সাইবার মামলায় আপস-মীমাংসা বেশি, সাজা কম

আট বছরে ৩৫ মামলায় সাজা, ৮৯ মামলায় খালাস, মামলা চালাতে চান না অনেক অভিভাবক: পিপি, ২৬৪২ মামলার মধ্যে ২০২১টি এখনো বিচারাধীন
সাইবার মামলায় আপস-মীমাংসা বেশি, সাজা কম
প্রতীকী ছবি

প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে প্রযুক্তিগত অপরাধও। সাইবার অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার সংখ্যাও দিনে দিনে বাড়ছে। তবে নিষ্পত্তির সংখ্যা খুব একটা বাড়ছে না। অধিকাংশ মামলা চলার সময়ই আপস-মীমাংসায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সাজার সংখ্যা কম। ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ অভিভাবক শেষ পর্যন্ত মামলা চালাতে চান না, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে আদালতে এসে মামলা শেষ করার আবেদন করেন। আবার তদন্তেও অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রায় আট বছরে নিষ্পত্তি হয়েছে ১২৪টি মামলা। এর মধ্যে ৮৯ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। আর সাজা হয়েছে ৩৫ মামলায়।

সাইবার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম শামীম ইত্তেফাককে বলেন, ‘সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা চলাকালে অনেক অভিভাবক এসে বলেন, আমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, সে সুখে-শান্তিতে আছে। আমরা আর মামলা চালাতে চাই না। এমনকি অনেকে উপজেলা চেয়ারম্যান বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। তারাও সাক্ষ্য দেন যে এই মামলা চালালে মেয়ের ক্ষতি হতে পারে, তার সংসারে অশান্তি তৈরি হতে পারে, তাই তারা মামলা প্রত্যাহার করে নিতে চান। ফলে অনেক মামলাই প্রত্যাহার হয়।’

শুধু বিচারের প্রক্রিয়া নয়, সাইবার মামলার তদন্তেও অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের উপ-কমিশনার আ ফ ম আল কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, ‘অনেক সময় তদন্তে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ভিকটিম দেরিতে রিপোর্ট করেন। তিনি হয়তো একটা স্কিন শট রেখে দেন। এখন যে ডিভাইস দিয়ে অপরাধ হয়েছে, অপরাধী যদি ঐ ডিভাইসটা বদলে ফেলেন, তাহলে কিন্তু সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণ করা যায় না। দেরিতে আসার কারণে অনেক আলামত নষ্ট হয়ে যায়। আবার অপরাধী দাবি করে বসেন, স্কিন শটটি বানানো। তিনি হয়তো পোস্টটা ডিলিট করে দিয়েছেন। ফলে এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই, যেটা দিয়ে প্রমাণিত হয় যে অভিযুক্ত ব্যক্তি আসলেই অপরাধটি করেছেন।’

সাইবার অপরাধ ট্রাইব্যুনালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ১২৪টি মামলার রায় ঘোষণা করেছে সাইবার ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ৩৫টি মামলায় আসামির সাজা হয়েছে। আর অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ৮৯টি মামলায় আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়েছেন। এর বাইরে অভিযোগ গঠনের শুনানির দিনেই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন ২০০টিরও বেশি মামলার আসামিরা।

জানা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন থানা থেকে বিচারের জন্য সাইবার ট্রাইব্যুনালে মোট মামলা এসেছে ২ হাজার ৬৪২টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে ২৫৬টি, ২০১৯ সালে ৭২১টি, ২০১৮ সালে ৬৭৬টি, ২০১৭ সালে ৫৬৮টি, ২০১৬ সালে ২৩৩টি, ২০১৫ সালে ১৫২টি, ২০১৪ সালে ৩৩টি এবং ২০১৩ সালে এসেছে ৩টি মামলা। এছাড়া সরাসরি ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা হয়েছে ১ হাজার ৮২টি মামলা। দেখা গেছে, এই ১ হাজার ৮২টি মামলার মধ্যে ৪৪৭টি মামলায় বিভিন্ন সংস্থাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। বাকি ৬৩৫টি মামলায় প্রয়োজনীয় উপাদান না থাকায় আদালত খারিজ করে দেয়। এই ৪৪৭টি মামলার মধ্যে ১৫০টির তদন্ত প্রতিবেদন ইতিমধ্যে আদালতে জমা হয়েছে। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে সব মিলিয়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২ হাজার ২১টি।

পাবলিক প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম শামীম বলেন, ‘এই ট্রাইব্যুনালে সাজার হার কিন্তু প্রায় ২৩ শতাংশের মতো। অন্য কোর্টগুলোর চেয়ে এখানে সাজার হার একেবারে কম নয়। আসলে সমস্যা হয়েছে মামলা দায়েরের পর বাদী ও আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে সঠিকভাবে সাক্ষ্য উপস্থাপন না করা, তদন্ত কর্মকর্তা মামলার অভিযোগপত্রে আইটি রিপোর্ট দাখিল না করা এবং তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও মামলার তথ্যগত কাগজপত্র সঠিকভাবে পর্যালোচনা না করে আদালতে রিপোর্ট প্রদান করায় আসামিরা খালাস পেয়ে যান।’

উপ-কমিশনার আ ফ ম আল কিবরিয়া বলেন, ‘ভার্চুয়াল বিষয়ের মামলাগুলোতে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই চ্যালেঞ্জ অনেক। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই মামলাগুলোর তদন্ত করতে হয়। এখানে প্রমাণও কিন্তু ভার্চুয়াল। আবার ভার্চুয়ালি সে মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে অপরাধ হচ্ছে ঐ মাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রণও কিন্তু আমাদের হাতে নেই। ফলে তদন্তে আমাদের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তার পরও আমরা যে মামলাগুলোর তদন্ত করে রিপোর্ট দিই, সেগুলোতে কিন্তু অপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত