ঢাকা রবিবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১৩ মাঘ ১৪২৭
১৩ °সে

আইনজীবীদের বিক্ষোভে অচল প্রধান বিচারপতির এজলাস

দুই পক্ষের হট্টগোলে সকালে এক দফা এজলাস ছাড়েন ছয় বিচারপতি ** আদালতে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান তুলে খালেদা জিয়ার জামিনের দাবিতে অনঢ় বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা ** প্রধান বিচারপতি বললেন, এ ঘটনা নজিরবিহীন, বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে
আইনজীবীদের বিক্ষোভে অচল প্রধান বিচারপতির এজলাস
সুপ্রিম কোর্টে হট্টগোল। ছবি: সংগৃহীত

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির এজলাসে বিক্ষোভ ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার দফায় দফায় এ হট্টগোল ও বিক্ষোভে বন্ধ হয়ে যায় বিচারকাজ। এক পর্যায়ে এজলাস ছেড়ে চলে যান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনসহ আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতি।

বিরতির পর আবার সাড়ে ১১ টায় এজলাসে আসেন বিচারপতিরা। আসন গ্রহণের পর বিএনপির আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আদালতে আজ যা হলো তা নজিরবিহীন। আপনারা আমাদের উপর কি চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন? বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে।’ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন শুনানির দিন ধার্যকে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতির এজলাসে এই বিক্ষোভ ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটে।

বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে বিএনপিপন্থী শতাধিক জুনিয়র আইনজীবী খালেদা জিয়ার জামিনের দাবিতে প্রধান বিচারপতির এজলাসে শ্লোগান দেন। তারা বলেন, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘জামিন চাই, দিতে হবে।’ সাড়ে ১১ টা থেকে বেলা সোয়া একটা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে এই শ্লোগান দেন আইনজীবীরা। অনেকে একযোগে টেবিল চাপড়াতে থাকেন। ফলে জনাকীর্ণ আদালত কক্ষে এক নজিরবিহীন অবস্থার সৃষ্টি হয়। এরকম হট্টগোল পরিস্থিতির মধ্যে অন্য মামলার শুনানি গ্রহণের চেষ্টা করেন প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিগণ। কিন্তু শ্লোগানের কারণে মামলার শুনানি ও বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া বিচারপতিদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফলে ব্যাহত হয় বিচারকাজ। এসময় এজলাসে অবস্থান করা বিচারপতিরা ছিলেন অনেকটাই অসহায়। পরে আদালতের সময় শেষ হলে এজলাস ত্যাগ করেন বিচারপতিরা। থেমে যায় শ্লোগান। সিনিয়র ও জুনিয়র আইনজীবীরা বেরিয়ে আসেন আদালত কক্ষ থেকে। পরে সরকার ও বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা পালটাপালটি সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘটনার জন্য এক পক্ষ অপর পক্ষকে দায়ী করেন।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আজ আদালতে যা ঘটেছে তার সকল দায় অ্যাটর্নি জেনারেলের। আমরা সিনিয়র আইনজীবীরা আদালতে না থাকলে হয়তো পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত।’ অপরদিকে বিএনপির আইনজীবীদের আচরণকে ন্যাক্কারজনক ও ফ্যাসিবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘ওই আইনজীবীরা শ্লোগান ও হট্টগোল করে আদালতের বিচারকাজে বাধাসৃষ্টি করেছেন। বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীরা কোর্টে ছিলেন কিন্তু জুনিয়র আইনজীবীদের থামানোর কোন চেষ্টা করেননি।’ এদিকে খোদ আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘আদালতে হট্টগোল সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রসঙ্গত, দুদকের দায়ের করা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আপিল বিভাগে জামিন চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া। গত ২৮ নভেম্বর ওই জামিন আবেদনের উপর শুনানি হয়। তখন আপিল বিভাগ মেডিকেল বোর্ড গঠন করে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন দিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ভিসিকে নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে ৫ ডিসেম্বর জামিন শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকার সাত নম্বর ক্রমিকে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনটি শুনানির জন্য ছিলো।

যেভাবে হট্টগোল, বিক্ষোভ

সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে বলেন, খালেদা জিয়ার মেডিকেল রিপোর্ট আসেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুই সপ্তাহ সময় চেয়েছেন। জবাবে খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, নতুন মেডিকেল রিপোর্ট আসেনি ঠিক আছে, আগের রিপোর্ট তো রয়েছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, এ রিপোর্ট তো আমাদের কাছে নেই। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আগের যে রিপোর্টের কথা বলা হচ্ছে সেটা তো অফিসিয়ালি আসেনি। ওই রিপোর্টের কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। জয়নুল আবেদীন বলেন, খালেদা জিয়া যখন মৃত্যুর মুখে তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অক্টোবর মাসে যে বোর্ড গঠন করে সেই রিপোর্ট এটি। তিনি বলেন, আমরা মানবিক কারণে জামিন চাই। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা রিপোর্ট চেয়েছি, সেটা আসুক। আগামী বৃহস্পতিবার শুনব।

জয়নুল আবেদীন বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। বৃহস্পতিবার নয়, রবি/সোমবার শুনানির দিন এগিয়ে আনুন। প্রধান বিচারপতি বলেন, বুধবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোন ধরনের বিলম্ব ছাড়াই রিপোর্ট দাখিল করবে সেটা আদেশে বলে দিয়েছি। জয়নুল আবেদীন বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়া কারাগারে রাজার হালে আছেন। তখন বিএনপিপন্থী শতাধিক আইনজীবী বলেন ‘শেইম’ ‘শেইম’। এই বক্তব্যের পাল্টা প্রতিবাদ জানান সরকার সমর্থক আইনজীবীরা। এ সময় আদালত কক্ষে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। দুপক্ষের আইনজীবীরা একে অপরের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে তো আমরা বিচার কাজ চালাতে পারব না।’ এক পর্যায়ে বিচারপতিদের নিয়ে কটূক্তি করেন বিএনপির আইনজীবীরা। এ অবস্থায় সকাল ৯ টা ৫৫ মিনিটে এজলাস ছেড়ে যান প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিরা। আদালত কক্ষে অবস্থান নেন বিএনপির আইনজীবীরা। তারা দফায় দফায় শ্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীরা বাইরে যেতে চাইলে জুনিয়ররা তাদেরকে যেতে দেননি।

তবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি এএম আমিনউদ্দিন, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বে শতাধিক আইনজীবী আদালত থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর বেলা ১১টার দিকে আইনজীবী সমিতি ভবনের উত্তর হলে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা।

ব্যাহত বিচারকাজ

বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের আদালত কক্ষে অবস্থান ও দফায় দফায় শ্লোগানের কারণে এজলাসে আসেননি বিচারপতিরা। ফলে সকাল ১০ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত এক ঘন্টা বন্ধ থাকে বিচারকাজ। সাধারণত নিয়মানুযায়ী বেলা ১১ টা থেকে সাড়ে ১১ টা পর্যন্ত আপিল বিভাগে বিরতি থাকে। এই বিরতি শেষে সাড়ে ১১ টায় এজলাসে আসেন ছয় বিচারপতি। এ সময় ডায়াসের সামনে যান জয়নুল আবেদীন। তখন প্রধান বিচারপতি বিএনপির এই আইনজীবীর উদ্দেশ্যে বলেন, কোর্টে আজ যা হয়েছে তা কোনদিন হয়নি। আপনারা কি আদালতকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন?

জয়নুল আবেদীন বলেন, প্রধানমন্ত্রী গতকাল খালেদা জিয়াকে নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। বিচারাধীন মামলা নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য অনুচিত। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা অন্য মামলা শুনব। তখন বিএনপির আইনজীবীরা প্রতিবাদ জানান। এরপরই প্রধান বিচারপতি অন্য মামলার শুনানির নির্দেশ দেন। পরে ডেসটিনির আইনজীবী ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি তার মামলার নথি থেকে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা শুরু করেন। এসময় বিএনপির আইনজীবীরা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ শ্লোগান দিতে থাকেন। এতে ওই মামলার শুনানি গ্রহণ ব্যাহত হয়। এক পর্যায়ে শুনানি না করে ডায়াসে দাঁড়িয়ে থাকেন আজমালুল হোসেন। পরে আদালতের সময় শেষ হলে বেলা সোয়া একটার দিকে এজলাস ছেড়ে যান বিচারপতিরা।

আদালতের বাইরেও বিক্ষোভ :

বেলা সোয়া একটায় আদালত থেকে সরকার ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা বেরিয়ে আসেন। সমিতি ভবন প্রাঙ্গনে বিক্ষোভ করেন সরকার সমর্থক আইনজীবীরা। তারা বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের কর্মকান্ডের প্রতিবাদে শ্লোগান দেন। এর আগে সমিতি ভবন প্রাঙ্গনে বিএনপির আইনজীবীরাও খালেদা জিয়ার জামিনের দাবিতে শ্লোগান দেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচ

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৬ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন