২০১৯ সালেই যাত্রা মেট্রোরেলের, বয়ে আনবে নাগরিক স্বস্তি

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৯, ১৫:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ

  পাভেল মাহমুদ

স্বাধীনতার পর গত ৪৮ বছরে রাজধানীতে যেসব বড় পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে মেগা প্রজেক্ট হলো ‘মেট্রোরেল’। ছবি: পাভেল মাহমুদ

স্বাধীনতার পর গত ৪৮ বছরে রাজধানীতে যেসব বড় পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে মেগা প্রজেক্ট হলো ‘মেট্রোরেল’। আর এটি মাইলফলক হয়ে থাকবে ইতিহাসে। এ শুধু সোনালি স্বপ্নই নয়, বাস্তবে রূপ পেতে যাওয়া বিশাল প্রকল্প। ২০১৭ সাল থেকে শুরু হওয়া মেট্রোরেলের কার্যক্রম বহুদূর এগিয়ে গেছে। রাজধানী বাসীর চলাচলে স্বস্তি আর যানজট নিরসনে উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোর সমতুল্য মঞ্চে দাঁড়ানোর সফল চেষ্টা হতে চলেছে এই মেট্রোরেল। 

ধুলিধূসর এই শহরে মাটির নিচ থেকে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে এক একটি কলাম। আর সে কলামগুলোর ওপর বসে যাচ্ছে এক একটি স্প্যান। তাকালেই মনে হবে স্প্যানগুলো নীল আকাশের সঙ্গে মিশে আছে নৌকার মত। এর ওপর দিয়েই ইলেকট্রিক দাঁড় টেনে চলে যাবে মেট্রোরেলের বগিগুলো।

রাজধানীকে আধুনিক সুবিধার আওতায় আনতে ২০.০১ কিলোমিটার পর্যন্ত মেট্রোরেল হবে। উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মিরপুর হয়ে ১০ নম্বর, কাজীপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া, তালতলা হয়ে আগারগাঁও পর্যন্ত হবে প্রথম ধাপের মেট্রোরেল। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এর কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।  আর দ্বিতীয় ধাপে কাজ শেষ হবে ফার্মগেট থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। 

মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা দেবে জাপানের সংস্থা জাইকা। বাকি ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা জোগাবে সরকার।

মেট্রোরেলের স্টেশনে উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক সব ব্যবস্থা থাকবে। মেট্রোরেল চলার সময় শব্দ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

প্রতি ৪ মিনিট পর পর ১ হাজার ৮০০ যাত্রী নিয়ে চলবে মেট্রোরেল। ঘণ্টায় চলাচল করবে প্রায় ৬০ হাজার যাত্রী। প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৪০ মিনিটের কম।  এর প্রস্তাবিত ১৬টি স্টেশন হচ্ছে উত্তরা (উত্তর), উত্তরা (সেন্টার), উত্তরা (দক্ষিণ), পল্লবী, মিরপুর ১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, সোনারগাঁও হোটেল, জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, জাতীয় স্টেডিয়াম এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এলাকা।

জানা গেছে, মেট্রোরেলে যাত্রী বহনের জন্য ইঞ্জিনসহ বগিগুলো তৈরি করা হচ্ছে জাপানে। যার কাজ একেবারে শেষের পথে। 

মেট্রোরেলের কাজ এগিয়ে নিতে ০৮টি (পি-০৮) প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। এই কাজে নিয়োজিত ইঞ্জিনিয়াররা জানিয়েছেন এ সব তথ্য। 

মেট্রোরেলটি পুরোপুরি চালু হলে ২০২০ সাল থেকে প্রতিদিন ৪ লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী, ২০২৬ সালে ৫ লাখ ৮৩ হাজার এবং ২০৫১ সালে ১৩ লাখ যাত্রী সেবার আওতায় আসবেন।

মেট্রোরেল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ও পরিচালনা করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। 

আরও পড়ুন: নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দেয়ার দাবি

এদিকে, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, মেট্রোরেলের কাজ দ্রুত গতিতেই এগিয়ে চলছে। উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মিরপুর হয়ে আগারগাঁও পর্যন্ত এর কাজ প্রায় ৭০ ভাগ এগিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন প্রজেক্টেরের বিভিন্ন কর্মচারীরা। ৩৭৭টি কলাম করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৬টি কলামের কাজ বাকী থাকলেও তা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।  প্রথম ধাপের কাজ শেষের দিকে। এখন দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু হয়েছে ফার্মগেট থেকে মতিঝিল পর্যন্ত।

শ্যাওড়াপাড়া এরিয়ার সাব ইঞ্জিনিয়ার আনিসুর রহমান বলেন, যেভাবে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে তা যদি ধরে রাখা যায় তবে ২০১৯ এর ডিসেম্বরে একটি পূর্ণাঙ্গ অবস্থা হয়তো দেখা যাবে। আমরা প্রায় ৭০ ভাগ কাজ এগিয়ে নিয়েছি।

ড্রাম ট্রাক অপারেটর সেলিম মাহমুদ বলেন, প্রায় সবগুলো কলামই স্থাপন হয়ে গেছে। এখন শ্যাওড়াপাড়া প্রজেক্টে ৬টি কলাম বাদ আছে। এক থেকে দেড় মাসেই তা করা যাবে। 

আগারগাঁও এস-৮ ও এস-৯ প্যাকেজের ইনচার্জ তানভির রহমান জানান, এর কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে স্টেশন হবে। তাই কাজগুলো খুব সহজ নয়।  ২০১৯ সালের মধ্যে কাজ শেষ হবে কি না এর জবাবে তিনি বলেন, আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তবে এর মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে কি না বলা যাচ্ছে না। কাজ দ্রুত না হলে আরও দু বছরও লেগে যেতে পারে।

আগারগাঁও প্রজেক্টের ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ার হোসেন জানান, এখানে একটা স্টেশন বা জংশন হবে। এই আগারওগাঁয়েই এসে শেষ হবে প্রথম ধাপের কাজটি। শ্যাওড়াপাড়া ও আগারগাঁয়ে দুটো বড়ো স্টেশন হবে।

এদিকে, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দেশের প্রথম মেট্রো রেলের নির্মাণ প্রকল্পের স্টিল স্ক্রু পাইল ড্রাইভিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি রাজধানীর ফার্মগেটের খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইন্সটিটিউটের সামনে এমআরটি লাইন ৬’র  প্যাকেজ ৫’র উদ্বোধন করেন। ওই সময় মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের অগ্রগতি তুলে ধরে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে মেট্রোরেলের পুরো কাজ শেষ হবে। আর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ২০১৯ সালের ডিসেম্বরেই শেষ হবে’। 


তিনি বলেন, ‘মেট্রোরেলের ২৫শ’ মিটার ভায়াডাক্ট দৃশ্যমান হয়েছে। আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত ৩ দশমিক ১৯৫ কি. মি. ভায়াডাক্ট ও তিনটি স্টেশন নির্মাণের জন্য পরিসেবা স্থানান্তর ও চেকবোরিং সম্পন্ন হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ১৯৭টি ট্রায়াল পিটের মধ্যে ৩৫টি ট্রায়াল পিট এবং ৪৫০টি বোরড পাইলের মধ্যে ৩টি বোরড পাইল সম্পন্ন হয়েছে।

আরও পড়ুন: শাহজালালে ময়লার ঝুড়িতে মিলল প্রায় ১৬ কেজি সোনা

এম আরটি লাইন-৬’র প্যাকেজ-৫’র কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোমেন লিমিটেড ও অ্যাবেনিকো জেভি।   
এতে বাসের মতো গণপরিবহনের চলার পথ বদলে দেওয়া হয়েছে। রাস্তা সংকুচিত হয়ে বিপত্তিতে পড়তে হচ্ছে যাত্রী ও চালকদের। নতুন করে দুর্ভোগ বেড়েছে ফার্মগেট, খেজুরবাগান, তেজগাঁও, বাংলামোটরসহ আশপাশের এলাকাবাসী ও কর্মজীবী মানুষের। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ৩৭৭টি পিলারের ওপর ৩৭৬টি স্প্যান বসে বিস্তৃত হবে ২০ কিলোমিটারের মেট্রোরেল প্রকল্প। এর মধ্য প্রথম ভাগে প্রায় ১২ কিলোমিটার অংশে রয়েছে আগারগাঁও পর্যন্ত।

অন্যদিকে, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছেন, ২০২২ সালের মধ্যেই জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) চলমান মেট্রোরেলের কাজ শেষ করতে পারবে। পরিকল্পনা মন্ত্রীর সঙ্গে এ বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) বিকেলে জাইকার বাংলাদেশ প্রধান হিতোশি হিরাতার নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল বৈঠক করেন। তখন জাইকার প্রতিনিধি দল পরিকল্পনা মন্ত্রীকে জানান, তারা ২০২২ সালের মধ্যে মেট্রোরেল নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারবেন।

সবশেষে বলা যায়, আগামী সময়ে রাজধানীকে যানজটমুক্ত রাখতেই মেট্রোরেল, যা জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ তৈরি করবে। যেখানে মানুষের ক্লান্তি ও শ্রমের লাঘব হবে। বাঁচবে সময়, বৃদ্ধি পাবে রাজধানীর আধুনিক রূপ।

ইত্তেফাক/এমআই