে। মা আর ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে। কিন্তু কিছুতেই মন গলছে না সুপারভাইজারের। এবারের শাস্তি আরো বেশি অপমানজনক।ঘরের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত চক দিয়ে দাগ টানা হয়েছে, সেই দাগ নাক দিয়ে মুছে দিতে হবে চুরির অপরাধ মোচন করতে।এমন সময় ম্যানেজার সাহেব এসে বলল, ,থাক যা হবার হয়ে গেছে। ওর তো এমনিতেও চাকরিটা থাকছে না।কাজেই ছেড়ে দাও।এই বলে ওর হাতে দু’মাসের বেতন ধরিয়ে দিয়ে জানালো ,তোর আর চাকরিটা আর নেই ।কাল থেকে তোকে অফিসে আসতে হবে না ।

কি বলেন স্যার, আমি সত্যি চুরি করি নাই। চুরি করলে তো সুতা ব্যাগে নিতাম। আমি জানিই না এটাকে চুরি করা বলে। আমার তো শাস্তি দিয়েই দিলেন স্যার, তাইলে চাকরিটা থাকবে না কেন স্যার?

অফিস কর্তৃপক্ষ জানালো, চাকরি থাকবে না কারণ,এটাই এখানকার নিয়ম।

আপনাকে ওরা এতো কষ্ট দিলো অপমান করলো তবুও চাকরিটা কেন করতে চাইলেন?

কাজটা করতে চাইলাম কারণ আমি তো চুরি করি নাই। তাছাড়া চাকরি গেলে খামু কি?

তারপর?

তারপর বাসায় আইলাম ।ভাই খুব মন খারাপ করলো আমারে এত কষ্ট দিছে দেইখা। এদিকে ভাইয়েরও সংসারে অনেক ঝামেলা। রিকশাটা ভাইঙ্গা গেছে ঠিক করা লাগবে। তহন আমি ভাইরে কিছু টাকা দিলাম। ভাই জিগাইলো এই টাকা তুই কই পাইছিস? কইলাম, তুমি যে আমারে রোজ খেয়া পাড় হওনের লাইগা দুই টাকা করে দিতা সেই টাকা আমি জমাইছি। প্রথম দুই দিন খেয়া পাড় হইছি তারপর পুল দিয়া (ব্রিজ) হাঁইটা কামে গেছি। অনেক সময় কিছু খাওনের মন চাইলেও খাই নাই। জমায়ে রাখছি। আজ তোমার বিপদের দিন তাই দিলাম। এই কথা শুইনা ভাই আমার মাথায় হাতটা রাইখা কইলো, তুই একদিন কিছু করতে পারবি বোন।

হঠাৎ বাড়িওয়ালা ঘর ভাড়া বাড়ায়ে দিলো। আমি ভাই আর ভাবী ঘর খুঁজতে বের হইলাম। ঘর পাই তয় দর-দামে মেলে না। এক বাড়িওয়ালা তো কইলো যুবতী মেয়ে আছে তাও আবার সুন্দরী তোমাগো কাছে ঘর ভাড়া দিবো না কারণ আমার ঘরে জুয়ান পোলা আছে। কি যে শরম পাইলাম খালা বড় ভাইয়ের সামনে! ভাইরে কইলাম চলো অন্যখানে বাসা দেহি। আমাগো দেইখা এক বুড়া চাচা ডেকে কইলো, তোমরা আমার এহানে ঘর নিতে পারো তয় মাসে তিনশো টাকা দেওন লাগবে। এরপর আমরা সেই বাসা ভাড়া নিলাম।

কিছুদিন না যাইতেই চাচা ভাইরে কইলো, কালাম- তোমার বোনডারে আমি নিতে চাই।

মানে কি চাচা?

মানে হইলো আমার বড় পোলা মানিকের জন্য তোমার বোনডারে আমার খুব পছন্দ হইছে ।কি কন চাচা ওর কি বিয়ার বয়স হইছে ? তাছাড়া আপনার পোলা তো কাজ-কাম তেমন কিছুই করে না খালি খায় আর ঘুমায়।

তুমি চিন্তা কইরো না। বিয়ার পর আমি আমার গ্যারেজ থেইকা পোলারে একটা রিকশা দিমু চালাইতে। আর আমার তো কম নাই বৌমারে আমি নিজের মাইয়ার মতো কইরা রাখুম।

বিয়ে হলো তার সাথে?

আমার মায় তো কিছুতেই রাজি না। কয় শহরের পোলা ভালো হয় না। আমি মাইয়া গ্রামেই দেইখা শুইনা বিয়া দিমু। কিন্তু আমার শ্বশুর নাছোড় বান্দা। আমাগো গ্রামে যাইয়া আমারে তার পোলার সাথে বিয়া করাইয়া আনলো। প্রথম প্রথম বেশ সুখেই ছিলাম। যদিও আপনার খালু তহনও কিছুই করে না। সব শ্বশুরই দেখতো। কিন্তু কপাল মন্দ হইলে যা হয় খালা। বছর দেড়েকের মাথায় আমার শ্বশুরডা মইরা গেলো। এদিকে আপনার খালু কোনো কাজ করে না। সকালে গ্যারেজে যাইয়া ঘুমায়ে থাহে। বৌরে যে খাওন পিন্দন দেওন লাগে এইডা সে জানেই না। কোনো দ্বায় – দায়িত্ব নেয় না। আমার তহন বয়স অল্প। মহল্লার পোলাপান খালি ফুসলায়। কয় তোর এত সুন্দর চেহারা, ঐ পচা ব্যাডার লগে থাকোনের কি দরকার। আমাগো লগে আয় ভালো রাখুম। তোর মাইয়া আছে তো কি হইছে তারেও দেহুম। কিন্তু আমি ওসবে কান দেই নাই। কত মাইর খাইছি গাইল খাইছি এমনকি মেয়ে হওয়ার আগের দিনও ভাত ভাত কইরা আপনের খালু আমারে খুব মারছে তাও তারে ছাইরা চইলা যাই নাই।

মহল্লার এক মাস্তান ব্যাডা খুব জ্বালাইতো। আপনারে খালুরে উল্টাপাল্টা বুঝাইতো। একদিন আপনার খালু আইসা কয় শোন, রমজান খুব ভালা মানুষ অনেক মায়া করে আমাগো। কাইল ও বাজার কইরা নিয়ে আসবো তুই ভালো কইরা রান্না করবি। কইলাম, সে কেন আমাগো বাড়ি বাজার করবো তার বাড়ি ঘর নাই? উল্টা আপনার খালু আমারে বকে।

পরের দিন বাজার নিয়ে আইলো রমজান। খাওনের পর আমার স্বামীরে দোকানে পান আনতে পাঠাইয়া দিয়া আমারে কইলো, পারভীন আমি তোরে ভালা রাখুম, তুই আমারে বিয়া কর, আমার মেলা টেহা-পয়সা আছে। তোর জামাই তো একটা ভাদাম্মে ।

এসব আপনি কি কন রমজান ভাই। আমার স্বামী অকামের ঠিক আছে তয় সে খুব সহজ সরল নইলে দেহেন না আপনার কথা মতো দোকানে চইলা গেলো। বিপদ থেকে বাঁচনের লেইগা বুদ্ধি কইরা কইলাম, ঠিক আছে আপনার কত টাকা আর জমি আছে কন। সব টাকা আর কিছু জমি আমার নামে আগে লেইখা দিবেন তারপর বিয়া করুম। এরপর থেইক্যা বেটা লাপাত্তা।

তারপর কি হলো খালা? তারপর দিনে দিনে অভাব বাড়তেই থাকলো। ততদিনে দুইটা ছেলেমেয়ে নিয়া আমার দিশেহারা অবস্থা। একদিন বোন আইলো আমার বাসায়। দোকান থেইক্যা বাকী কইরা চাল আইনা ভাত রাঁধলাম। আপনের খালু সন্ধ্যায় ঘরে আইসা কয় ভাত দে। ভাত কই পামু, তুমি কি টাকা দিয়া গেছো যে চাইল কিনুম। এবার ডালা উদলা কইরা দেহে পাতিলে ভাত। আমারে কয়, অসভ্য মহিলা ভাত ঢাইকা রাইখা আমারে কস ভাত নাই এই বইলা খুব মারলো। দুই আঙুল চোখের ভেতর ঢুকাইয়া দিলো (খালা, যেমন কইরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ ম্যাডামরে উনার হাজবেন্ড মারছিল পেপারে দেখছি)। আমি তহন বাঁচনের লেইগা শরীরের সব শক্তি খাটাইয়া ধাক্কা দিয়া তারে ফেলাইয়া দিলাম। চোখ দিয়া অঝরে রক্ত পরতে লাগলো। আমারে হাসপাতালে নিয়া গেলো। আপনার খালুর নামে মামলা করলো পুলিশ। সে তো পলায়ে গেলো। আর ফেরে না। ছেলেমেয়ে দুইটারে নিয়া দিনের পর দিন অনাহারে থাকি। একটা কাপড় শুকইয়া তারপর আবার পড়ি ।

আমার এমন হাল দেইখ্যা মহল্লার এক খালা একদিন কইলো, পারভীন কাজ করবি?

কইলাম কি কাজ? টাকা দিলে কাজ করুম না কেন করুম।

ঠিক আছে তয় কাইল আমার লগে যাইস। পরের দিন সেই খালার সাথে গেলাম এক বাসায়। খালা আমারে একটা ঘরে সুন্দর বিছানায় বসায়ে রাইখা কইলো তুই বয় আমি হাতের কাম শেষ কইরা আইতাছি। কিছু সময় পর দেখি ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে তিনডা জোয়ান বেটা ঘরে ঢুকলো। হেগো দেইখ্যা আমার তো বুকের ভেতর চান দিলো। মনে মনে ভাবতাছি খালা আমারে কই নিয়া আসলো। এরা তো ভালো মানুষ না। বুদ্ধি কইরা কইলাম, আমি একটু বাথরুমে যাবো, এইভাবে সেদিন মান-সম্মান নিয়া পালাইয়া আইছিলাম। পাগলের মতো রাস্তায় হাঁটছিলাম। আমারে ওমন পেরেশান দেইখ্যা এক ভাতের দোকানের চাচা কয়, কি অইছে মা তোমার? কইলাম আমারে একটা কাজ দিবেন, আমার খুব কাজ দরকার। এদিকে খিদায় পেট চো চো করতাছে। আমারে কিছু খাইতে দেন তারপর কথা কই। চাচা কয়ডা ভাত দিলো। এত আরামে খাইলাম, মনে অইলো জীবনে কোনো দিন ভাত খাই নাই ।

চাচা কইলো, তুমি রান্না করতে পারবা? তাইলে তোমারে এক মেসে রান্নার কাম দিবো। হ- পারবো। তারপর এক মেসে ৫০ জনের রান্না আর এক বাসায় ৫০ কলসি পানি এই দুইডা মিলায়ে মাসে ১৫০০ টাকার কাজ পাইলাম। মেস থেইকা এতো খাবার দিতো যে, নিজে ছেলেমেয়ে নিয়ে খাইয়াও এর ওর ঘরে দিতাম।

আপনার স্বামী ততদিনে কি ঘরে ফিরে এসেছিলো ?

ফিরা আইছিল তয় স্বভাব কি আর বদলায় খালা ,বদলায় না ।

ভালই দিন যাচ্ছিল খায়া-পইরা। এর মধ্যে মেসের এক লোকের নজর পড়ল আমার উপর। ভাল ভাল কথা কইতো, রাইত অইলে আমারে বাসা পর্যন্ত আগায়ে দিয়া যাইতো। কইতো সে ভালো বেতনের চাকরি করে, দ্যাশে কোনো বউ–পোলাপাইন নাই। আমারে স্বপ্ন দেখাইতে শুরু করলো। খুব আপন মনে হইতো। আসলে স্বামী তো ভাদাম্মে, এমন কইরা তো কেউ কোনোদিন ভালবাসার কথা কয় নাই। তাই আমিও একটু একটু প্রেমে পইড়া গেলাম ।

ভালোবেসে ফেললেন সেই লোকটাকে ?

মিথ্যা বলবো না খালা, একটু একটু ভালা লাগতো। মনে হইতো স্বামী অকামের, এত জ্বালা যন্ত্রণা দেয় আর একটু হইলে তো সারা জীবনের লাইগা অন্ধই হইয়া যাইতাম। লোকজনও বিরক্ত করে তারচেয়ে এমন একজন মানুষ যদি সাথে থাহে তয় খারাপ কি? মানুষ অন্তত পেছনে লাগবো না। আর সে তো ভালো ভালো কথাই বলতো। আমার খেয়াল রাখতো।

আগেও তো অনেকে প্রস্তাব দিয়েছিলো তখন তাদের প্রেমে পড়েননি কেন?

মিষ্টি হাসি দিয়ে খালা বলল, আগে তো বুঝি নাই এহন একটু একটু বুঝি। মনে হয় সত্যিকারের একজন মানুষ লাগে, একটা ভরসা করোনের জায়গা লাগে। তাই মানুষটারে নাও করি নাই। সে যহন আমারে স্বপ্ন দেখাইতে শুরু করলো তখন সাতপাঁচ ভাবলাম, ছেলেমেয়ের কথা ভাবলাম। ভাবলাম, এইভাবে আর কত কাল! বাপ মারা যাওনের পর পেটের কয়ডা ভাতের জন্য সেই কোন ছোটবেলা থেইকা যুদ্ধ করে আসতাছি ,এর চেয়ে ভালো কেউ যদি আমারে সুখে রাখতে চায় তয় আমি কেন আর সব মানুষের কথার ভয়ে সেই সুখ নিজে হাতে দূরে ঠেইলা দিব ।স্বামীরে তো কত সুযোগ দিলাম ।ভালো হইলো না।বরং আমি সারা জীবন তারে টাইনা বেড়ালাম।

পারভীন খালা যখন বিচক্ষণতার সাথে কথাগুলো বলছিলো আমি অপলক চেয়েছিলাম তার মুখের দিকে। মনে হচ্ছিলো একজন শিক্ষিত বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের সাথে কথা বলছি। আসলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয় বাস্তবতা আর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে কেউ কেউ বিচক্ষণ হয়ে ওঠে ।পারভীন খালাও তাদেরই মতো একজন।

যার সাথে নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছে ,একদিন গোপনে সেই লোকটার খোঁজ নিলো পারভীন। হৃদয়টা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলো। মিথ্যে হয়ে গেলো এই ক’মাসে একটু একটু করে বোনা একটা নির্ভরতার –ভরসার জায়গা। স্ত্রী -ছেলেমেয়ে গ্রামে রেখে কথিত প্রেমিক ঠকিয়ে যাচ্ছিলো এই মেসের সামান্য একজন ভাত রান্না করা পারভীনকে। কিন্তু সময় পোড়খাওয়া মেয়েটাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে ।তাই বুকের ভেতর জমানো কষ্টটাকে লুকিয়ে রেখে ছেড়ে দিলো মেসে রান্নার কাজ ।খুব আত্মসম্মানে লাগলো ।তাই একজন নামে মাত্র শিক্ষিত প্রতারক থেকে আপোষে সরিয়ে নিলো নিজেকে ।

যেখানেই কাজ করতে গিয়েছে সেখানেই পেয়েছে নানান রকম আজেবাজে কু-প্রস্তাব। তাই সব ছেড়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত কাজ নেয় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করা ছেলেমেয়েদের মেসে। তারপর খালাকে আর নাজেহাল হতে হয়নি। বেশ কয়েকটি মেসে এখন সে কাজ করে। শুধু তাই নয় মাস শেষে প্রায় ২৫/২৬ হাজার টাকা সে আয় করে। মেয়েটাকে এস এস সি পাস করিয়ে নিজের বোনের (বি এ পাস চাকরি করে) ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছে। ছেলেটা পড়ছে ক্লাস নাইনে। এমনকি বড় ভাই মারা যাবার পর তার ছেলেটাকে নিজের কাছে রেখে তাকেও মানুষ করবার চেষ্টা করেছে। অবিবাহিত ছোট দুই বোনকে ঢাকায় এনে নিজের কাছে রেখে তাদেরও দেখেশুনে ভালো ঘরে বিয়ে দিয়েছে ।

দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে ঢাকার অদূরে কেরানিগঞ্জে ১ কাঠা জমিও কিনেছে সে। তার জন্য বিভিন্ন মেসে চাকরি করা ছেলে (মামা) এবং মেয়েদের (খালা) কাছ থেকে বেশ মোটা অংকের টাকা ২/৩ বছরের জন্য ধার করেছিল। এমনকি তার ছেলেমেয়েদের স্কুলে পুরো ১ বছর কোনো বেতন সে দেয়নি এবং শিক্ষকদের বলেছিল, স্যার আপনারা সহযোগিতা না করলে আমি এই জমিটা রাখতে পারবো না। জমিটা থাকলে আমার ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতে একটু মাথা গোঁজার ঠাই হবে। হেগো বাপ তো উদাস অকামের। আপনাদের সব বেতন আমি ধীরে ধীরে শোধ করে দেব।শিক্ষকরা বিনাবাক্যে পারভীন খালার এই প্রস্তাব মেনে নিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রায় ৫ বছর ধরে উনি সবার টাকা –পয়সার ঋণ শোধ করে এখন অনেকটাই দায়মুক্ত। বর্তমানে লকডাউনের কারণে ঢাকা শহরের অধিকাংশ ছাত্রাবাস ,মেস এবং ব্যাচেলর বাসা ফাঁকা ।তাই তার হাতে খুব বেশি কাজ নেই ,তবে না খেয়ে থাকতে হয়না তাকে ।কারণ সে জানে কিভাবে পরিশ্রম করে খেতে হয় ।কিভাবে নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করতে হয় সততা এবং সাহস থাকলে সব জয় করা যায় ।

দীর্ঘ বছর সে কাজ করছে আমার পাড়ায় ।টাকা পয়সা সোনা দানা এমনকি ভালো-মন্দ খাবার কোনো কিছুতেই তাকে টানে না।।বরং মাঝে মধ্যেই তার কাছ থেকে শিখি জীবন যেমন সহজ নয় তেমনি জীবন যাপনের পথটাও কণ্টকপূর্ণ ।তবে মানুষ চাইলে সব সহজ করে নিতে পারে । সেই কবে কোন ছোটবেলায় দুটো সূতার ববিন অফিসকে না জানিয়ে নেয়ার যে শাস্তি তাকে পেতে হয়েছিলো এবং অপমানিত হতে হয়েছিল তা আজও তাকে অসহনীয় পীড়া দেয় ।

এই যে এখন ছাত্র এবং ব্যাচেলর ছেলেদের মেসে কাজ করেন কখনো কি বিশেষ কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন ?

না না, খালা। এই সব শিক্ষিত মামারা খুবই ভাল ।তারা আমাকে বোনের মতো-মায়ের মতো দেখে। এদের আচরণ এতো ভাল যে সম্মান করতে ইচ্ছা করে। আমাকে খুব মায়া করে ।আসলে খালা, শিক্ষিত মানুষের কথাই আলাদা ।তাছাড়া এরা তো সবাই বড় বড় জায়গায় পড়ালেখা করছে , ভালো মানের চাকরী করে ।এদের আদব কায়দা অন্য রকম। বরং এসব মামারা না থাকলে আমি না খাইয়া ভাসে যাইতাম এতদিনে।

সেই ছোটবেলা থেকে আজ অবধি প্রতিটি মুহূর্ত এক অবিচ্ছেদ্য লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে পারভীন নামের এই লড়াকু নারী ।জীবন একে এক দণ্ড শান্তি দেয়নি। দিয়েছে হেরে না যাবার অদম্য শক্তি আর বেঁচে থাকবার অবিনাশী সাহস ।অথচ আমরা কিছু অমানবিক বিবেকবর্জিত মানুষ খুব সহজেই বলে ফেলি, যেসব মহিলারা ছেলেদের বা বিভিন্ন রকম কলকারখানায় থাকা জোটবদ্ধ পুরুষদের আবাসিক স্থানে রান্না বা দৈনন্দিন কাজ করে ঐ সব মহিলাদের চরিত্র একদম ভালো হয় না। তারা বেহায়ার মতো পুরুষদের সাথে আদিখ্যেতা করে।এদের পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই তাই এরা নিজেদের মান-সম্মানের কথা চিন্তাই করে না।যেমন ধরুন –একটা সময় এমন ছিল যে গার্মেন্টেসে কাজ করা মেয়ে মানেই সে খারাপ , পার্লারে কাজ করা মেয়ে মানেই তার সতীত্ব বলে কিছু নেই , ইটের ভাটা, মাটি কাটা বা নির্মানাধীন কোন প্রজেক্টে কাজ করা নারী মানেই সে খুব সস্তা, সজলভ্য মেয়ে মানুষ ।

কিন্তু না, না জেনে না বুঝে অন্যের সমালোচনা করা যতটা সহজ তার কাছে যেয়ে তার জীবনের গল্পের গাঁথুনির প্রতিটা ফোঁড়ের ভেতর দিয়ে গেলে বোঝা যায় কার জীবন কতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং কতটা বেদনায় মোড়ানো ।আসলে সত্যের পথ সহজে উন্মোচিত হয় না, যতটা সহজে হয় মিথ্যার অপপ্রচার ।যে মানুষটা যে পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যায় সেই জানে জীবনের ধাপগুলো পেরোনো কতটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার ।

একজন নয় এরকম হাজারো পারভীনদের গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই শহরের আনাচে-কানাচে। ক’জনার জীবনের গল্প আমরা জানি বলুন তো? তবে পারভীনদের মতো সৎ -বিনয়ী -পরিশ্রমী সর্বপরি সাহসী নারীদের জন্য সমাজ এবং রাষ্ট্রের অনেক গল্প যেমন বলার আছে তেমনি আছে তাদের জন্য বিশেষ কিছু করনীয়। ভালো থাক সুন্দর থাক অদম্য এই হার না মানা পারভীনরা, সেই প্রার্থনা এবং শুভ কামনা নিরন্তর।

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত