ঋণের টাকা না দিয়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলেই জেল: হাইকোর্ট

পিপলস লিজিংয়ের ঋণ খেলাপিদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি
ঋণের টাকা না দিয়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলেই জেল: হাইকোর্ট
হাইকোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিংয়ের খেলাপি ঋণ আদায়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হাইকোর্ট। ঋণ খেলাপিদের উদ্দেশে হাইকোর্ট বলেছে, আপনারা একটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে গেছেন। এখান থেকে বের হওয়ার সুযোগ নাই। ঋণের টাকা না দিয়ে এখানে কোনো মন্ত্রী বা অন্য কারো প্রভাব খাটানোর কোন চেষ্টা করবেন না।

আদালত বলেন, পিপলস লিজিং পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। এখানে জনগণের টাকা গচ্ছিত ছিলো, কোন বাটপারদের নয়। জনগণের টাকা নিয়ে তা না দিয়ে এখনো ঘুমাচ্ছেন কেন। আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক বকেয়া কিস্তির সকল টাকা একসঙ্গে পরিশোধ করুন। এরপর পিপলস লিজিংয়ের বোর্ড বা কমিটির সঙ্গে বসে বাকি টাকা কিস্তি অনুযায়ী পরিশোধ করে দিন। যদি এর কোন ব্যত্যয় হয় তাহলে সোজা জেলে যেতে হবে।

পিপলস লিজিংয়ের ঋণ খেলাপিদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এই মন্তব্য করেন।

প্রসঙ্গত পিপলস লিজিং থেকে ঋণ নিয়েছেন প্রায় পাঁচশত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ২৮০ ব্যক্তি ঋণ খেলাপি হয়েছেন। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক খেলাপিদের ঐ নামের তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করে পিপলস লিজিং এন্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস লিমিটেড। ঐ তালিকা অনুযায়ী গত ১৯ জানুয়ারি ২৮০ ব্যক্তিকে তলব করে হাইকোর্ট।

তলব আদেশে প্রথম দফায় গত মঙ্গলবার ৫১ ঋণ খেলাপি হাইকোর্টে হাজির হন। গতকাল হাজির হয়েছিলেন আরও ৪৫ ঋণ খেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। যারা তলব আদেশে আদালতে হাজির হননি তাদের উদ্দেশ্যে হাইকোর্ট বলেছে, তাদেরকে হাজিরার জন্য আরেকটি দিন ধার্য করে দেওয়া হবে। যদি ঐ দিন হাজির না হয় তাহলে গ্রেফতার করে কোর্টে হাজির করা হবে। আদালত বলেন, আপনারা (ঋণ খেলাপি) টাকা নিয়েছেন। কিন্তু সময়মত পরিশোধ করেননি। যারা আমানতকারী তারা খেয়ে না খেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন।

শুনানির এক পর্যায়ে ঋণ খেলাপিদের আইনজীবীদের কেউ কেউ বলেন, ঋণের টাকা পরিশোধে সময় চান। কোন কোন ঋণগ্রহীতা মারা গেছেন এখন তার কি হবে সে ব্যাখ্যা চান। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, আগে বকেয়া কিস্তির টাকা একসঙ্গে জমা দিন। তারপর বাকি টাকার দেওয়ার বিষয়ে কথা বলুন।

আইনজীবীরা বলেন, যারা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন তাদের অনেকেই জানেন না ঋণের পরিমাণ কত। এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। আদালত বলেন, যেদিন থেকে কিস্তির টাকা দেওয়া বন্ধ করেছেন এবং এ পর্যন্ত যতগুলো কিস্তি বকেয়া হয়েছে সেগুলোর টাকা একসঙ্গে দেবেন। আইনের দৃষ্টিতে কোম্পানি এখনো জীবিত।

এক আইনজীবী আদালতকে বলেন, আদালত যে উদ্যোগ নিয়েছেন তাতে আমানতকারীরা আলোর মুখ দেখছেন। আদালতের বাইরে আলোচনা হচ্ছে এভাবে যদি আরও দু একটি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা যায় তাহলে বিনিয়োগকারীরা সাহস পাবে। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হবে।

তখন আদালত বলেন, এটাতো কোর্টের কাজ না। এর জন্য যাদের দায়িত্ব রয়েছে তারা কেন এটা করছেন না। আমাদের কাজ হলো প্রতিষ্ঠান ওয়েন্ডিং আপ (অবসায়ন) করা। এখন প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচাতে চাই বলে এসব করতে হচ্ছে। এরপরই হাইকোর্ট ৯ মার্চ এই মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য রেখেছেন। তলব আদেশে যারা হাজির হননি ঐ দিন তাদেরকে হাজির হতে বলা হয়েছে।

এ সময় পিপলস লিজিংয়ের সাময়িক অবসায়ক (প্রবেশনাল লিকুইডেটর) মো. আসাদুজ্জামান খানের পক্ষে আইনজীবী মেজবাহুর রহমান, ঋণগ্রহীতাদের পক্ষে শাহ মঞ্জুরুল হক, হারুন-অর রশিদ, বেলায়েত হোসেন প্রমুখ শুনানি করেন।

পিপলস লিজিং থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে পিকে হালদার ও তার সহযোগীরা। এরপর পিপলস লিজিং অবসায়নের জন্য হাইকোর্টে আবেদন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর আদালত স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান ও অবসায়ক নিয়োগ দেয়।

এরই ধারাবাহিকতায় আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক সর্বনিন্ম ৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ঋণ খেলাপিদের ছয়টি ক্যাটাগরির তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করে। ঐ তালিকায় দেখা যায়, খাত ভিত্তিক টার্ম ঋণে খেলাপির পরিমাণ ৮৯১ কোটি টাকা, মার্জিন ঋণে খেলাপি হয়েছে ৬৭২ কোটি টাকা, হোম ঋণে খেলাপির পরিমাণ ২৭ কোটি ৯৬ লাখ, অন্যান্য ঋণে খেলাপির পরিমাণ ৯২ কোটি টাকা। তালিকা পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট তলবের আদেশ দেয়।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x