দণ্ড প্রদানের নীতি প্রণয়ন জরুরি

যাবজ্জীবন সাজার পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ
দণ্ড প্রদানের নীতি প্রণয়ন জরুরি
সুপ্রিম কোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছে, সন্ত্রাস ও দুষ্কর্ম সমাজ বরদাশত করে না। শাস্তির বিধান ও মাত্রা সামাজিক হতে হবে। তবে মামলার বিষয়বস্তু ও পরিস্থিতি, অপরাধের মাত্রা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তীব্রতা, সমাজে শান্তিশৃঙ্খলায় এর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে আদালত আমৃত্যু কারাবাসের দণ্ড দিতে পারে। ‘আতাউর মৃধা বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রিভিউর পূর্ণাঙ্গ রায়ে যাবজ্জীবন দণ্ডের ব্যাপারে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে আপিল বিভাগের সাত জন বিচারপতিই সর্বসম্মতভাবে দণ্ড প্রদানের নীতি প্রণয়নের কথা বলেছেন।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে ৩০ বছরের জেল 

রায়ের পর্যবেক্ষণে আপিল বিভাগ বলেছে, সবচেয়ে নৃশংস অপরাধের ক্ষেত্রে এ ধরনের দণ্ড (আমৃত্যু কারাবাস) দেওয়া যেতে পারে, যেখানে অপরাধীর প্রতি নমনীয়তা দেখালে সমাজের প্রতি অবিচার হবে। কারণ আমৃত্যু কারাবাসের মতো কঠোর শাস্তি আর কিছুই হতে পারে না। এই শাস্তির লক্ষ্য সমাজকে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের শাস্তি একই রকম হবে। তবে অপরাধের মাত্রা, আসামির আচরণ ও ভুক্তভোগীর দুর্দশা সব আমলে নিয়েই শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।

সাভারে জামান নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে আসামি আতাউর মৃধা ও আনোয়ারের মৃত্যুদণ্ড হ্রাস করে ২০১৭ সালে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়। সেই সঙ্গে রায়ে বলা হয়, এই যাবজ্জীবন দণ্ড মানে আমৃত্যু কারাবাস। এই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ পিটিশন করেন আতাউর ও আনোয়ার। ঐ রিভিউর রায়ে বলা হয়েছে, যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। দণ্ডিত ব্যক্তি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(ক) ধারার সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ, বিচার চলাকালে আসামির হাজতবাস সাজার মেয়াদ থেকে বাদ যাবে। তবে কোনো মামলায় আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়ার এক্তিয়ার দেশের আদালত বা ট্রাইব্যুনালের রয়েছে।

হাইকোর্টের ৪১ বেঞ্চ বসবে আজ, চলবে নিম্ন আদালতের বিচার কাজ

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গত বছরের ডিসেম্বর মাসে এ রায় দেয়। বৃহস্পতিবার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ পায়। মূল রায়টি লিখেছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। মূল রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার, বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান, বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।

বিচারকের বিচারে ভুল!

তবে ছয় বিচারপতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আলাদা রায় লিখেছেন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. ইমান আলী। তিনি বলেছেন, যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর কারাবাস নয়। তবে এটাও ঠিক, আমৃত্যু কারাবাস প্রদান অর্থ এই নয় যে, দণ্ডিত ব্যক্তিকে কারাগারেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা যে রায়ের পক্ষে মত দিয়েছেন, সেটাই মূল রায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

দণ্ড প্রদানের নীতি দরকার

রায়ে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা করে থাকেন। কিন্তু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এ ধরনের কোনো সুনজর পান না। আপিল বিভাগ পোপ ফ্রান্সিসের লেখা উদ্ধৃত করে রায়ে বলেছে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড একটি গোপন মৃত্যুদণ্ড। এ ধরনের দণ্ডপ্রাপ্ত একজন তরুণকে অনেক দিন জেলে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে একজন বয়স্ক কয়েদি কম কারাবাস ভোগ করছেন। সমাজের এ বিষয়ে সমাধানের মানবিক পথ খুঁজে বের করা উচিত। আপিল বিভাগের রায়ে সাত জন বিচারপতিই সর্বসম্মতভাবে দণ্ড প্রদানের নীতি প্রণয়নের কথা বলেছেন।

পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে আপিল বিভাগ আরও বলেছে, বিশ্বের ১৪৯টি দেশে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান কার্যকর আছে। কিছু দেশে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ আমৃত্যু কারাবাস। আমাদের দণ্ডবিধিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড শব্দদ্বয়কে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি।

প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট: আইনজীবীকে তলব

আতাউরের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শিশির মনির ইত্তেফাককে বলেন, ‘আপিল বিভাগের এই রায় অনুযায়ী সরকারের উচিত সেনটেন্সিং পলিসি (দণ্ড প্রদানের নীতি) সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা। যদি সরকার উদ্যোগ না নেয়, তাহলে করোনার পর স্বাভাবিক বিচারব্যবস্থা চালু হলে এ বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে রিট দায়ের করব।’

ইত্তেফাক/এমএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x