বিমানবন্দরে কার পার্কিংয়ের ছাদে বসবে পিসিআর ল্যাব!

অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, খোলা ছাদ ল্যাবের জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়
বিমানবন্দরে কার পার্কিংয়ের ছাদে বসবে পিসিআর ল্যাব!
বিমানবন্দরের কার পার্কিংয়ের এই ছাদে বসানো হবে পিসিআর ল্যাব —ইত্তেফাক

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার পার্কিংয়ের ছাদের ওপরে পিসিআর ল্যাব বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি উঠেছে। অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, খোলা ছাদ ল্যাব স্থাপনের জন্য উপযুক্ত নয়। ছাদের ওপরে ল্যাব স্থাপন করতে গেলে সেখানে রুম তৈরি করা, এসি লাগানো, ল্যাবের গুণমান বজায় রাখার জন্য ন্যূনতম বায়োসেফটি লেভেল ঠিক করা, কুল বক্স বুথ বসানো, পিসিআর কেবিনেট, চেঞ্জিং রুম সুবিধাসহ অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। সব মিলিয়ে বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব স্থাপন দীর্ঘসূত্রতায় পড়ল।

একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়ায়ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এদিকে দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরাতে বিমানবন্দরে করোনা টেস্ট (আরটি-পিসিআর) ল্যাব স্থাপন নিয়ে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যে কারণে উপেক্ষিত হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছিলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব স্থাপন করতে হবে। সেই লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সাতটি প্রতিষ্ঠানকে ল্যাব স্থাপনের অনুমতি দেয়। কিন্তু বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা ও গড়িমসির কারণে অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ল্যাব স্থাপন করতে পারছে না। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার জন্যই এই গড়িমসি করছেন বলে সূত্র দাবি করেছে।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, পিসিআর ল্যাব অবশ্যই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসাতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইমিউনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আহমেদ আবু সালেহ বলেন, খোলা আকাশের নিচে ছাদে পিসিআর ল্যাব বসানো কীভাবে সম্ভব? শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে ছাড়া পিসিআর ল্যাব বসানো যাবে না।

এদিকে বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব বসানোর জন্য যে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তারমধ্যে মাত্র দুটির সক্ষমতা আছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে ল্যাব বসানোর অনুমতি দেওয়া, খোলা আকাশের নিচে ছাদে ল্যাব বসানোর জায়গা নির্ধারণ করা—এগুলো কীসের ইঙ্গিত? এটা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার ষড়যন্ত্র। বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা।

এছাড়া গত ১৪ সেপ্টেম্বর আবুধাবি থেকে নতুন যে নির্দেশনা এসেছে তা নিয়েও চলছে ষড়যন্ত্র। নির্দেশনা বিষয়ে ‘একটি প্রতিষ্ঠান’ ছাড়া কাউকে কিছু জানায়নি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। নির্দেশনার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দূরের কথা এমনকি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ও কিছু জানে না। কিন্তু বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ হঠাত্ করে নতুন এই নির্দেশনার কথা জানায়। অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, নতুন এই নির্দেশনা ১৪ তারিখ আসলেও আমাদের ১৬ তারিখ জানানো হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী কিছু মেশিন এবং একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা এসওপি জমা দিতে বলা হয়েছে। অথচ আমাদের গতকাল জানানো হয়েছে আজ শনিবার দুপুর ১২টার মধ্যে এসওপি জমা দিতে। যেটা এত অল্প সময়ের মধ্যে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ এ বিষয়ে আমাদের আগে জানানো হয়নি।

সূত্র জানায়, কাজ পাওয়া সাতটা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শুধু ডিএমএফআর মলিকুলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক আগে থেকেই নির্দেশনায় উল্লিখিত মেশিন এবং এসওপি বিষয়ে জানত এবং সেভাবেই প্রস্তুত ছিল। এটা অন্যায় বলে মনে করছে বাকি ছয়টি প্রতিষ্ঠান। এসওপি জমা নেওয়ার পর আবার আবুধাবি পাঠানো হবে। সেখান থেকে আবার আসবে দেশে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দূতাবাসে। এরপরে সিদ্ধান্ত হবে কোনো ল্যাব কাজ করবে, তারপর নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাব স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডিএমএফআর প্রতিষ্ঠানকে ল্যাব স্থাপনের কাজ দেওয়ার জন্যই যেহেতু এতকিছু, তাহলে আমাদের হয়রানি করার মানে কী? নতুন নির্দেশনা কেন ল্যাব অনুমোদনের আগে বিবেচনায় নেওয়া হলো না? এ ব্যাপারে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। বর্তমানে বহুতল পার্কিং ভবনটি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া রয়েছে। ল্যাবগুলোকে ছাদ ব্যবহারের জন্য দৈনিক ৮০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হবে। এছাড়া বিদ্যুত্সহ অন্যান্য ইউটিলিটি খরচ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে। এমন অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলো বেবিচকের কাছে কার পার্কিং ভবনের ২য় তলায় ল্যাব স্থাপনের জন্য জায়গা বরাদ্দ দিতে অনুরোধ জানিয়েছে।

অনেক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, শুধুমাত্র একটি ল্যাবকে কাজ দেওয়ার জন্য বিলম্ব করা হচ্ছে। অনুমোদন পাওয়া ল্যাবগুলো হলো—আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্টেমজ হেলথ কেয়ার (বিডি) লিমিটেড ঢাকা, সিএসবিএফ হেলথ সেন্টার, এএমজেড হাসপাতাল লিমিটেড, জয়নুল হক সিকদার ওমেন্স মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল, গুলশান ক্লিনিক লিমিটেড ও ডিএমএফআর মলিকুলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক। সাতটি প্রতিষ্ঠানের এসওপি মানসম্মত কি না তা যাচাই করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠাতে হবে। আরব আমিরাত সেসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আপত্তি না জানালে কাজ দেওয়া হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের এসওপি নিয়ে আপত্তি আসলে তাদের কাজ দেওয়া হবে না।

প্রসঙ্গত, দেশের বিমানবন্দরে আরটি পিসিআর টেস্ট করানোর ব্যবস্থা না থাকায় আরব আমিরাতগামী প্রায় ৫০-৬০ হাজার প্রবাসী দেশে আটকা পড়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন দেশের ২ লাখ প্রবাসী শ্রমিক কর্মস্থলে যেতে পারছেন না।

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x