বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২০, ২৪ আষাঢ় ১৪২৭
৩৩ °সে

নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম
প্রতীকী ছবি।

আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি নানা আনুষ্ঠানিকতায় উদযাপিত হচ্ছে। অথচ চৌদ্দশ বছর পূর্বেই ইসলাম ও বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বিশ্বব্যাপী নারী সমাজের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার এক জীবন্ত আদর্শ স্থাপন করেছেন। মানব মন ও মানব সমাজে নারী প্রগতির গোড়াপত্তন করে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন। নর-নারী উভয়ে আশরাফুল মাখলুকাত হিসাবে স্বীকৃত এবং কর্মফল অনুযায়ী স্বর্গ লাভের সম অধিকার প্রাপ্য। যেভাবে পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক ঘোষণা করছেন, ‘তিনি তোমাদের এক-ই সত্তা হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার জীবনসঙ্গিনীকে একই উপাদান হতে সৃষ্টি করেছেন’(সুরা নেসা, আয়াত: ১)।

ইসলামের কষ্টিপাথরে নারী পুরুষের মর্যাদা ও অধিকার তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলাম নারীকে শুধু পুরুষের সম-অধিকার নয় বরং কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষ থেকে নারীকে অধিক মর্যাদা দিয়েছে। মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত ঘোষণা করে ইসলাম নারী জাতিকে সর্বোত্তম মর্যাদায় ভূষিত করেছে। যে মর্যাদা পুরুষকে দেয়া হয়নি। ইসলামে একজন নারী একজন পুরুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি ও মর্যাদার অধিকারী। পারিবারিক জীবনে সংসার পরিচালনার ক্ষেত্রে নারীর ওপর পুরুষের প্রাধান্য থাকলেও সার্বিক মূল্যায়নে ইসলাম নারী জাতিকে পুরুষের অধিক মান-মর্যাদার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করেছেন, যা অন্য কোন ধর্ম বা জাতিতে করেনি। ইসলাম নারী-পুরুষের জন্য পৃথক পৃথক কোন আদেশ-নিষেধও করেন নি আবার তাদের মাঝে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করেনি।

ইসলামের শিক্ষা সবার জন্য, কোথাও বলা হয়েছে, হে মানব মণ্ডলী, আবার কোথাও বলা হয়েছে হে মোমেনগণ বা হে যারা ঈমান এনেছ। এথেকে বোঝা যায় আল্লাহ তায়ালা নিজেই নারী-পুরুষের মাঝে কোন বৈষম্য সৃষ্টি করেন নি। যেভাবে বলা হয়েছে, নারী-পুরুষ যেই ভালো কাজ করবে সে-ই জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ ছাড়া ইসলামে নারী জাতির অবদান অনেক। সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার মর্যাদাও লাভ করেছিলেন একজন নারীই। ইসলামের উন্নতির জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থের জোগানও দিয়েছিলেন একজন নারীই। ইসলামের পক্ষে জেহাদ করতে গিয়েও সর্বপ্রথম যিনি নিজের জীবন দান করেন তিনিও ছিলেন একজন নারী। আজ যখন একজন নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয় তখন বুক ফেটে যায় কান্না। বিভিন্ন দোকানে পণ্য সামগ্রীকে যেভাবে সাজিয়ে রাখা হয় ক্রেতাদের আকর্ষণের জন্য ঠিক একইভাবে নারীদেরকেও পণ্যের ন্যায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। ঘরে বসে টেলিভিশন দেখুন বা বাজার করতে যান, সর্বত্রই যেন নারীরা আজ পণ্যে রূপ নিয়েছে। অথচ এই নারীর গর্ভেই জন্ম নিবে আগামী দিনের দেশ পরিচালনাকারী। আমরা নারীকে যদি নারীর মর্যাদা না দিয়ে পণ্যে রূপায়িত করি তাহলে তাদের গর্ভ থেকে আদর্শ নাগরিক পাওয়ার আশা রাখতে পারি না।

একজন নারী তখনই আদর্শ মা হবে যখন আমরা সবাই তার মর্যাদা দিব। শুধু একদিন নারীদের অধিকার বা মর্যাদার কথা উল্লেখ করাতেই কি মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়? না, বরং এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি দিন, প্রতিটি সময়, প্রতিটি ঘরে তাদের মর্যাদা ও সম্মানের বিষয় নিয়ে ভাবা এবং তাদের সাথে সেই ধরণের উত্তম আচরণ করা। আর এ কাজ প্রথমে নিজ পরিবার থেকে শুরু করা যেতে পারে।

মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিতে ইসলাম যতটুকু করেছে ততটুকু অপর কোনো ধর্ম কোনোদিন করতে পারে নি। নর-নারী এ দুয়ের সমন্বয়ে মানব গোষ্ঠী। নারী কাজে ও চিন্তায় পুরুষের সঙ্গিনী। পুরুষের আনন্দ ক্ষণে খুশির বার্তাটুকু জানানোর জন্য আর তার দুঃখের মুহূর্তে তার বেদনায় সহানুভূতি জানানোর জন্য-ই নারী। ইসলাম নারীর এ স্বকীয়তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। নর-নারী উভয়ই সমাজ, সভ্যতা ও ইতিহাসের নির্মাতা। এক জোড়া পুরুষ-মহিলা থেকে সৃষ্ট মানবমণ্ডলীর সদস্য হিসাবে সকলেই আল্লাহ তায়ালার সমক্ষে সম-মর্যাদার অধিকারী। চামড়ার রং, ধন-সম্পদের পরিমাণ, সামাজিক মর্যাদা, বংশ ইত্যাদির দ্বারা মানুষের মর্যাদার মূল্যায়ন হতে পারে না। মর্যাদা ও সম্মানের সঠিক মাপকাঠি হলো ব্যক্তির উচ্চমানের নৈতিক গুণাবলী এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি তার কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা।

নারী জীবনের আবাহন, পুলকের সংগীত, পবিত্র স্নেহ-মমতার প্রতীক, বিশ্ব নিখিলের প্রাণ-স্পন্দন। বিশ্বের যত বড় বড় ব্যক্তি, তারা সবাই নারীর গর্ভে অস্তিত্ব লাভ করেছে, নারী কর্তৃক প্রসবিত এবং নারীর ক্রোড়েই লালিত পালিত হয়েছে। মানবজাতির মর্যাদা বাড়িয়েছে নারী, গোটা মানবতাই নারীর কাছে ঋণী। এটা কেউ অস্বীকার করতে পারে না, পারেনি আর পারবেও না কোনো দিন। জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবান বস্তু নারীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। হায়! বড়ই আফসোস হয় যখন শুনি নারীর গায়ে আগুন, শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁক, কেরোসিন ঢেলে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়া এবং গাছে বেঁধে নির্যাতনের খবর। আমরা কি পারি না নারীকে নারীর মর্যাদা দিতে?

তাই আসুন না, নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন না করে একজন আদর্শ মা হিসেবে তাদের মর্যাদা দেই।

লেখক: ইসলামী গবেষক ও কলামিস্ট

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত