কারা হেফাজতে মৃত্যুর দায় কার?

কারা হেফাজতে মৃত্যুর দায় কার?
লেখক মুসতাক আহমেদ। ফাইল ছবি

কারা হেফাজতে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কারাগারে থাকা অবস্থায় একজন বন্দি কীভাবে মারা গেলেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। বিশেষ করে কারাগারে চিকিত্সক, নার্সসহ অন্য সব চিকিত্সা-সুবিধা থাকার পরও মুশতাক আহমেদ হঠাৎ কীভাবে মারা গেলেন সে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

যদিও কারা কর্তৃপক্ষ বলছেন, মুশতাকের অসুস্থতা হঠাত্ করে হয়েছে। কিন্তু আইনবিদরা বলছেন, একজন কয়েদির দেখভালের দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। এদিকে, মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। একজন ডিআইজিকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে চিকিত্সা সেবার অপ্রতুলতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও এটির উন্নতিতে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। চিকিত্সক এবং অন্যান্য চিকিত্সাসামগ্রীর অপ্রতুলতার কারণে কারাগারে এর আগেও বন্দি মারা গিয়েছে। ১৮৯৪ সালের প্রিজন অ্যাক্টের ১৩ ধারা মতে, একজন বন্দির পূর্ণ চিকিত্সা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একজন মেডিক্যাল অফিসার প্রতি ২৪ ঘণ্টা অন্তর বন্দিদের শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াও তাদের নানা অসুস্থতা সম্পর্কে জানার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে যে, বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বিষয়টি সর্বক্ষেত্রে মানা হয় না। এদিকে ১৮৬৪ সালের জেলকোড বন্দিদের চিকিত্সা পাওয়ার ক্ষেত্রে দারুণ ব্যবস্থা রেখেছে। এ বিধান অনুযায়ী, কোনো বন্দি অসুস্থ হলে প্রহরীরা সঙ্গে সঙ্গে হেড ওয়াড্রেনকে জানানোর কথা রয়েছে। তিনি সাব-অ্যাসিসট্যান্ট সার্জনকে বন্দির অসুস্থতা সম্পর্কে জানাবেন। এরপর অ্যাসিসট্যান্ট সার্জন সঙ্গে সঙ্গে বন্দির ওয়ার্ড ভিজিট করবেন। বন্দির অবস্থা বুঝে তাকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে ১৮৬৪ সালের জেলকোডে। এ বিষয়ে তিনি জেলার এবং মেডিক্যাল অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। বাংলাদেশের জেলখানায় এ নিয়মগুলো মানা হয় না বলে অনেকের অভিযোগ।

মুশতাকের মৃত্যু কী কারণে হয়েছে কিংবা তিনি আগে থেকে অসুস্থ ছিলেন কি না তা নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ পরিষ্কারভাবে কিছু বলতে পারেননি। কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের জেলার দেবদুলাল কর্মকার ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, মুশতাক আহমেদ গত আগস্ট মাসে কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে এই কারাগারে আসেন। তিনি অন্য দুজন বন্দির সঙ্গে একই রুমে থাকতেন। ঐ দুজন তার পূর্বপরিচিত। কারাগারে আসার পর তিনি কখনো অসুস্থতার কথাও বলেননি, চিকিত্সাও নেননি। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর দ্রুতই কারা চিকিত্সকরা তার সেলে আসেন। সবকিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সাবেক ডিআইজি প্রিজন মেজর (অব.) সামছুল হায়দার সিদ্দিকী ইত্তেফাককে বলেন, তদন্তের পর এ ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তবে তিনি বলেন, তিনি অসুস্থতার কথা এর আগে কাউকে জানিয়েছিলেন কি না তা তদন্ত করে বের করতে হবে। মুশতাক আহমেদ যদি তার অসুস্থতার কথা বলে থাকেন এবং সে অনুযায়ী কারা কর্তৃপক্ষ চিকিত্সার ব্যবস্থা না নিয়ে থাকেন তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

এদিকে আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুল হক মামুন ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে একজন ডিআইজিকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।

কারা সূত্র জানায়, দেশের ৬৭টি কারাগারে চিকিত্সকের অপ্রতুলতা রয়েছে। সারাদেশের কারাগারগুলোতে মোট বন্দির সংখ্যা ৮৫ হাজার। কিন্তু চিকিত্সক আছেন মাত্র ১০৭ জন।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন মুশতাক আহমেদ। পরে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে রাত সোয়া ৮টার দিকে চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ইত্তেফাক/এমএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x