ডা. ঈশিতার সাফল্য, ডিগ্রি, পুরস্কার-খ্যাতি সবই ভুয়া

ডা. ঈশিতার সাফল্য, ডিগ্রি, পুরস্কার-খ্যাতি সবই ভুয়া
র‌্যাবের হাতে আটক ইশরাত রফিক ঈশিতা। ছবি:সংগৃহীত

বিগ্রেডিয়ার জেনারেল পদ, ইন্টারন্যাশনাল ইন্সপিরেশনাল ওমেন অ্যাওয়ার্ড, বছরের সেরা নারী বিজ্ঞানী, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রিসার্চ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, ভারতের টেস্ট জেম অ্যাওয়ার্ড, থাইল্যান্ডের আউটস্ট্যান্ডিং সায়েন্টিস্ট অ্যান্ড রিসার্চার অ্যাওয়ার্ডসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন বলে প্রচার করতেন চিকিৎসক ইশরাত রফিক ঈশিতা (৩৪)। কিন্তু এর সবই ভুয়া। তিনি কোনও পুরস্কার অর্জন করেননি। সব সনদ নিজেই তৈরি করেছেন। মূলত প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাৎ ও খ্যাতি অর্জনের জন্যই এসব করেছেন তিনি।

রবিবার বিকালে রাজধানীর কাওরান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন এসব তথ্য জানান। রবিবার সকালে মিরপুর থেকে ইশরাত রফিক ঈশিতা ও তার সহযোগী শহিদুল ইসলাম দিদারকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৪।

ঈশিতা পেশায় চিকিৎসক। তিনি ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ২০১৩ সালে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। ২০১৪ সালের প্রথম দিকে মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। এরপর একটি সরকারি হাসপাতালে চুক্তিভিত্তিতে কাজ করেন। তবে ৪ মাস পর অনৈতিক কাজ করার অভিযোগে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

র‌্যাবের মুখপাত্র আল মঈন বলেন, মূলত উচ্চাকাঙ্খা থেকেই ঈশিতা প্রতারণা শুরু করে। করোনাকালীন তিনি বিভিন্ন চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। র‌্যাবের সাইবার মনিটরিং টিম ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঈশিতাকে গ্রেফতার করা হয় বলেও জানান তিনি। ঈশিতা নিজেকে চিকিৎসা বিজ্ঞানী, গবেষক, বিশিষ্ট আলোচক, ডিপ্লোম্যাট, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পিএইচডি হোল্ডারসহ বিভিন্ন পরিচয় দিতেন। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি ছাড়া চিকিৎসা শাস্ত্রে তার উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেই। কিন্তু নামের পাশে চিকিৎসা শাস্ত্রের সব উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের ট্যাগ বসিয়ে নিয়েছেন নিজেই। মিরপুর-১ থেকে গ্রেফতারের পর তার বাসা থেকে ভুয়া আইডি কার্ড, ভুয়া ভিজিটিং কার্ড, ভুয়া সিল, ভুয়া সনদ, ভুয়া প্রত্যায়নপত্র, পাসপোর্ট, ল্যাপটপ, ইয়াবা, বিদেশি মদ ও বিগ্রেডিয়ার জেনারেল পদের দুটি ইউনিফর্ম, র‌্যাঙ্ক ব্যাচ উদ্ধার করে র‌্যাব।

dhakapost

ঈশিতা টকশো আলোচক, চিকিৎসা বিজ্ঞানী, গবেষক, পিএইচডিধারী, মানবাধিকার কর্মী, সংগঠক, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন বলে পরিচয় দিতেন। এসব পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ভুয়া সনদও তৈরি করেছেন। চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে নিজেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে প্রচার করেন। কখনও নিজেকে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হিসেবেও প্রচার করেন। এছাড়া নিজেকে চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও গবেষক হিসেবে পরিচয় দেন। চিকিৎসা শাস্ত্রে কোনো উচ্চতর ডিগ্রি না থাকলেও তিনি নিজেকে এমপিএইচ, এমডি, ডিও ইত্যাদি ডিগ্রিধারী হিসেবে পরিচয় দিতেন।

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিভিন্ন মতবাদ প্রচার করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন ওয়েব সাইট ও জার্নালে চিকিৎসা শাস্ত্রে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, আর্টিকেল, থিসিস পেপার প্রকাশনা করেছেন বলেও দাবি করতেন তিনি। নিজের ভুয়া সাফল্য স্বীকৃতির প্রচারণায় দেশের গণমাধ্যম সুকৌশলে ব্যবহার করতেন। গ্রেফতারকৃত ঈশিতা করোনা মহামারিকে পুঁজি করে ভার্চুয়াল জগতে প্রতারণায় সক্রিয় ছিলেন। এ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচক ও প্রশিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিনি অনলাইনে করোনা প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন ও সার্টিফিকেট প্রদান করে প্রচার-প্রচারণা করেছেন। মূলত খ্যাতি ও অর্থ আত্মসাতের জন্য এমন করতেন তিনি।

গ্রেফতারকৃত ইশরাত রফিক ঈশিতা ‘ইয়াং ওয়ার্ল্ড লিডারস ফর হিউম্যানিটি’ নামে একটি অনিবন্ধনকৃত ও অননুমোদিত সংগঠন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যার ফেসবুক পেজ ও লিংকইন আইডি রয়েছে। সংস্থাটির সদর দফতর নিউইয়র্কে অবস্থিত বলে প্রচারণা করা হয়েছে। বর্ণিত ফেসবুক পেজের কো-অ্যাডমিন গ্রেফতারকৃত ইশরাত রফিক ঈশিতা। এই ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দেশ ও আন্তর্জাতিক মণ্ডলে প্রতারণা নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে।

ঈশিতা প্রতারণার কৌশল হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর র‌্যাঙ্ক ব্যাজ ও পদ অর্জনের চেষ্টা চালান। তিনি ফিলিপাইনে পরিচালিত একটি ওয়েবসাইট থেকে ৪০০ ডলারের বিনিময়ে সামরিক বাহিনীর ন্যায় ‘বিগ্রেডিয়ার জেনারেল’ পদটি নেন বলে জানান। তবে এই সংগঠনের কোনো অস্তিত্ব পায়নি র‌্যাব। এছাড়া তিনি ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন, কাউন্টার ক্রাইম ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন ইত্যাদি সদস্য পদের ভুয়া সনদ তৈরি করে প্রচারণা চালিয়ে থাকেন।

তার সঙ্গে গ্রেফতার দিদার ২০১২ সালে একটি ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা (ইঞ্জিনিয়ার) সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিপ্লোমাও সম্পন্ন করেন। বর্তমানে একটি গার্মেন্টসে কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x