করোনা পরবর্তী বিশ্ব

কমবে পারস্পরিক সহযোগিতা

কমবে পারস্পরিক সহযোগিতা
প্রতীকী ছবি

করোনা মহামারি থেকে দরিদ্র দেশগুলোকে বুঝিয়ে দিয়েছে বিপদের সময় নির্ভর করার মতো কোনো দেশ পাশে থাকে না। মহামারি এর আগেও এসেছে কিন্তু এবারের পরিস্থিতিটি ছিল ভিন্ন রকম। উন্নত থেকে অনুন্নত কোনো দেশই এ থেকে রেহাই পায়নি।

বিশ্বে এটাই প্রথম মহামারি নয়। ম্যালেরিয়া, সার্স, সোয়াইন ফ্লু, প্লেগ, ইবোলা ভাইরাস বা জিকা ভাইরাসের মতো মহামারি আগেও সময় সময় হানা দিয়েছে। তবে সেগুলো মূলত অঞ্চলবিশেষে সীমাবদ্ধ ছিল। মহামারি কবলিত বেশির ভাগ দেশ ছিল দরিদ্র ও অনুন্নত। কিন্তু করোনা ছিল পুরাদস্তুর বৈশ্বিক সংকট। অধিকাংশ দেশ ভ্যাকসিন, ভেন্টিলেটর ও অক্সিজেন সরকারি ব্যবস্থাপনায় করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুষ্ঠু সমন্বয় দেখা যায়নি। এ সংকট মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোকে নেতৃত্বের ভূমিকায় দেখা যাবে আশা করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। বরং উলটো ঐ দেশগুলোকে চিকিৎসা উপকরণ মজুত করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এর ফলে শুধু সাধারণ মানুষ ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের হতাশাই বেড়েছে। জাতিসংঘ ও কোনো কোনো ইউরোপীয় দেশ বলেছে ভবিষ্যতের জন্য একটি আপত্কালীন বৈশ্বিক নীতিমালা তৈরি করা দরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে ধনী দেশগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ উপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কোভ্যাক্সের মতো কর্মসূচির প্রতিও এই দেশগুলোর সায় তেমন ছিল না। দরিদ্র দেশগুলো যেন কোভিড ভ্যাকসিন পেতে পারে সেই লক্ষ্যে কোভ্যাক্স বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে নেয় আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা। মহামারি-বিষয়ক বিভিন্ন সংস্থা এর সঙ্গে জড়িত আছে।

ধনী দেশগুলোর উদাসীনতার জন্যই আফ্রিকা ও অন্য অঞ্চলের স্বল্পোন্নত দেশগুলো নিজেদের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করে। সেদেশগুলো উন্নত বিশ্বের দিকে চেয়ে না থেকে নিজস্ব উদ্যোগে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে তত্পর হয়। আদ্দিস আবাবাভিত্তিক আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের পরিচালক জন এনকেঙ্গাসং বলেন, ‘আফ্রিকা ভ্যাকসিনের জন্য কোভ্যাক্সের অপেক্ষায় না থেকে নিজ উদ্যোগে ভ্যাকসিন সংগ্রহে মনোযোগী হয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন যখন দেখল কোভ্যাক্সের মাধ্যমে ভ্যাকসিন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই তখন তারা গঠন করল আফ্রিকান ভ্যাকসিন অ্যাকুইজেশন টাস্ক টিম। এই টিম জনসন অ্যান্ড জনসনের সঙ্গে ৪ কোটি ডোজের একটি চুক্তি করে। উল্লেখ্য কোভ্যাক্স অক্সফোর্ড/অ্যাস্ট্রাজেনেকার কাছ থেকে ভ্যাকসিন পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু সময়মতো সেটি পাওয়া যায়নি। নাইজেরিয়ার ন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য কন্ট্রোল অব এইডসের সাবেক পরিচালক সানি আলিউ বলেন, ‘আফ্রিকান ইউনিয়ন যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটি সম্ভবত কোভ্যাক্সের ব্যবস্থাপনার চেয়ে ভালো’। তিনি বর্তমানে দেশটির করোনা ভাইরাস টাস্কফোর্সের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন।

আফ্রিকানরা নিজ উদ্যোগে ভ্যাকসিন সংগ্রহের উদ্যোগ নিলেও এর কিছু সমস্যা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কারণ মহাদেশটির যে বিশাল পরিমাণ চাহিদা রয়েছে সেটি সময়মতো যোগান দেওয়া সহজ নয়। তাই বাইরের উেসর ওপর নির্ভর করতে হবে। ভারত কোভ্যাক্সের জন্য অক্সফোর্ড/ অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া থেকে এই সংকটের শুরু। অনেক দেশ তখন বিনা মূল্যে ভ্যাকসিন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। বাইরের ভ্যাকসিনের ওপর মহাদেশটির নির্ভরশীলতা দীর্ঘদিনের। করোনার সময় আফ্রিকার কিছু কিছু দেশ যেমন এ ব্যাপারে নতুন এমআরএনএ ভ্যাকসিন উত্পাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এটি যক্ষ্মা বা এইডস চিকিত্সার নতুন দিগন্তের সন্ধান দিতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আফ্রিজেনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পেট্রো টারব্লানশ বলেন, ‘করোনা ভাইরাস সম্ভবত সব সময়ের জন্য একটি বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে থাকবে না। তাই আফ্রিকার দেশগুলোর উচিত ভ্যাকসিনের জন্য বাইরের নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করা। তিনি মনে করেন, পশ্চিমাদের ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের’ বিরুদ্ধে আফ্রিকার ‘ভ্যাকসিন নিরাপত্তা’ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকা ফার্স্ট নীতি অনুসরণ করে। বৈশ্বিক ইস্যু থেকে দূরত্ব অবলম্বন করে দেশটি। ট্রাম্পের সময়ই করোনার সূচনা ঘটে। আশা করা হয়েছিল ইউরোপের দেশগুলো স্বাস্থ্য ইস্যুতে কার্যকর নেতৃত্ব দেবে। বিশেষ করে আফ্রিকা যেহেতু তাদের সাবেক উপনিবেশ ছিল তাই ঐ মহাদেশটির দিকে বিশেষভাবে নজর দেবে কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ফ্রান্স ও জার্মানির মতো ধনী দেশগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে আরো শক্তিশালী করার ওপর জোর দেয়। এ বছর এপ্রিলে আফ্রিকান ইউনিয়ন ও সিডিসি একটি যৌথ উদ্যোগ নেয়। যার উদ্দেশ্য ২০৪০ সালের মধ্যে মহাদেশের ভ্যাকসিন চাহিদার ৬০ শতাংশ নিজেরা উত্পাদন করা। উসান্ডার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং দেশটির টিকাদান কর্মসূচিবিষয়ক জাতীয় কমিটির উপদেষ্টা পিটার ওয়াইসওয়া বলেন, ‘কোভিড পশ্চিমের আসল চেহারা দেখিয়ে দিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো সম্পর্কে এতদিন যা শুনে এসেছি আমরা যে তারা গণতান্ত্রিক এবং সাম্যের মন্ত্রে উজ্জীবিত, তা বাস্তবসম্মত ধারণা নয়।’

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x