ভোগান্তি নিয়ে ঢাকা ছাড়ছে নগরবাসী, ফেরা নিয়ে শঙ্কা

ভোগান্তি নিয়ে ঢাকা ছাড়ছে নগরবাসী, ফেরা নিয়ে শঙ্কা
গাবতলী বাস টার্মিনাল। ছবি: ইত্তেফাক

গেল রোজার ঈদে ঢাকায় থাকলেও এবার বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার ঘোষণা আসার পর থেকেই অপেক্ষা কখন গ্রামের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়বেন। আর এজন্যই বাগেরহাট যেতে আগাম টিকিট হাতে পেতে ঢাকা ছাড়ার দুইদিন আগেই থেকেই চেষ্টা চালাচ্ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী ফাহিমা আক্তার সুমি। তবে যাওয়ার টিকিট হাতে পেলেও ছুটি শেষে ঢাকা ফেরা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। জরুরি সেবায় চাকরি করায় আগামী ২৩ জুলাইয়ের মধ্যেই ঢাকায় ঢুকে অফিস করতে হবে তাকে।

এমন উদ্বেগ নিয়ে তিনি বলেন, ‘রোজার ঈদে বাবা-মায়ের কাছে যেতে পারিনি, এবার যেহেতু সরকার বিধিনিষেধ শিথিল করে দিয়েছে তাই সিদ্ধান্ত নিলাম গ্রামে যাবো। অনেক কষ্ট করে যাওয়ার টিকেট ম্যানেজ করেছি। এখন চিন্তায় আছি ঢাকায় ফেরা নিয়ে। নির্ধারিত সময়ে না ফিরতে পারলে সহজে গাড়ি পাবো না। এছাড়া নির্ধারিত সময়েও অনেক ভিড় হবে, যেহেতু সবাই একসঙ্গে রওয়ান দিবে। তাই যেতে পারলেও সময়মতো ফিরতে পারবো কী না শঙ্কার মধ্যে আছি।’

No description available.

ছবি: আব্দুল গনি

দেশে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করলে সরকার বীমা, শেয়ারবাজার, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানা চালু রেখেই গত ১ জুলাই থেকে সাতদিনের কঠোর বিধিনিষেধ জারি করে। দেওয়া হয় ২১টি নির্দেশনা। পরবর্তীতে সেই বিধিনিষেধ গত ১৪ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে সেই মেয়াদ শেষে ঈদকে সামনে রেখে ১৫ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত বিধিনিষেধ শীতল করা হয়েছে। আগামী ২৩ জুলাই থেকে আবারও কঠোর বিধিনিষেধ জারির ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

চাকরি প্রার্থী মো. জুলহাস রাজধানীর আজিমপুর এলাকায় সহপাঠীদের সঙ্গে একটি মেসে থাকেন। অল্প খরচে কীভাবে বাড়িতে পৌঁছানো যায় এ পথ খুঁজছেন দুইদিন ধরে। বাস, ট্রেন সব পরিবহনেই এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক আসন খালি রেখে চলাচল করায় স্বাভাবিকর চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে জুলহাসেরও।

জুলহাস বলেন, ‘জেলা কাছে হওয়ায় ভাড়া এবং সুবিধার জন্য সবসময় ট্রেনে করেই বাড়ি যাই। এবারও সিদ্ধান্ত নিলাম একইভাবে যাবো তবে অগ্রিম টিকেট নেওয়ার চেষ্টা করছি। না পেলে মনে হয় না যে ট্রেনে যেতে পারবো। না হলে হয়তো দিগুণের চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে কষ্ট করে বাসে যেতে হবে। কষ্ট করে না হয় গেলাম। যাওয়ার পর ঢাকা আবার আসব কীভাবে এইটা তো ভেবে পাচ্ছি না। এবার লকডাউনের পর ছাড়া ফেরার আর কোন পথ নেই। ভাবছি বাড়িতেই এই কয়দিন থাকবো।’

আবার অনেকেই দেখা গেছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জের ধরে আগেই ঈদযাত্রার টিকিট অগ্রিম হাতে পেয়েছে। তবে সেখানে গুনতে হয়েছে বাড়তি ভাড়া। ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়াসহ নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে আরও বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।

ফরিদপুরগামী একজন যাত্রী হিরণ মিয়া বলেন, ‘গাড়ির সংখ্যা বেশি হলেও আসন তো সীমিত এ জন্য তো কিছুটা সমস্যা হচ্ছেই। এখন তো নির্ধারিত ভাড়া দিয়েও যেতে পারছি না। চুক্তি করে গাড়িতে উঠতে হচ্ছে। সবাই গ্রামে যাওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করছে সমস্যাটা হলো এখানে। আবার অনেকে কোন প্রকার ঝামেলা ছাড়া স্বাভাবিকভাবেই যেতে পারছেন বলে জানিয়েছেন।’

গাবতলী বাস টার্মিনালে গেলে দেখা যায় সকাল থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন যাত্রীরা। সড়কে যানজটের কারণে বাস ছাড়ছে দেরি করে। ফলে যাত্রা পথে ভোগান্তিতে পড়েছে যাত্রীরা। যেখানে অতিরিক্ত ভাড়া ঠেকাতে ম্যাজিস্ট্রেটসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর একাধিক টিম কাজ করছে।

এভাবে আজ রবিবার (১৮ জুলাই) রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী, কমলাপুর ও সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে আজ গেলে দেখা যায় যাত্রীরা তড়িঘড়ি করে যে যেভাবে পারছেন ছাড়ছেন ঢাকা।

No description available.

ছবি: ইত্তেফাক

এদিকে পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন-সারা বছর বন্ধ ছিল তাদের আয়, এ সময় একটু আয় করতে না পারলে চলবেন কী করে? এছাড়াও ঈদের পরে আবার সব কিছুই বন্ধ হয়ে যাবে। তখন তাদের বেকার থাকতে হবে।

বাড়তি ভাড়া নিয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরিবহন শ্রমিক দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘গাড়ির সংখ্যা বেশি হলে কী হবে আসন তো অর্ধেক কমে গেছে। এ সময়টা আমাদের কিছু বাড়তি আয় হয়। এখন তো সারা বছরই করোনা। লকডাউনের জন্য কয়েক দিন পর পর আমাদের বেকার বসে থাকতে হয়। আয় না করতে পারলে খাবো কী। আমরা কোন বাড়তি ভাড়া নিচ্ছি না। যা ভাড়া তাই নিচ্ছি।’

বর্ধিত ভাড়াসহ নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি ভাড়া আদায়ের বিষয়টি জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত উল্লাহ দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন অভিযোগ আসলে আমরা এর ব্যবস্থা নিচ্ছি। এছাড়া টার্মিনালগুলোতে বিআরটিএর ম্যাজিস্ট্রেট আছেন, আমাদের লোকজন আছেন তারা মনিটরিং করছেন। ভাড়া বেশি আদায়ের কোন অভিযোগ আমাদের কাছে আসলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিবো এবং বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি।’

সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

এ প্রসঙ্গে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘আমরা গত দুই দিন যা দেখেছি আজ সেটা আরও ভয়াবহ, অনেক পথে যেখানে নির্ধারিত ভাড়া ২০০ টাকা সেখানে ৫০০ টাকা নিচ্ছে।’

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব আরও বলেন, ‘আমরা আগেই পরিবহন সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে অবগত করেছি ঈদকে সামনে রেখে ভাড়া বিষয়ে যাত্রীদের যেনো কোন হয়রানি না হয়। তবে এর ভালো ফলাফল আমরা পায়নি। এ অবস্থায় আমরা সরকার ও পরিবহন মালিককে অনুরোধ করবো যেনো করোনার সংকট সময়ে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর গণপরিবহনগুলোর অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করে এবং যারা আদায় করছে তাদের বিরুদ্ধে যেন আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।’

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x