হার্ড ইমিউনিটিতে ভরসা কতদূর

*অ্যান্টিবডি কতদিন থাকবে তা কেউ বলতে পারবে না :ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ অতি উৎসাহিত না হয়ে সবার স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা উচিত :ডা. নজরুল ইসলাম *ভ্যাকসিন ছাড়া হার্ড ইমিউনিটি অনেকটাই অসম্ভব : ডা. এ এস এম আলমগীর
হার্ড ইমিউনিটিতে ভরসা কতদূর
করোনা ভাইরাসের প্রতীকী ছবি।

করোনা ভাইরাসের হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের পথে বাংলাদেশ কতদূর? রাজধানী ঢাকার ৪৫ শতাংশ মানুষের শরীরে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) অ্যান্টিবডি পজিটিভ পাওয়া গেছে। বস্তি অঞ্চলে এই হার ৭৪ শতাংশ। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর এক যৌথ জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। বস্তিতে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এবং বস্তির বাইরে রাজধানীর অধিবাসী প্রায় অর্ধেক মানুষের শরীরে করোনা ভাইরাসের অ্যান্টিবডির এই উপস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ কি তাহলে করোনা ভাইরাসের ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনের পথে রয়েছে? অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, বাংলাদেশ এখনো করোনার ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে। অ্যান্টিবডি তৈরি হলেও তা কতদিন থাকবে সেটি কারোর জানা নেই। এক মাস কিংবা ৪৫ দিন পর অ্যান্টিবডি নাও থাকতে পারে। যতদিন সবাইকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা না যাবে ততদিন হার্ড ইমিউনিটি অর্জন হয়েছে বলা যাবে না।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আরো বলেন, বাংলাদেশে হার্ড ইমিউনিটি হয়েছে এটা বলা খুবই ডিফিকাল্ট। আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআর, বির গবেষকরাও এটা বলেনি। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই। যেহেতু সম্পূর্ণ নতুন একটি ভাইরাস, তাই এখনো এর অ্যান্টিবডি কতদিন থাকতে পারে, তা বলা যায় না। এগুলো নিয়ে কাজ হচ্ছে। আবার অ্যান্টিবডি হওয়া মানেই যে কেউ নিরাপদ, বিষয়টি তেমনও না। যদি কারো কোভিড-১৯ পজিটিভ শনাক্ত হয়ে থাকে তবে ধরে নেওয়া যেতে পারে তার অ্যান্টিবডি হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অ্যান্টিবডি তৈরি হবেই, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। আসলে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে বলার মতো অনেক তথ্যই আমাদের হাতে নেই। যখন কোনো এলাকার বৃহত্ জনগোষ্ঠীর কোনো একটি নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে নিজেদের শরীরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয়, সেই রোগের বিস্তার কমিয়ে ফেলে কিংবা ঠেকিয়ে দেয়, সেটিকে আমরা হার্ড ইমিউনিটি বলে মনে করি। মূলত এটি পরোক্ষভাবে ইনফেকশন ছড়ানোর রাস্তা সীমিত করে তোলে। সাধারণত হার্ড ইমিউনিটি দুইভাবে তৈরি করা সম্ভব। এক. কৃত্রিম বা ভ্যাকসিনের মাধ্যমে। দুই. প্রাকৃতিক নিয়মে শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়।

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআর,বি গবেষণায় অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পেয়েছে। কিন্তু এই অ্যান্টিবডি কতদিন থাকবে তা কেউ বলতে পারবে না। তাই এটা থেকে বোঝা যাবে না যে, দেশে হার্ড ইমিউনিটি হয়ে গেছে। এটা নিয়ে এত উত্সাহিত হওয়ার দরকার নেই। যতদিন সবাইকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা না যাবে ততদিন হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা সম্ভব না। এখন হার্ড ইমিউনিটি হয়েছে সেটা ভাবা উচিত হবে না। তাই সবার মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, আমরা ছোট পরিসরে গবেষণা করে ডাটা সংগ্রহ করেছি। এই তথ্যের ভিত্তিতে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন হয়েছে—এটা আমরা বলিনি। বলা ঠিকও হবে না। তবে বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত ও বস্তিতে কাদের অ্যান্টিবডি হয়েছে সেই সম্পর্কে আমরা একটা বেসিক ডাটা পেয়েছি। সবার ভ্যাকসিনের আওতায় আনা গেলে তখন হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের বিষয়টি বলা যাবে। সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি। ডা. এ এস এম আলমগীর আরো বলেন, এই গবেষণা, এর নমুনা সংখ্যা খুব অল্প। এটা দিয়ে সিদ্ধান্তে আসা খুব ডিফিকাল্ট হবে। তাছাড়া কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে তিন থেকে ছয় মাস পরে শরীরে আর অ্যান্টিবডি থাকে না বলেই এখন পর্যন্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি, ভ্যাকসিন ছাড়া হার্ড ইমিউনিটি হওয়া অনেকটাই অসম্ভব।

করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, অনেকের অ্যান্টিবডি হয়ে গেছে—এটা বলার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে ভাববে এখন আর মাস্ক পরার দরকার নেই। এতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। কারণ অ্যান্টিবডি কতদিন থাকবে সেটা তারা বলেনি। তাছাড়া করোনার কোনো চরিত্র নেই। যে কোনো সময় তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশ এখনো ঝুঁকিতে। অতি উত্সাহিত না হয়ে সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে বেশি চিন্তা না করে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

ইত্তেফাক এসি

ঘটনা পরিক্রমা : করোনা ভাইরাস

পরবর্তী
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত