সামাজিক সংক্রমণ শুরু

দেশে আরো এক জনের মৃত্যু ** বিদেশফেরত ৭ লাখ, পরীক্ষা মাত্র ৭৯৪ জনের

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২০, ০৩:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

  আবুল খায়ের

ছবি: সংগৃহীত

করোনা ভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন (সামাজিক সংক্রমণ) সীমিত আকারে শুরু হয়েছে বলে ধারণা করছে আইইডিসিআর। বুধবার রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে বলেন, দুটি জায়গায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংক্রমণের উত্স এখন পর্যন্ত চিহ্নিত করা যায়নি। সেদিক থেকে ‘লিমিটেড স্কেলে’ কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে বলে আমরা বলতে পারি। যখন কোনো সংক্রমণের উত্স চিহ্নিত করা যায় সেটাকে লোকাল ট্রান্সমিশন বলে। সংক্রমণ পাওয়া গেলেও তার উত্স চিহ্নিত করা না গেলে সেটা হল কমিউনিটি ট্রান্সমিশন।

ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, দেশে করোনা ভাইরাসে আরো একজন মারা গেছেন। ফলে দেশে ভাইরাসটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ জন। অন্যদিকে নতুন করে কেউ আক্রান্ত হননি। তাই আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯-ই আছে। করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন আরো দুজন। সবমিলিয়ে সুস্থ হয়েছেন সাত জন। এদিকে সম্প্রতি বিদেশ থেকে ৭ লাখ মানুষ দেশে আসলেও মাত্র ৭৯৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

ডা. ফ্লোরা বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৮২ জনের। এদের মধ্যে নতুন করে কেউ আক্রান্ত হননি। তবে আগে থেকে যারা আক্রান্ত ছিলেন, তাদের মধ্যে এক জন গতকাল সকালে মারা গেছেন। তার বয়স ছিল ৬৪ বছর। তিনি উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। বিদেশফেরত এক ব্যক্তির সংস্পর্শে থেকে গত ১৮ মার্চ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হন তিনি। এরপর স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে গত ২১ মার্চ তাকে রাজধানীর কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি জানান, দেশে বর্তমানে করোনা নিশ্চিত বা সন্দেহভাজন এমন ৪৭ জন আছেন আইসোলেশনে। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৪৭ জন।

আরও পড়ুন: পার্সেলের বদলে এলো মানুষ!

বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা অবিলম্বে বিভাগীয় পর্যায়ে চালু হচ্ছে। পুরোনো ৮টি মেডিক্যাল কলেজে পরীক্ষার ল্যাবরেটরি স্থাপন করার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে পরীক্ষা চালু হয়েছে। এ বিষয়টি গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ নিশ্চিত করেছেন। ঢাকার মধ্যে আইইডিসিআরের পাশাপাশি পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউট ও ঢাকা শিশু হাসপাতালে পরীক্ষার কার্যক্রম চলছে। তবে শিশু হাসপাতালে শুধুমাত্র অন্য প্রতিষ্ঠানের পাঠানো নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালও প্রস্তুত রয়েছে। কিট পেলেই তারা করোনা পরীক্ষা শুরু করবে। সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজেও চালু হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বারবার তাগিদ দিয়ে আসছে, আগে করোনার পরীক্ষা করতে হবে, পরে চিকিত্সার ব্যবস্থা। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় দেশব্যাপী ইপিআই টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণ চলছে বলে জানা গেছে।

এদিকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ ও দিক-নির্দেশনা প্রদানের জন্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু করোনা নিয়ে সরকারের কোনো কমিটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়াসহ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের রাখা হয়নি। এ নিয়ে অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, আমাদের সাজেশনও গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

বিএমএর ১০ সুপারিশ :করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা রোধে ১০ দফা সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)। সংগঠনের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত সুপারিশগুলো হলো, চিকিত্সক, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রী (পিপিই) দ্রুত সরবরাহ, প্রতিটি বিভাগে করোনা শনাক্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাগ্রহণ, ২ হাজার নতুন চিকিত্সক ও ২০০ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ ইত্যাদি।

মৃতদের দাফন তালতলাতেই :এলাকাবাসীর আপত্তি সত্ত্বেও ঢাকায় করোনা ভাইরাসে মৃত একজনকে খিলগাঁওয়ের তালতলা কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া সর্বশেষ ব্যক্তিকে বুধবার ঐ কবরস্থানে দাফন করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা তাজিনা সারোয়ার। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীতে কেউ মারা গেলে ওই কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।

ফেনী লকডাউন :এদিকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ফেনীকে লকডাউন করার ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান। বুধবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বলবত্ থাকবে ।

রাজশাহীতে জ্বর-শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিত্সাধীন নারীর মৃত্যু :স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী জানান, জ্বর-সর্দি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নিবিড়ি পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিত্সাধীন এক নারী মঙ্গলবার দিবাগত রাতে মারা গেছেন। তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কিনা তা পরীক্ষার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উত্কণ্ঠা আর তত্পরতার মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়।

সখীপুরে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ হোম কোয়ারেন্টাইনে :সখীপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, প্রবাসী অধ্যুষিত টাঙ্গাইলের সখীপুরের পুরো উপজেলাকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উপজেলা করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে উপজেলার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ বুধবার সকাল থেকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। উল্লেখ্য, উপজেলায় চলতি মাসে ৬৪৭ জন প্রবাসী দেশে ফিরেছেন।

লক্ষণ নিয়ে ঢাকায় রাজশাহীর এক নার্স :করোনা ভাইরাসের উপসর্গ থাকায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের এক নার্সকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। চারদিন ধরে বলে বলেও তার পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারা যায়নি। বুধবার তাকে কুর্মিটলা হাসপাতালে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ইত্তেফাক/বিএএফ