সেই বিতর্কিত স্থপতির কাণ্ড

শঙ্কায় ঢামেকের ৫ হাজার শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্প

১০ মাসেও মেলেনি কারিগরি সহযোগিতা প্রকল্প প্রস্তাব
শঙ্কায় ঢামেকের ৫ হাজার শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্প
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ এবং পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে ৫ হাজার শয্যায় উন্নীতকরণের মহাপরিকল্পনা থমকে গেছে আলোচিত একটি স্থাপত্য প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিতর্কিত কর্নধারের কারণে।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বহু প্রকল্প লন্ডভন্ডকারী সেই স্থপতির থাবা পড়েছে এবার এই ২৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে। সেই স্থপতি নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটির ‘মহাপরিকল্পনা ও ডিজাইন প্রণয়ন’ করে পুরোপুরি জমা দেননি।

সরকারের প্রবল শক্তিধর একজন বিতর্কিত আমলা নেতা তার ক্ষমতার জোরে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতা প্রকল্প প্রস্তাবনার কার্যাদেশ কব্জা করে তুলে দেন বহু বিতর্কিত সেই স্থপতির হাতে। এরপর ১০ মাস অতিক্রান্ত হলেও ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতা প্রকল্প প্রস্তাবনা পুরোপুরি হাতে পাননি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বার বার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

এনিয়ে প্রায় প্রতি মাসে স্টেকহোল্ডারদের বৈঠক হচ্ছে। সর্বশেষ গত মাসের ১৯ এবং ২৩ তারিখ বৈঠক হয়েছে। সেখানে এই প্রকল্প নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের নির্মাণ অধিশাখা প্রকল্পের স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণে বৈঠক করে তাগাদা দেয়। শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত ঐ স্থপতির আবেদনে এখন আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো.নাজমুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ এবং পুনর্নির্মাণের জন্য ব্যয় প্রাক্কলনসহ মহাপরিকল্পনা ও ডিজাইন একটি বিশাল প্রজেক্ট। সাধারণত একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হয়। যার ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পটি এগিয়ে চলে। কিন্তু এ প্রকল্পটি এত বিশাল, যার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ডিপিপির আগে কারিগরি সহযোগিতা প্রকল্প প্রস্তাবনার (টিএপিপি) কাজ চলছে। যারা কার্যাদেশ পেয়েছেন তারা এখনো প্রজেক্ট পুরোটা জমা দেননি। নতুন করে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা দেওয়ার মেয়াদ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেইভাবে আমরা কাগজপত্র তৈরি করছি। প্রকল্পের কাজ কবে শুরু হবে তা বলা যাচ্ছে না। কিছুটা খসড়া আমরা পেয়েছি। বাকিটা পেলে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। ৬০ জনের মতো স্টেকহোল্ডার আছেন। তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সময় দিলে উনার দিকনির্দেশনা নেওয়া হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘যে প্রতিষ্ঠানটি কাজ নিয়েছে তাদের ব্যাপারে বিভিন্ন প্রকল্পে গাফিলতির কথা আমরা শুনেছি- এটা আমাদের নজরে আছে।’

এদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ এবং পুনর্নির্মাণের জন্য ব্যয় প্রাক্কলনসহ মহাপরিকল্পনা ও ডিজাইন প্রকল্প প্রণয়নে প্রায় ৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সময় বাড়িয়ে মহাপরিকল্পনা ও ডিজাইন জমা দেওয়ার শেষ সময় চলতি বছরের ৩০ জুন। তবে প্রায় অর্ধশত ভবন-অবকাঠামোর স্থাপত্য নকশাসহ নির্মাণ প্রক্রিয়ার কাজ অসমাপ্ত রেখে সংশ্লিষ্টদের বিপুল ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেওয়া বিতর্কিত সেই স্থপতিকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। তবে ওই সময়ের মধ্যে তিনি আদৌ ডিজাইন জমা দিতে পারবেন এমন ভরসা পাচ্ছেন না অনেকে।

ছবি: সংগৃহীত

আরেক কর্মকর্তা বলেন, ওই স্থপতি আমাদেরকে একেক সময় একেক অজুহাত, নানা বাহানা দেখিয়ে সময় ক্ষেপণ করছেন। তার পক্ষে ওপর মহলের আশীর্বাদ আছে বলেও জানান মাঝে মধ্যে। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ভবন-অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে এই স্থপতির প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ড সম্পর্কে আমরা আগে ওয়াকিবহাল ছিলাম না। তবে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) দুটি বহুতল ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ কাজে লুটপাট ও প্রকল্পটি তছনছ করার ঘটনা এবং পত্রপত্রিকায় তার প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ড সম্পর্কে জেনেছি। প্রথিতযশা ও বিপুল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন স্থাপত্য প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যাদেশ না দিয়ে বিতর্কিত একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই অন্য রহস্য আছে। তার কারণে সব প্রকল্প থেমে আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই স্বপ্নের প্রজেক্ট ভেস্তে দিতে চায় একটি চক্র। তারাই মেগা প্রকল্পটি নিয়ে টালবাহানা করছে।

যা আছে এই প্রকল্পে: সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এই মেগা প্রকল্প সম্পন্ন করার জন্য ২০১৯ সালে ৭ বছর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। এজন্য ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। ইতিমধ্যে দুই বছর চলে যাচ্ছে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। এর মধ্যে আগের প্রকল্প পরিচালক চলে গেছেন। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক পুরোদমে কাজ করতে বদ্ধপরিকর। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের স্বীকৃতি পাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু একজন বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ ও সাজানো প্রকল্প লন্ডভন্ডকারী স্থপতিকে নকশার কার্যাদেশ দিয়ে প্রকল্পের ভবিষ্যত প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত

২০১৫ সালে প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়। ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢামেক হাসপাতাল সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের একটি প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কিছু অনুশাসন দেন। হাসপাতালটিকে নতুন করে সাজাতে ১৮ তলা ভবন হবে ৫টি। যার প্রতিটি হবে এক হাজার বেডের। আউটডোর কমপ্লেক্স হবে ২টি। থাকবে আলাদা জরুরি বিভাগ। মেডিকেল কলেজটির আধুনিকায়নসহ, নার্সিং কলেজটিকে উন্নীত করা হবে নার্সিং ইন্সটিটিউটে। এর বাইরে মেডিকেল কলেজের আবাসিক হলগুলোকেও তৈরি করা হবে নতুন করে। আর ডিএমসি লাগোয়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা প্রশস্ত করতে ছেড়ে দেওয়া হবে বেশ কিছু জায়গা। মেডিকেল কলেজের মূল ভবনের সম্মুখাংশ অক্ষত রেখে বাকি পুরনো ভবনগুলো পর্যায়ক্রমে ভেঙে ফেলা হবে। তবে পাঁচশ’ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল-২ থেকে যাবে, যেটি নতুন তৈরি হয়েছে।

নতুন ভবনগুলোর সঙ্গে মিল রেখে এটির সংস্কার করা হবে। এছাড়া ২০০১ সালে নির্মিত ইমার্জেন্সি কমপ্লেক্সটিও ভাঙা হবে না। তবে ভবনটিকে ১৮তলায় রূপান্তরিত করা হবে। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৬১টি ভবন আছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ তিনটি প্রতিষ্ঠান এ প্রজেক্টের অন্তর্ভুক্ত। প্রকল্পের আওতায় মেডিকেল কলেজের জন্য ১২তলা বিশিষ্ট একটি বিশাল একাডেমিক কমপ্লেক্স হবে। পাশাপাশি নার্সিং কলেজের একটি কমপ্লেক্স হবে। নার্সিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদাভাবে ভবন তৈরি হবে। তবে আগের মতোই একটি প্রতিষ্ঠান আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

ছবি: সংগৃহীত

এ প্রকল্পের আওতায় এখানে একটি মেডিকেল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন সেন্টার নির্মাণ করা হবে। এজন্য আলাদা একটি ভবনের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলের ৩০ একর জমির মধ্যে ১১ থেকে ১২ শতাংশ সবুজ এলাকা রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ৫৮ থেকে ৬০ শতাংশ এলাকা সবুজায়নের আওতায় আসবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরের ওপর দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া কোনো গাড়ি চলাচল করবে না। সব গাড়ি আন্ডারগ্রাউন্ড দিয়ে চলাচল করবে। গাড়িগুলো বেসমেন্টে পার্ক করবে। পরে লিফটে সংশ্লিষ্ট বিভাগে চলে যাওয়া যাবে।

গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুষ্ঠানে এই হাসপাতাল ঘিরে তার স্বপ্নের কথা তুলে ধরে বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজকে আমরা নতুনভাবে গড়ে তুলতে চাই। ৫ হাজার রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা হবে। কারণ এই একটাই জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যাতে সারা বাংলাদেশ থেকে মানুষ চিকিতৎসার জন্য আসেন। পুরনো ঐতিহ্য কিছুটা আমরা ধরে রাখতে পারি সামনের ডিজাইন অনুযায়ী। কিন্তু ভেতরে সম্পূর্ণ আধুনিক একটা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ আমরা নির্মাণ করব। ইতোমধ্যে সেই প্ল্যান তৈরি করা আছে। সেটার কাজ যাতে দ্রুত হয় তার ব্যবস্থা আমরা করতে চাই।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x