অর্থ পাচারের দুই মামলায় জামিন আবেদন খারিজ

কারাগারেই থাকতে হবে ডেসটিনির রফিকুল আমীনকে

কারাগারেই থাকতে হবে ডেসটিনির রফিকুল আমীনকে
সুপ্রিম কোর্ট ও ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীন।

কারাগারেই থাকতে হচ্ছে ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীনকে। সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা পাচারের দুটি মামলায় অসুস্থতার যুক্তিতে তার জামিন চেয়ে করা দুটি আবেদন খারিজ করে দিয়েছে আপিল বিভাগ। আজ প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

আদেশের পর রফিকুলের আইনজীবী সাইদ আহমেদ রাজা ডেসটিনির বর্তমানে কি পরিমাণ সম্পত্তি আছে তার মূল্য নিরুপণে অডিটের আবেদন জানান। প্রধান বিচারপতি বলেন, এখন আর অডিটের সুযোগ নাই।

৩৫ লাখ গাছ বিক্রি করে আড়াই হাজার কোটি টাকা প্রদানের শর্তে ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীনকে জামিনে মুক্তির আদেশ দিয়েছিলো আপিল বিভাগ। তার আইনজীবীদের এমন প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে এই আদেশ দিয়েছিলো আপিল বিভাগ। প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও ওই আদেশ প্রতিপালন করেনি রফিকুল আমীন। এখন অসুস্থতার গ্রাউন্ডে নতুন করে জামিন চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেন তিনি। ওই আবেদনের শুনানিকালে বৃহস্পতিবার ডেসটিনির আইনজীবীর উদ্দেশ্যে আপিল বিভাগ বলেছে, আপনার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগ। এই অর্থ কাদের? আমরা তো আপনাকে শর্তসাপেক্ষে জামিনের সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি সেটা গ্রহণ করেননি? আপনি তো প্রতিজ্ঞা করেছেন গ্রাহকের এক পয়সাও ফেরত দেবেন না। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ জামিন শুনানিকালে এ মন্তব্য করেন।

শুনানিতে রফিকুল আমীনের কৌসুলি অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু বলেন, ডেসটিনির ৫০ লাখ গ্রাহক আছে। এদের কেউ অর্থ তছরুপের অভিযোগ না করলেও দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তিনি আট বছর ধরে কারাগারে আছেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ। জামিন দরকার। মরে গেলে কার বিচার করবেন? তিনি বলেন, কারাগারে থেকে ৩৫ লাখ গাছ বিক্রি করে আড়াই হাজার কোটি টাকা কি ছয় সপ্তাহের মধ্যে দেওয়া সম্ভব? প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনার (ডেসটিনি) বক্তব্য গ্রহণ করেই আমরা ওই আদেশ দিয়েছিলাম।

বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, আপনি এখন পর্যন্ত একটি পয়সাও দেননি। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, জেলের বাইরে এসেও যদি অর্থ দিতে না পারেন তাহলে জামিন দিয়ে কি হবে? মতিন খসরু বলেন, আমি মরে গেলে কার বিচার করবেন?

জামিনের বিরোধিতা করে দুদক কৌসুলি খুরশীদ আলম খান বলেন, এই মামলায় ১৭২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। হাইকোর্ট মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বলেছে। উনারা অভিযোগ করেছেন আট বছর ধরে রফিকুল আমিন জেলে আছেন, কিন্তু এই আট বছরের মধ্যে ছয় বছরই হাসপাতালে কাটিয়েছেন। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা অর্থ পাচারের মামলা হয়েছে। ডেসটিনির গ্রাহকরা কেন মামলা করবেন? উনি একজন কানাডিয়ান নাগরিক। জামিন পেলে পালিয়ে যেতে পারেন।

দুদক কৌসুলি বলেন, রফিকুল আমিনের আইনজীবীদের প্রস্তাবের ভিত্তিতেই আপিল বিভাগ শর্তাধীনে জামিনের আদেশ দিয়েছিলো। এটা সর্বোচ্চ আদালতের চাপানো কোন আদেশ নয়। একশত কোটি টাকা জমা দিয়েও যদি আপনাদের কাছে (আপিল বিভাগ) এসে বলত আর অর্থ দিতে পারছি না সেটাও হত। কিন্তু কোন অর্থ জমা না দিয়েই এখন নতুন করে জামিনের আবেদন নিয়ে আসছেন।

এ পর্যায়ে দুদক কৌসুলির উদ্দেশ্যে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, রফিকুল আমীন কি বিচারের সময় নিম্ন আদালতে হাজির হচ্ছেন না? দুদক কৌসুলি বলেন, উনি ৪/৫ বার হাজির হননি। যখন সাক্ষীর দিন ধার্য থাকে তখন আবেদন নিয়ে আসেন এবং কারা কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদন দিয়ে বলে অসুস্থ থাকায় তাকে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না।

জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুরাদ রেজা বলেন, গাছেরই তো অস্তিত্ব নাই। আর এই গাছ কি রফিকুল আমীনের? ডেসটিনি অপরাধ করেছে। আর ডেসটিনির এমডি হিসেবে সেই অপরাধের দায় উনার। এ কারণে সে জেলে আছে। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ না মেনে নতুন জামিনের আবেদন নিয়ে আসলেন কিভাবে? ওই সময় আাপিল বিভাগ ভারতের সাহারা গ্রুপের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছিলো। প্রয়োজনে কারাগারে ভেতরে বৈঠকের ব্যবস্থার কথা এই আদালত বলেছিলো। কিন্তু উনারা আপিল বিভাগের আদেশ লংঘন করেছেন।

মতিন খসরু বলেন, অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে জামিন চেয়েছি। এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের মেডিকেল সার্টিফিকেট রয়েছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি তো দেশের সবচেয়ে ভালো হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা পাচ্ছেন। মতিন খসরু বলেন, প্রিজন সেলে থেকে চিকিৎসা পাওয়া কঠিন। মুরাদ রেজা বলেন, প্রিজন সেল নয়, কেবিনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রবিবার আদেশের জন্য দিন ধার্য করে দিয়েছেন।

সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা অর্থ পাচারের অভিযোগে ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীন, চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে দুদক। ওই মামলায় রফিকুল আমীনের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর শর্তাসাপেক্ষে জামিনে মুক্তির আদেশ দেয়। ওই আদেশে বলা হয়েছিলো, ছয় সপ্তাহের মধ্যে ৩৫ লাখ গাছ বিক্রি করে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা জমা দিতে হবে সরকারি কোষাগারে। ওই অর্থ জমা দেওয়ার কপি নিম্ন আদালতে দাখিল করলেই জামিন পাবেন ডেসটিনির দুই কর্ণধার রফিকুল আমিন ও মোহাম্মদ হোসেন। আদেশে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া এই টাকা ডেসটিনির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের মাঝে বিতরণ করার জন্য দুদক চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছিলো আপিল বিভাগ।

ইত্তেফাক/আরকেজি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত