তরুণদের স্বেচ্ছাশ্রমে প্রতিদিন ১২০০ হতদরিদ্রের ইফতার

তরুণদের স্বেচ্ছাশ্রমে প্রতিদিন ১২০০ হতদরিদ্রের ইফতার
রাস্তার পাশে সাজিয়ে রাখা হয়েছে খাবারের প্লেট। ছবি: আব্দুল গনি

কয়েকজন তরুণ প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ মানুষকে খাওয়াচ্ছেন ইফতার। কী সাবলীলভাবেই না তারা করছেন এ কাজ। লালমাটিয়ার ডি-ব্লকের ৩/৫ সড়কে যে কেউ এসে নিতে পারেন এ ইফতার।

রবিবার (২ মে) দেখা গেল রিকশাচালক, ভাসমান-ছিন্নমূল মানুষ আসছেন ইফতার নিতে। কেউ-ই খালি হাতে ফিরছেন না। থালায় থালায় দেওয়া হচ্ছে ইফতার। যারা বাসায় নিতে চান তারা নিজেরাই পাত্র হাতে দাঁড়াচ্ছেন লাইনে। প্রত্যেকের হাতে খেজুর, ছোলা, পিঁয়াজু, বেগুনি, মুড়ি, চিড়া, জিলাপি। ছুটির দিনে দেওয়া হয় খিচুড়ি। গত বছর রোজার আগে শুকনো খাবার দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর রোজায় প্রতিদিন খাবার দেওয়া শুরু করেন। এই কাজে দেশ জুড়ে মানুষের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন তারা।

ইফতার দেওয়ার চিন্তা কেন এলো? প্রশ্নের উত্তরে এই দলের অন্যতম সদস্য আসমা আক্তার লিজা বলেন, ‘মার্চ ২৬, ২০২০। লকডাউনের সময় নিউ মার্কেট এলাকায় কুকুরদের খাবার খাওয়াতে গেছি। দেখি, কয়েকটা ছোট বাচ্চা একটা দোকান ভাঙার চেষ্টা করছে। আমাকে দেখে পালাচ্ছিল। ধরে বললাম, দোকান ভাঙছ কেন? উত্তরে বলল, এটা খাবারের দোকান। ভেতরে খাবার আছে। কোথাও তো খাবার পাচ্ছি না। তখনই বুঝলাম, করোনার সময় হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক দেওয়ার চাইতে বেশি জরুরি হচ্ছে খাবার দেওয়া। এই ঘরবন্দি অবস্থায় গরিব মানুষের কাছে খাবার পৌঁছানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’ লিজা জানান, ‘আমার মতো কয়েকজন তরুণ-তরুণী নিরন্ন মানুষের মুখে খাবার পৌঁছে দেওয়ার সেই প্রতিজ্ঞা থেকেই জন্ম দিল ‘মেহমান বাড়ি’র।

এই দলের অন্য সদস্য সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন বললেন, গত বছর লকডাউনের সময় তো রাস্তাতেও থাকতে দিত না। লকডাউন শুরুর মধ্যেই রোজা এল। আমরা রোজার সময় ইফতার দেওয়া শুরু করলাম। গত বছর যা শুরু করেছিলাম এবারও তা করছি। আয়োজকরা জানান, এ ভাবনাটা প্রথম আসে লিজার মাথায়। তার সেই চিন্তাকে রূপ দিতেই আরো কয়েকজন তরুণ যুক্ত হয়। ১১ জনের একটি দল দাঁড়িয়ে যায়। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে রাতুল এসে যুক্ত হন এ কাজে। মেহেরপুর থেকে আসেন আয়শা ফেরদৌসী—এমনি করেই যুক্ত হতে থাকেন অনেকে। এই স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে রয়েছেন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, মুদির দোকানদারসহ অনেকেই। সবাই স্বেচ্ছায় যুক্ত হয়েছেন কাজে। কাউকেই ডেকে আনা হয়নি। স্বেচ্ছাসেবকের দলে রয়েছেন আহমেদ আকতার জ্যোতি, হৃদয় হোসেন, আরিফ হোসেন তাহসিন, মোখলেসুর রহমান, রাসেল আহমেদ, মনির হোসেন, আরাফাত শরিফ, জিহাদ হাসান, ইব্রাহিম খলিল ইফতি, সৈয়দ ছাবেদ বুনানী, মো. তামিম, রিফাত চৌধুরী ও মো. শামিম, আসমা, জিয়াসমিন, তার মেয়ে মীম প্রমুখ। ইফতার করতে আসা সবাইকে তারা বলেন মেহমান। তবে প্রতিদিনই সেই মেহমানের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে আয়োজন বড় করার দরকার পড়ে, প্রয়োজন হয় বাড়তি টাকার। অবশ্য সেজন্য তাদের থেমে থাকতে হয়নি। শুভাকাঙ্ক্ষীরা পাশে দাঁড়িয়েছেন। এখন তারা ভাবছেন লকডাউনের কারণে আয়হীন হয়ে পড়া অসহায় মানুষের জন্য খাদ্যপণ্য সরবরাহের কথা।

শোভন বলেন, ‘আমাদের লোকবল কম। সীমিত পরিসরে এই কাজটি করছি। এটা যদি কারো ভালো লাগে তারা সেটা নিজেদের এলাকায় করতে পারে। আমাদের আর্থিক সহযোগিতা করা জরুরি না। টাউন হল বাজারের পরিচিত ব্যবসায়ীরা বাকিতে পণ্য দিচ্ছেন। দামও রাখছেন কম। তাদের গত বছরের বাকি এ বছর এসে শোধ করা হচ্ছে। এবারের বাকি কবে শোধ হবে ঠিক নেই। তবু তারা পণ্য দিয়ে যাচ্ছেন বলে আয়োজনটা বিরতিহীনভাবে করা যাচ্ছে। এ সব কিছুই আমাদের অনুপ্রাণিত করে কাজটি করে যেতে। আমরা চাই এ কাজটিকে মডেল ধরে দেশ জুড়ে সবাই এভাবেই নিরন্ন মানুষের পাশে এসে দাঁড়াক।’

ইত্তেফাক/এসজেড

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x