ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬
৩৪ °সে


নতুন ধরনের ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধ জরুরি

নতুন ধরনের ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধ জরুরি
অ্যাডিস মশা নিধনে রাজধানীর আজিমপুরে ছোটভাট মসজিদের সামনে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। ছবি : ইত্তেফাক

প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় এবং আতঙ্কের কারণ হলো, এ বছর ডেঙ্গু জ্বরের ধরন ও লক্ষণে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। ফলে যে সব রোগী নিজেরাই ডেঙ্গু জ্বর শনাক্ত করতে পারতেন, এসব লক্ষণ পরিবর্তনে রোগীরা সহজে বুঝতে পারেন না। আর এ কারণে জ্বর হলে রোগীরা চিকিত্সকের কাছে যেতে দেরি করছেন। এমনকি দুই থেকে তিন দিনের জ্বরে অনেক চিকিত্সকও সামান্য জ্বর মনে করে ডেঙ্গু জ্বর শনাক্তকরণে দেরি করছেন।

কারণ ধরন পালটে যাওয়ার ফলে ডেঙ্গু জ্বরের স্বাভাবিক যেসব লক্ষণ থাকে, সেগুলো এ বছর অনেক রোগীর মাঝেই পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণত ডেঙ্গু জ্বর হলে রোগীর প্রচণ্ড জ্বর (১০৩ থেকে ১০৬ ডিগ্রি), শরীর এবং গিরায় গিরায় ব্যথা, যাকে বলে হাড়ভাঙা জ্বর বা ব্রেকবোন ফিভার, চার থেকে পাঁচ দিন পরে জ্বর কমে যায় এবং গায়ে র্যাশ ওঠে। এই সময় জ্বর কমে যাওয়ার পরপরই রক্তের প্লাটিলেট কমে যায় ও রক্তরক্ষণের ঝুঁকি থাকে। আর বর্তমানে ডেঙ্গু জ্বরের ধরন পালটে যাওয়ার কারণে দেখা যায়, জ্বর অল্প অল্প থাকে, শরীরে তেমন ব্যথাও হয় না, এমনকি অধিকাংশ রোগীর গায়ে র্যাশও হচ্ছে না। আবার এমনও দেখা যায়, জ্বর হওয়ার দুই থেকে তিন দিন পরই প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে, আর এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। এ বছর যারা মারা গেছেন তারা কিন্তু সামান্য জ্বর মনে করে অবহেলা করেছেন এবং চিকিত্সকের পরামর্শও হয়ত বা নেননি। এ কারণে রোগীরা বুঝে উঠার আগেই প্লাটিলেট কমে রক্তক্ষরণ এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ শুরু হলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

অতীতে ডেঙ্গু জ্বর হলে রোগীরা লক্ষণগুলো বুঝতে পারতেন এবং নিজেরাই ডেঙ্গু জ্বর ধারণা করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতেন। কিন্তু এখন তেমন কোনো লক্ষণ না থাকায়, রোগীরাও তা বুঝে উঠতে পারেন না। ফলে আক্রান্ত রোগীরা মনে করেন, সামান্য জ্বর বা ভাইরাস জ্বর হয়েছে, তাই চিকিত্সকের কাছে যাননি বা দেরি করে গিয়েছেন। আবার অনেক চিকিত্সকও সামান্য জ্বর মনে করে বিষয়টিকে গুরুত্ব নাও দিয়ে থাকতে পারেন। জ্বর হওয়ার পর যদি ডেঙ্গু পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যেত, তা হলে ঝুঁকি কম হতো।

ডেঙ্গু জ্বর প্রথমবার হলে বেশি জটিল হয় না। যারা দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি। যাদের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে, তারা আগে সম্ভবত আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। এ জন্য রোগীদের প্রতি পরামর্শ, যেহেতু বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, তাই যেকোনো ধরনের জ্বর হলে অবহেলা করা যাবে না। সামান্য জ্বর হলেও তাদের চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে এবং ডেঙ্গু হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। বিশেষ করে যারা প্রথমবার আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলেই ঝুঁকিটা অনেক বেশি। তাই এ ধরনের রোগীদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে।

রোগীদের প্রতি আরো পরামর্শ, জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল এবং তরল জাতীয় খাদ্য যেমন পানি, শরবত ইত্যাদি বেশি খেতে হবে। প্রচণ্ড ব্যথা হলেও অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ দোকান থেকে কিনে খাওয়া যাবে না, এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে। মনে রাখতে হবে, শরীরের যে কোনো অংশ থেকে রক্তক্ষরণ হলে, খেতে না পারলে বা প্রচণ্ড বমি হলে, গর্ভবতী কোনো মহিলা আক্রান্ত হলে এবং যারা অন্যান্য রোগে ভোগেন যেমন হূদেরাগ, লিভার বা কিডনির রোগ, তাদের অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

এ বছর বৃষ্টি বেশি হওয়ায় ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে, তবে মহামারি নয়, প্রকোপ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো রোগে আক্রান্তের মৃত্যু হার যদি এক শতাংশের বেশি হয়, তাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে গণ্য করা হয়। আমাদের দেশে যে পরিমাণ মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন, সেই হিসেবে মৃত্যুর হার কম। ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে এ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। জ্বর হলে দ্রুত চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে এবং ডেঙ্গুর পরীক্ষা করিয়ে তা নিশ্চিত হতে হবে। অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতেই চিকিত্সা সম্ভব, তবে প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

ডেঙ্গু জ্বর কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়: ডেঙ্গুর কোনো ভ্যাকসিন নেই। যেহেতু ডেঙ্গু ভাইরাস চার টাইপের, তাই এই চারটি ভাইরাসের প্রতিরোধে কাজ করে, এমন ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূলমন্ত্রই হলো—অ্যাডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে, অ্যাডিস একটি ভদ্র মশা, অভিজাত এলাকায় বড়ো বড়ো সুন্দর সুন্দর দালান েকোঠায় এরা বাস করে। স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এই মশা ডিম পাড়ে। ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি এদের পছন্দসই নয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে অ্যাডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একইসঙ্গে মশক নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এই রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো—ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং অ্যাডিস মশা প্রতিরোধ।

ব্যক্তিগত সতর্কতা: ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সতর্কতার গুরুত্ব অপরিসীম। মনে রাখতে হবে:

* অ্যাডিস মশা মূলত দিনের বেলা, সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়, তবে রাত্রে উজ্জ্বল আলোতেও কামড়াতে পারে।

* দিনের বেলা যথাসম্ভব শরীর ভালোভাবে কাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে, প্রয়োজনে মোজা ব্যবহার করা উচিত। মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার করতে হবে। দরজা-জানালায় নেট লাগাতে হবে।

* প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট, স্প্রে, লোশন বা ক্রিম, কয়েল, ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে।

* বাচ্চাদের হাফপ্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা পরাতে হবে।

বসতবাড়ির মশা নিধন: যেহেতু অ্যাডিস মশা মূলত এমন বস্তুর মধ্যে ডিম পাড়ে যেখানে স্বচ্ছ পানি জমে থাকে, তাই ফুলদানি, অব্যবহূত কৌটা, বাড়িঘরে এবং আশপাশে যে কোনো পাত্র বা জায়গায় জমে থাকা পানি তিন থেকে পাঁচ দিন পরপর ফেলে দিলে অ্যাডিস মশার লার্ভা মারা যায়। পাত্রের গায়ে লেগে থাকা মশার ডিম অপসারণে পাত্রটি ঘষে পরিষ্কার করলে ভালো । ঘরের বাথরুমে কোথাও জমানো পানি পাঁচ দিনের বেশি যেন না থাকে। একুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচে এবং মুখ খোলা পানির ট্যাংকে যেন পানি জমে না থাকে সে ব্যবস্থা করতে হবে। বাড়ির ছাদে অনেককে বাগান করতে দেখা যায়, সেখানে টবে বা পাত্রে যেন জমা পানি পাঁচ দিনের বেশি না থাকে, সেদিকেও যত্নবান হতে হবে। বাড়ির আশপাশের েঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

বসতবাড়ির বাইরে মশার বংশ বিস্তার রোধ: এই কাজগুলোর দায়িত্ব বর্তায় প্রশাসনে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের।

* ঘরের বাইরে মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হওয়ার ফলে পানি জমতে পারে। যেমন: ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, টিনের কৌটা, ডাবের খোসা, কন্টেইনার, মটকা, ব্যাটারির শেল, পলিথিন/চিপসের প্যাকেট। এসব জায়গায় জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে।

* মশা নিধনের জন্য স্প্রে বা ফগিং করতে হবে।

* বিভিন্ন রাস্তার আইল্যান্ডে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ফুলের টব, গাছপালা, জলাধার ইত্যাদি দেখা যায়। এখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে। সেগুলোতেও যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, ডেঙ্গু জ্বর হয়তোবা নির্মূল করা যাবে না, এর কোনো ভ্যাকসিন কিংবা কার্যকরী ঔষধও আবিষ্কৃত হয়নি। ডেঙ্গু জ্বরের মশাটি আমাদের দেশে আগেও ছিল, এখনো আছে, মশা প্রজননের এবং বংশবৃদ্ধির পরিবেশও আছে। তাই ডেঙ্গু জ্বর ভবিষ্যতেও থাকবে। একমাত্র সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই এর হাত থেকে মুক্তি সম্ভব।

লেখক :সাবেক ডিন ও চেয়ারম্যান, মেডিসিন অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

ইত্তেফাক/ইউবি

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৯ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন