সিনহা হত্যা মামলার সাত আসামিকে কারাগারে প্রেরণ

সিনহা হত্যা মামলার সাত আসামিকে কারাগারে প্রেরণ
কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

পুলিশের গুলিতে নিহত সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় নয় আসামির মধ্যে সাত আসামীর জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার বাকি দুই আসামি পলাতক রয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ( ৬ আগস্ট) কক্সবাজারের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের আদালত এই আদেশ দেন।

এর আগে বিকেলে আসামিদের কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। এরপর আসামিদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়। তবে কোনো রিমান্ডের আবেদন করা হয়নি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক আসামিদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কারাগারে পাঠানো আসামিরা হলেন টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ, টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের প্রত্যাহার হওয়া পরিদর্শক লিয়াকত আলী, উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিত, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, পুলিশ কনস্টেবল সাফানুর রহমান, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন।

আসামি এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা আত্মসমর্পণ করেননি বলে নিশ্চিত করেছেন আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ফরিদুল আলম। তিনি আরো বলেন, ‘মামলার নয় আসামির সাত আসামি আত্মসমর্পণ করেন। এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মোস্তফা আত্মসমর্পণ করেননি। আদালত মামলার গুণাগুন পরীক্ষা করে এবং জামিনঅযোগ্য ধারা হওয়ার কারণে তাদেরকে জেল-হাজতে প্রেরণ করেছেন।’

তবে যেসব আসামিরা আত্মসমর্পণ করেছেন তারা জামিনের আবেদন করেছেন বলেও জানান পিপি।

টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে আজ চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে বিকেল ৫টার দিকে কক্সবাজারে নেওয়া হয়। আর লিয়াকতসহ অপর ছয় আসামিকে সোয়া ৪টার দিকে আদালতের হাজতখানায় এনে রাখা হয়। বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে সব আসামিকে কক্সবাজার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাসে তোলা হয়। পরে শুনানি শুরু হয়।

গত ৩১ জুলাই ঈদুল আজহার আগের রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। তদন্তের স্বার্থে গত রোববার টেকনাফের বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকত আলীসহ সবাইকে প্রত্যাহার করা হয়। আর হত্যা মামলা হওয়ার পর গতকাল বুধবার ওসি প্রদীপকে প্রত্যাহার করা হয়।

গতকাল দুপুরেই মেজর (অব.) সিনহা হত্যার বিচার চেয়ে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। মামলাটির শুনানিতে সন্তুষ্ট হয়ে তা ‘ট্রিট ফর এফআইআর ’ হিসেবে আমলে নিতে টেকনাফ থানাকে আদেশ দেন আদালতের বিচারক তামান্না ফারাহ। একইভাবে মামলাটি কক্সবাজার র্যা ব-১৫-কে তদন্তের দায়িত্ব দিয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মামলা অগ্রগতির প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফ থানায় মামলাটি (নম্বর সিআর : ৯৪/২০২০ইং/টেকনাফ) তালিকাভুক্ত করা হয়। দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ জামিন অযোগ্য ধারায় মামলাটি তালিকাভুক্ত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মঙ্গলবার সকালে সিনহা রাশেদের মা নাসিমা আক্তারকে ফোন করে সমবেদনা ও সান্ত্বনা জানিয়েছেন। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তেরও আশ্বাস দিয়েছেন।

গতকাল দুপুরে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ কক্সবাজারে যান। তাঁরা কক্সবাজার সৈকতে অবস্থিত সেনাবাহিনীর রেস্টহাউস জলতরঙ্গতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। পরে সেখানে তাঁরা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁরা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদের নিহত হওয়াকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁরা বলেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে দূরত্ব নেই। আর এ ঘটনায় দুই বাহিনীর মধ্যে চিড় ধরবে না।

সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, ‘সিনহার মৃত্যু নিয়ে বাংলাদেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ যে ঘটনাটি ঘটেছে, তাতে কোনো প্রতিষ্ঠান দায়ী হতে পারে না। তদন্ত কমিটি যাদের দোষী সাব্যস্ত করবে, অবশ্যই তাদের প্রায়শ্চিত্ত পেতে হবে। এ জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের সহযোগিতা করবে না।’

অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘টেকনাফে যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটির কারণে দুই বাহিনীর মধ্যে সম্পর্কের কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। বরং আমাদের লক্ষ্য হবে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত যৌথ তদন্ত কমিটি হয়েছে, তারা প্রভাবমুক্ত পরিবেশে তদন্ত করবে। তারা তদন্ত করে যে প্রতিবেদন দেবে, সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনি কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং সেটাই গ্রহণ করা হবে।’

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত