ভবঘুরে জীবন ছেড়ে আলোর পৃথিবীতে

ভবঘুরে জীবন ছেড়ে আলোর পৃথিবীতে
‘ভূইয়া ফ্যাশন’ কারখানায় কাজ করছেন তৃতীয় লিঙ্গের এমন ৫০ জন। ছবি: ইত্তেফাক

মাহিন শার্ট-প্যান্টের সঙ্গে একটি ওড়না মাথায় দিয়েছেন। আর ঠোঁট রাঙিয়েছেন গাঢ় লাল রঙের লিপিস্টিকে। হাতে একটি সাদা কাপড়ের ওপর সুঁই সুতো দিয়ে পাখি আঁকছেন। জানালেন এখানে তিনি এই সুতার কাজ শিখে নিজের ভাগ্য বদলে নিয়েছেন। এখন আর অনিশ্চিত জীবন নয়। এই তো কিছুদিন আগেও মাহিন রমনা পার্কের যৌনকর্মী ছিলেন। অনেকেই তাকে ব্যবহার করে টাকা না দিয়ে চলে যেত। ফলে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটত মাহিনের। তার ওপর ছিল হিজড়া বলে গালাগালি।

মাহিনের সঙ্গে গলা মিলিয়ে রন্টি ঠিক একই কথা বলেন, তার জীবনও রমনা পার্কের রাতের আঁধার ছিল। ছিল অনিশ্চয়তা কিন্তু আজ আর তা নেই। আজ তারা খেটে খাওয়া মানুষ। নিজে আয় করে নিজের সঙ্গে সংসারের খরচও বহন করছেন। তাদের জীবনে এমন পরিবর্তন এনেছেন তাদের সমগোত্রীয় সিদ্দিক ভূঁইয়া। যিনি তাদের কাছে সিন্থিয়া আপু নামে পরিচিত। পূর্ব গোড়ানের সিদ্দিক ভূঁইয়া সিন্থিয়ার ‘ভূঁইয়া ফ্যাশন’-এ সাধারণ নারী-পুরুষের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করছেন তৃতীয় লিঙ্গের এমন ৫০ জন। সিন্থিয়া আপু তাদের জন্য নতুন এক পৃথিবীর সন্ধান দিয়েছেন।

দ্বিতীয় তলার টেইলারিংয়ের পাশে বসে হাতের কাজ করতে করতে আরিফ রহমান রাধা জানান, পরিবার তাকে কীভাবে দূরে ঠেলে দেয়। নিজের ভাইবোনও আপন হয়নি। তারপর ফরিদপুরে হাটেবাজারে যৌনকর্মীর কাজ করেছেন। কাজের জন্য ঢাকায় এসেছেন। হিজড়া বলে মানুষ তাকে কাজ দিতে চায় না। তাই আবার সেই যৌনকর্মীর কাজে নেমে পড়া। আরিফিন জানান, ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তারপর আর পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারেনি। হিজড়াদের দলে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এক জন পরিচিতের মাধ্যমে জানতে পারেন তাদের মতো একজন মানুষ অসহায় হিজড়াদের কাজ দেন। সেই সিন্থিয়া আপুই তাকে হিজড়াদের দলে যেতে দেননি। তারপর থেকে তিনি এখানেই আছেন। যখন কাজ শিখেছেন তখন থাকা-খাওয়াসহ ২-৩ হাজার টাকা করে হাত খরচ পেতেন। আর এখন ১৪ হাজার টাকা বেতন পান। ‘ভূঁইয়া ফ্যাশন’-এর প্রতিটি বিভাগে কাজ করছেন হিজড়ারা। টেইলারিংয়ে ৩০ জনের মধ্যে চার জনই তৃতীয় লিঙ্গের। কাটিং সেকশনে কাজ করছেন ছয় জন, এদের মধ্যে দুই জন। ব্লক সেকশনের ১৮ জনের মধ্যে চার জন। ‘হ্যান্ড প্রিন্টের’ ওয়াসিম একাই ১০০। তৃতীয় লিঙ্গের এই শিল্পীর আঁকার কাজ অবাক হওয়ার মতো। এক টুকরো কাপড়ে ফুল পাখি আর গাছের কী সুন্দর দৃশ্য তুলে ধরেছেন। ওয়াসিম জানান, তিনি বিয়ে বাড়ির স্টেজ করা, বাড়িতে দেওয়াল প্রিন্টের মতো এমন অনেক কাজ করেছেন। করোনা তার এমন কাজগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। তারপরে এই ঠিকানা পেলেন।

মো. শামসুল আলম ব্লক সেকশনের প্রধান। তিনি জানান, এই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সম্পর্কে তার যে ধারণা ছিল এখানে এসে তা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। তারা সবাই খুব ভালো মানুষ। শেখার প্রতি আগ্রহ আছে। তাদের সঙ্গে কাজ করতে কখনো কোনো অসুবিধা হয়নি।

সিন্থিয়া আপু জানান, সৃষ্টিকর্তা তাকে আর ১০টা মানুষের চেয়ে আলাদা করেছেন বলে তিনি বুঝতে পারেন এদের কষ্ট কতটা ভয়াবহ। নিজের পরিবারে বঞ্চনার সম্মুখীন না হলেও স্কুলে কিংবা বাইরে গেলে তাকে সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। তাই বাবা-মা, ভাইবোনরা তাকে আগলে রাখতেন। নিজে কিছু করার ইচ্ছে ছিল আগাগোড়া। অসুস্থতার জন্য এসএসসি পাশ করে আর পড়াশুনা করতে পারেননি তিনি। তাই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে গবাদি পশুপালনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন আর বাবার কাছ থেকে নেওয়া তিনটি গরু দিয়ে শুরু করেন ফার্ম। এই ফার্মে এক সময় ৮০টির ওপরে গরু হয়। তার খামারে দুধ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত। এমন সময় শুরু হয় ’৯৮-এর বন্যা। পানির জন্য গরুগুলোকে বেচে দিতে বাধ্য হন। এরপর সেলাইয়ে মন দেন। মা-বোনদের ব্লাউজ, পেটিকোট সেলাই করে দিতেন। এমন সময় আড়ং-উত্পাদক চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়। কাউকে কিছু না বলে চলে যান মহাখালীর আড়ং অফিসে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার আড়ংয়ের সঙ্গে পথচলা। আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। শুধু পেছনে রেখে আসা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলোর দুঃখ ভুলতে পারেনি। এক এক করে যুক্ত করেছেন অসহায় মানুষগুলোকে। আজকের এই অবস্থানের পেছনে ডিজাইনার রুবি আপা আর তামারা আবেদ আপার কথা স্মরণ করেন তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x