নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নুসরাতের ভাইয়ের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নুসরাতের ভাইয়ের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন
আদালতে নুসরাত হত্যা মামলার আসামি নুর, এসএম সিরাজ-উদ-দৌলা, কাউন্সিলর ও উম্মে সুলতানা পপি। ছবি: ইত্তেফাক

মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণে ১নং সাক্ষী নুসরাতের ভাই মাহ্মুদুল হাসান নোমানের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে। রবিবার দুপুর পৌনে ১২টায় তার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়।

জানা যায়, বেলা পৌনে ১২টায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে ঘটনার ১৬ আসামির উপস্থিতে বাদী পক্ষের নুসরাত জাহান রাফির ভাই মাহ্মুদুল হাসান নোমান ১নং সাক্ষীকে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা একটানা জেরা করেন। দুপুর সোয়া ২টায় আদালত মধ্যহ্নভোজের বিরতি দিলে ৩টার সময় পুনরায় আদালতের বিচারকার্য শুরু হয়। এ সময় আসামি পক্ষের আইনজীবীরা কামরুন নাহার মনি, সিরাজ উদ দৌলার ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি, শাহাদাত হোসেন, মো. শামীম, আবদুর রহিম আরিফ, মহি উদ্দিন ও আফছার উদ্দিন এর পক্ষে বাদী মাহ্মুদুল হাসান নোমানকে একটানা জেরা করেন। বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটের সময় আসামি মোট ৭ জনের পক্ষে বাদীর জেরা শেষ হলে আইনজীবীরা পরবর্তী ২ সাক্ষী নিহত নুসরাত জাহান রাফির সহপাঠী নিশাত ও ফুর্তিকে সোমবার ১ জুলাই সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্যের আবেদন করলে আদালত তাহা মঞ্জুর করে ১ জুলাই সোমবার বেলা ১১ টায় আদালত পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণের সময় ধার্য করেন।

আদালতের কর্মদিবস শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি হাফেজ আহম্মদ আসামি ৭ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেন। সাক্ষ্য প্রদান শেষে নুসরাতের ভাই মাহ্মুদুল হাসান নোমানকে আসামি পক্ষের ৮ জন আইনজীবী এক এক করে জেরা করেন। এই মামলায় মোট ৯২ জন সাক্ষী রয়েছেন। নুসরাতের ভাই বাদী মাহ্মুদুল হাসান নোমানের ১নং সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা রবিবার শেষ হলো এবং ১ জুলাই সোমবার বেলা ১১ টায় আদালত পুনরায় ২নং সাক্ষী নিশাত ও ৩নং সাক্ষী ফূর্তির সাক্ষ্য গ্রহণ এবং আসামি পক্ষের আইনজীবীরা আসামিদের পক্ষ নিয়ে জেরা করা হবে।

অপরদিকে আসামী রুহুল আমিন ওরফে গুজা রুহুল, প্রফেসর নুরুল আফছার, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপির জামিনের জন্য সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট গিয়াস উদ্দিন নান্নু, এডভোকেট কামরুল হাসান জামিনের জন্য আদালতে জোরালো বক্তব্য পেশ করেন। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর পিপি হাফেজ আহাম্মদ আদালতকে জামিনের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেওয়ার পর আদালত সকলের জামিন নামঞ্জুর করে আসামিদের কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

এই হত্যা মামলায় আইনজীবীরা প্রথমেই বলেছিলেন, তারা কোন আসামির পক্ষে ওকালতনামায় সই করবেন না, এবং পক্ষে দাঁড়াবেন না বলে একাত্বতা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর চার্জশিট আদালতে দাখিল করার পর, ফেনী বারের আইনজীবীরা তাদের ঘোষিত বক্তব্যগুলো ভুলে গিয়ে আসামিদের পক্ষ নিয়ে তারাই বাদীকে আসামিদের পক্ষ নিয়ে আদালতে জেরা করে হেনস্তা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং আদালতকে বুঝাতে চাচ্ছেন যে, নুসরাত জাহান রাফি নিজের গায়ে নিজেই কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন।

আরও পড়ুন: বাগেরহাটে ভ্যান চালককে কুপিয়ে হত্যা

এই হত্যা মামলার ১নং আসামি সাবেক অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ফরিদ উদ্দিন খান নয়ন। যিনি ২০১৭ সালে ফেনী আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপি প্যানেল থেকে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক পদে জয়লাভ করছিলেন। তিনি মামলার প্রধান আসামির পক্ষ হয়ে আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন। অন্য কোন আইনজীবী সিরাজ উদ দৌলার পক্ষ হয়ে আদালতে দাঁড়াতে দেখা যায়নি।

অপরদিকে হত্যা মামলার প্রথমেই আওয়ামীলীগের আইনজীবী বুলবুল আহাম্মদ সোহাগ, আসামিদের পক্ষে ওকালত নামা দিলে ফেনী আইনজীবী সমিতি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং ঢাকা আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড থেকে জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য পদ থেকে তাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে আইনজীবী সোহাগকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, 'আমি এবং আমার পরিবার এই ঘটনায় মানসিকভাবে হতাশ।'

তিনি আরও বলেন, 'এ ব্যাপারে কোন বক্তব্য দিতে আমি রাজী নই। আইনজীবীদের কর্মকাণ্ড ফেনীবাসী দেখছেন।'

এদিকে মামলার অন্যতম আসামি সন্তান সম্ভবা কামরুন নাহার মনি ও শম্পাকে আদালতের আসামির কাঠগড়ায় বসার জন্য একটি কাঠের চেয়ার দুইজনকে বসার জন্য দেওয়া হয়। এ সময় ১৬ চার্জশিটভূক্ত আসামির সকলেই আদালতে হাজির ছিলেন। চার্জশিট ভুক্ত আসামীরা হচ্ছেন অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ-উদ-দৌলা, কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম, শিক্ষক আবছার উদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্যাহ জনি, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহমেদ, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, মো. শামীম, কামরুন নাহার মনি, আবদুর রহিম ওরফে শরিফ, ইফতেখার হোসেন রানা, এমরান হোসেন মামুন, মহিউদ্দিন শাকিল, হাফেজ আবদুল কাদের ও আওয়ামী লীগ সভাপতি ও নুসরাতের মাদরাসার সহ-সভাপতি রুহুল আমিন।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়ের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে নুসরাত জাহান রাফি অবশেষে মারা যান। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় একটি মামলা করেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত