আইনের তোয়াক্কা না করে ভরাট হচ্ছে জলাভূমি

রক্ষায় পৃথক আইন প্রণয়ন ও মন্ত্রণালয় গঠনের সুপারিশ হাইকোর্টের
আইনের তোয়াক্কা না করে ভরাট হচ্ছে জলাভূমি
ছবি: সংগৃহীত

জলাভূমি রক্ষায় আইন আছে। কিন্তু সেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বছরের পর বছর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হাজার হাজার একর জলাভূমি অবৈধভাবে ভরাট করেছে। এখনো করছে। এতে বিপর্যয় ঘটছে পরিবেশের। এখন দেশের জলাভূমি রক্ষায় পৃথক একটি আইন ও মন্ত্রণালয় গঠনে সরকারকে সুপারিশ করেছে উচ্চ আদালত। আদালত বলেছে, দেশের সব জলাভূমির সুরক্ষা, উন্নয়ন এবং ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে ‘জলাভূমি মন্ত্রণালয়’ সৃষ্টি করা আবশ্যক।

‘বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বনাম সরকার ও অন্যান্য’ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ এই সুপারিশ করেছেন। রায়ে বলা হয়েছে, প্রকৃতি, পরিবেশ এবং প্রতিবেশের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়নই স্থায়ী হয় না। বরং প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশের রক্ষণ, সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন তা দীর্ঘমেয়াদি সাম্য, সম্প্রীতি ও শান্তি আনয়ন করে।

খুলনায় অবৈধভাবে কৃষি জমি ভরাট করে হচ্ছে আবাসন – দলিত ভয়েস ২৪.কম

জলাধার সংরক্ষণ আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন থাকার পরেও বেআইনিভাবে ভরাট করা হয়েছে বা হচ্ছে জলাভূমি। ভরাটকৃত জলাভূমি রক্ষা এবং পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে উচ্চ আদালতে দায়ের করা হয়েছে একাধিক রিট মামলা। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন জলাভূমি রক্ষায় এসব মামলা করছে। এসব মামলায় তুরাগ নদসহ বিভিন্ন জলাভূমি রক্ষায় যুগান্তকারী নির্দেশনাও এসেছে। কিন্তু বন্ধ হয়নি জলাভূমি ভরাট। আইনের তোয়াক্কা না করেই স্থানীয় প্রশাসনের চোখের সামনেই এই অবৈধ ভরাট কার্যক্রম চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে—এমনটাই মনে করেন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো কর্তাব্যক্তিরা।

প্রবহমান খাল ভরাট করে দখল!

এ প্রসঙ্গে বেলার নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ইত্তেফাককে বলেন, জলাভূমি রক্ষায় যে আইনগুলো রয়েছে তাতে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এক্ষেত্রে নতুন আইন প্রণয়ন ও জলাভূমিসংক্রান্ত মন্ত্রণালয় গঠনে হাইকোর্টের নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, জলাভূমি ভরাট বন্ধে দরকার সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলেই বন্ধ হবে জলাভূমি ভরাট। বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে পরিবেশ।

কুমিল্লায় খাল ভরাট করে নির্মিত হচ্ছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর

২০০৯ সাল থেকে সেনারগাঁওয়ের ছয়টি মৌজায় (পিরোজপুর, জৈনপুর, চরহিস্যা, চরভবনাথপুর, ভাটিয়াবান্ধা এবং রতনপুর) মাটি ভরাট কার্যক্রম পরিচালনা করছিল ইউনিক প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড। সোনারগাঁও রিসোর্ট সিটি পরবর্তীকালে সোনারগাঁও ইকনোমিক জোন তৈরির লক্ষ্যে এ প্রকল্প নেওয়া হয়। এই ছয়টি মৌজায় কৃষিজমি, নিচু ভূমি, জলাভূমি রয়েছে। এই মাটি ভরাট কার্যক্রমের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়েরকৃত রিটের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে রায় দেয় হাইকোর্ট। সম্প্রতি এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ পেয়েছে।

খাল ভরাট | 965073 | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

রায়ে বলা হয়েছে, গত ১১ বছর সোনারগাঁও উপজেলা প্রশাসনের সব চিঠিপত্র, পরিবেশ অধিদপ্তরের সকল চিঠিপত্র, হাইকোর্টের সকল আদেশ, আদালত অবমাননা মামলার আদেশ এবং আপিল বিভাগের আদেশসমূহ পর্যালোচনায় এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষ ঐ ছয়টি মৌজার কৃষি জমি, নিচু জমি এবং জলাভূমি বেআইনিভাবে বালু দিয়ে ভরাট করে দখল করেছে। সংবিধান, অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন, তুরাগ নদীর রায় এবং রামশার কনভেনশন মোতাবেক প্রকৃতি পরিবেশ, জলবায়ু, জলাভূমি, সমুদ্র, সমুদ্র সৈকত, নদ-নদী, নদ-নদীর পাড়, খাল-বিল, হাওড়, বাওড়, নালা, ঝিল, ঝিরি, সকল উন্মুক্ত জলাভূমি, পাহাড়-পর্বত, বন, বন্যপ্রাণী এবং বাতাস দূষণ করে, ক্ষতিগ্রস্ত করে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।

জলাভূমি রক্ষায় হাইকোর্টের

একগুচ্ছ নির্দেশনা:

অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন ২০১০-এর ৩৩ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আবেদন করতে ইচ্ছুক হলে আবেদনপত্রের সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনাপত্তিপত্র সংযুক্তকরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রণয়নের ক্ষেত্রে এসপিএ, আরআরএসও স্যাটেলাইটের সাহায্যে আরএস/জিআইএস উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের সব জলাভূমির ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় এবং জীববৈচিত্র্য-বিষয়ক তথ্যাদি সংগ্রহপূর্বক সব ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলার ম্যাপ প্রস্তুত করতে হবে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসে অন্তত একদিন এক ঘণ্টার জন্য জলাভূমির প্রয়োজনীয়তা, উপকারিতা, রক্ষাসহ সব বিষয়ে আলোচনার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্দেশিকা জারি করবে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যায়ে তিন মাস অন্তর অন্তর জলাভূমির ওপরে আলোচনা, সেমিনারের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দিয়েছে হাইকোর্ট।

ইত্তেফাক/এমএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x