মহামারির নীরব শিকার শিশুরা

অনেক হাসপাতালে পৃথক কোভিড শিশু ইউনিট থাকলেও নেই আইসিইউ
মহামারির নীরব শিকার শিশুরা
হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে একজন শিশু। ছবি: ইত্তেফাক

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শিশুদেরও ছাড়ছে না! প্রতিদিনই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশুরোগীর সংখ্যা। এর সঙ্গে বাড়ছে ‘মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লামেটরি সিনড্রোম ইন চিলড্রেন-এমআইএসসি’ রোগীও। রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে দেখা যায়—মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে রোগীর সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করে। রোগী সামলাতে হাসপাতালগুলোর হিমশিম অবস্থা।

ক্যানসার, কিডনির সমস্যা কিংবা জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মানো শিশুদের করোনা হলে তা গুরুতর অবস্থায় চলে যাচ্ছে। এমনকি মৃত্যুও হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকগণ। কিন্তু নগরীর বেশির ভাগ নামি হাসপাতালেও নেই শিশু করোনা রোগীদের জন্য আলাদা আইসিইউ। কত শিশু বর্তমানে আক্রান্ত, নেই কোনো পরিসংখ্যানও।

সম্প্রতি নিউমোনিয়া চিকিত্সার জন্য পাঁচ বছরের শিশু রিয়ানকে নিয়ে শিশু হাসপাতালে যান মাহবুবা নামের এক অভিভাবক। পরে জানতে পারেন তার ছেলের করোনা হয়েছে। তানভির আহমেদ (৫) শিশু হাসপাতালে ক্যানসারের চিকিত্সা করাতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়। তানজিল ফুসফুস ইনফেকশনের চিকিত্সা করাতে গিয়ে আক্রান্ত হয় বলে জানান তার মা তাহমিনা।

শিশুরোগীরা কীভাবে করোনায় আক্রান্ত হয়—এমন প্রশ্ন করলে ঢাকা শিশু হাসপাতালের কোভিড ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক নওশাদ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, সাধারণত বড়দের অসচেতনতা ও অন্য রোগের চিকিত্সা নিতে হাসপাতালে এসে শিশুরা করোনায় সংক্রমিত হয়। গত বছর জুন মাসে শিশু হাসপাতালে করোনা ইউনিট করা হলেও, এখানে কোনো আইসিইউর ব্যবস্থা নেই। তবে অক্সিজেনের ব্যবস্থা আছে এবং শতভাগ রোগীরই অক্সিজেন চাহিদা হাসপাতাল মেটাতে পারে।

অধ্যাপক নওশাদ আরো বলেন, রোগীদের জ্বর, সর্দি, কাশি, পেট খারাপ থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের করোনার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ থাকে না। রোগীর সঙ্গে যেসব অভিভাবক হাসপাতালে থাকেন তাদের নমুনা সংগ্রহ করে দেখা যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা কোভিড পজিটিভ। তারপরও তাদের মধ্যে সচেতনতার বড় অভাব। বারবার বলা সত্ত্বেও মাস্ক ব্যবহার করেন না।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের ডেপুটি ডিরেক্টর ডা. প্রবীর সরকার ইত্তেফাককে বলেন, দিন দিনই বাড়ছে শিশু করোনা রোগীর সংখ্যা। বাড়াতে হচ্ছে শয্যা সংখ্যা। একদম ছোট শিশুদের লোক সমাগমে আনার বিষয়টিকে নিরুত্সাহিত করেন তিনি।

জানা গেছে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত বছরের ১০ মে শিশুদের জন্য আলাদা করোনা ইউনিট করা হয়। ১৪ শয্যা দিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে এই ইউনিটে শয্যা সংখ্যা ৪২। জানুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৭৩৫ জন এখানে চিকিত্সা নেয় বলে জানান হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাঈদা আনোয়ার।

তিনি বলেন, ১০৩ জন এমআইএসসি রোগী ছিল। এই হাসপাতালের করোনা রোগীর ভালো হওয়ার হার শতকরা ৯৭ শতাংশ। ৩ শতাংশের কম রোগী এখানে মারা যায়। এদের করোনার সঙ্গে ব্লাড ক্যানসার, কিডনি রোগ, কিংবা জন্মগত ত্রুটিও ছিল। কেউ কেউ একেবারে শেষ সময় আমাদের কাছে আসে। তখন এলে কিছুই করার থাকে না।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশু করোনা রোগীর জন্য আলাদা কোনো আইসিইউ নেই। তবে ‘এসডিও’ আছে যেখানে ভেন্টিলেশন ছাড়া সব ব্যবস্থা রয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমানে আমাদের ১৬ জন রোগী আছে। আমরা আসলে শয্যা নিয়ে ভাবছি না। রোগী বাড়লে আমরা শয্যা বাড়াব। প্রয়োজনে আইসিইউ সেবাও প্রদান করা হবে। আমরা শিশুদের কোভিডটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।

এদিকে ঠিক কত শিশু এ পর্যন্ত কোভিড আক্রান্ত হয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শিশুর আলাদা করে তালিকা করে না। শিশু অধিকার ফোরাম শুরুর দিকে তালিকা করলেও এখন আর তা চালিয়ে নিতে পারছে না বলে জানান ফোরামের পরিচালক আবদুছ সহীদ মাহমুদ।

বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মনসুর হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, প্রথম ঢেউয়ে মোট আক্রান্তের ৩ শতাংশ ছিল ১০ বছরের নিচের শিশু। আর ৪.৫ শতাংশ ছিল ১৫ বছর পর্যন্ত শিশু রোগীর সংখ্যা। কিন্তু এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বয়সভিত্তিক কোনো পরিসংখ্যান পাই না। হাসপাতাল ভিত্তিক কিছু পরিসংখ্যান মাঝেমধ্যে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শিশুদের জন্য গুরুতর হয়ে এসেছে। প্রথম ঢেউয়ে শিশু আক্রমণের হার কম ছিল। এখন অনেক বেশি। প্রতিদিন রোগী বাড়ছে। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সব কিছুই খোলা। তাই বড়দের কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই।’

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x