দৈনিক মৃত্যু দুইশ’র নিচে নামছেই না

সংক্রমণ এভাবে বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়: বলছেন বিশেষজ্ঞরা
দৈনিক মৃত্যু দুইশ’র নিচে নামছেই না
গ্রাফিক্স: ইত্তেফাক

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে লকডাউন শিথিল করে পশুর হাটগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ করোনা রুখতে মাস্ক পরতে হবে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, ক্রেতা-বিক্রেতাসহ সবাইকে স্বাস্থ্যসচেতন থেকে সরকারি বিধি মানতে হবে। এমন শর্ত পালনের অঙ্গীকারে পশুর হাট চালু হলেও বাস্তবে শর্ত বা বিধিবিধানের কথা সবাই ভুলে গেছেন। পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানছে না কেউই।

এছাড়া ঈদ সামনে রেখে গ্রামমুখী মানুষের ঢল নেমেছে। সেখানেও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। তারা গ্রামে গিয়ে মানুষকে সংক্রমিত করবেন। আবার ঢাকায় ফিরে এসে রাজধানীতে সংক্রমণ বৃদ্ধি করবেন। এমনিতেই দেশে করোনা ভাইরাসে দৈনিক মৃত্যু দুইশর নিচে নামছেই না। মাত্র ৯ দিনে ১ লাখ মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। তার ওপর স্বাস্থ্যবিধি না মানার এই প্রবণতায় করোনা সংক্রমণ আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, এখনই করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক-নার্সদের। তার ওপর এর চেয়ে বেশি সংক্রমিত হলে করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সক্ষমতার বাইরে গেলে আমাদের কিছুই করার থাকবে না। তাই সবারই মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। সবার সচেতন হতে হবে। জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর জন্য সচেতন করে তুলতে সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

এদিকে করোনা রোগী বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রবিবার এক জুম মিটিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সারা দেশের ৪৬০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। জুম মিটিংয়ে সরকারি হাসপাতালের পরিচালকরাসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।

গত সাত দিনের মধ্যে এক দিন ছাড়া বাকি ছয় দিনই দৈনিক মৃত্যু দুইশর বেশিই ছিল। গত এক দিনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ২২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে গত শনিবার ২০৪ জন, শুক্রবার ১৮৭ জন, বৃহস্পতিবার ২২৬ জন, বুধবার ২১০ জন, মঙ্গলবার ২০৩ জন এবং সোমবার ২২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত এক সপ্তাহে ১ হাজার ৪৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৮২ হাজার ৮০০ জনের। এরমধ্যে গতকাল রবিবার ১১ হাজার ৫৭৮ জন শনাক্ত হয়েছেন। গত শনিবার ৮ হাজার ৪৮৯ জন, শুক্রবার ১২ হাজার ১৪৮ জন, বৃহস্পতিবার ১২ হাজার ২৩৬ জন, বুধবার ১২ হাজার ৩৮৩ জন, মঙ্গলবার ১২ হাজার ১৯৮ জন এবং গত সোমবার ১৩ হাজার ৭৬৮ জনের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এ পর্যন্ত মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৩ হাজার ৯৮৯ জন। গতকাল পর্যন্ত মোট ১৭ হাজার ৮৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ঈদ সামনে রেখে মানুষ এখন গ্রামে গিয়ে মানুষকে সংক্রমিত করছে। ঈদের পর তারা ঢাকায় এসে রাজধানীর মানুষকে সংক্রমিত করবে। তখন পরিস্থিতি কী হবে বলা যাচ্ছে না। বর্তমানে করোনার যে অবস্থা তাতে ডাক্তাররা চিকিত্সাসেবা চালিয়ে যেতে পারছেন। রোগী বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে সামনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আমেরিকা, ব্রিটেন, ইতালিসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও চিকিৎসাসেবা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। সামনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ঐ সব দেশের মতো হতে পারে, যদি আমরা স্বাস্থ্যবিধি না মানি। কিন্তু সেই সব দেশ দ্রুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে এবং ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। বাঁচতে হলে মাস্ক পরতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এ ব্যাপারে জনসাধারণের সচেতন হতেই হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, দুই মাস আগে থেকেই করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো হয়েছে, অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে। সংক্রমণ বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে অনেক উন্নত দেশের চিকিত্সাসেবাও ভেঙে পড়েছিল। সেই অবস্থায় যাতে আমাদের যেতে না হয়, সেজন্য মানুষকে সচেতন করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানাতে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে কোনো উপায় থাকবে না।

দেশে করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়ালো

সোসাইটি অব মেডিসিনের সাধারণ সম্পাদক ও মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, কোরবানির গরুর হাটে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। প্রশাসন উপস্থিত থেকেও কিছুই করতে পারছে না। ঈদের পর সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে পারে। চিকিত্সাব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে যদি আমরা সচেতন না হই। সবারই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ড. আনোয়ার খান বলেন, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলো করোনা রোগীদের সামাল দিতে পারছে না। প্রচণ্ড রোগীর চাপের কারণে সাধারণ শয্যায়ও করোনা রোগীদের রেখে চিকিত্সাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এখন যে অবস্থা আছে তাতেই করোনা রোগীদের চিকিত্সাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সামনে করোনা রোগী বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। করোনা নিয়ন্ত্রণে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। গত এক দিনে কেবল ঢাকা বিভাগেই ৪ হাজার ৮৫৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা দিনের মোট শনাক্তের ৪১ শতাংশের বেশি।

ইত্তেফাক/এসজেড

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x