বাউল ফকির লালন

বাউল ফকির লালন
লেখকের আঁকা ফকির লালন শাহ

বাউল শিরোমণি ফকির লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০ খ্রি.) আমাদের অন্তরাত্মার সাথে একাকার হয়ে আছেন। দিনকে দিন, বিশেষ করে তার তিরোধানের অব্যবহিত পরেই প্রকাশিত ‘মহাত্মা লালন ফকীর’ প্রবন্ধে তাঁর জীবনযাত্রা, ধর্মসাধনা ও সংগীততত্ত্ব আমাদের আত্মাকে পরিতৃপ্ত করেছে। অংশবিশেষ—

‘তিনি সকল নীচ কার্য হইতে দূরে ছিলেন ও ধর্ম-জীবনে বিলক্ষণ উন্নত ছিলেন বলিয়া বোধ হয়। মিথ্যা জুয়াচুরিকে লালন ফকীর বড়ই ঘৃণা করিতেন। নিজে লেখাপড়া জানিতেন না; কিন্তু তাঁহার রচিত অসংখ্য গান শুনিলে তাঁহাকে পরম পণ্ডিত বলিয়া বোধ হয়। তিনি কোন শাস্ত্রই পড়েন নাই; কিন্তু ধর্মালাপে তাঁহাকে বিলক্ষণ শাস্ত্রবিধ বলিয়া বোধ হইত।’

যখন ইউনেস্কো আমাদের বাউলগানকে স্বীকৃতি দেয়, তখন সত্যিকার অর্থেই তাঁর পরম পাণ্ডিত্য বিচ্ছুরিত হয়। আমাদের গৌরবান্বিত করে, যখন আমাদের লোকসংস্কৃতি লাভ করে আন্তর্জাতিক মর্যাদা। জাতিসংঘ আমাদের কোনো লোককবিকে যখন সম্মাননা দেন, তখন আমরা পুলিকিত হই। আমাদের বাউল গান নিয়ে বিশেষ করে লালনের গান নিয়ে নানা ভিন্ভাষিকে যখন মহতোদ্যোগী হতে দেখি, তখন তাঁকে শাস্ত্রজ্ঞ মানতে আমাদের বড়োই ভালো লাগে।

লালন যে কেবল বিশ্বশ্রেষ্ঠ বাউল তা-ই নয়, অন্যতম দার্শনিকও। তাঁর দর্শনতত্ত্ব সেই ছেঁউড়িয়া অঞ্চল ছেড়ে দেশের সীমানা ডিঙিয়ে আজ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। সাহিত্যগুণে টইটম্বুর লালনের বাণীপ্রধান অনন্য গান এখন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। শিক্ষিত থেকে উচ্চশিক্ষিত পর্যায়ে লালন নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক-গবেষণা বাড়ছে। তাঁকে ডেকেছি লালন ফকির, ফকির লালন, লালন সাঁইজি, লালন শাহ, লালন গোঁসাই নানা নামে। মন ভরেনি, ৫ মে ১৮৮৯ (২৩ বৈশাখ ১২৯৬) তারিখে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘লালন ফকীর’শিরোনামে একটি পেনসিল স্কেচ করেন। নন্দলাল বসু সেই স্কেচ অবলম্বনে আঁকেন আরো একটি ছবি। লালন আছে কি? শুধু লালনকে বর্তমানে রাখা।

এমন ভালোবাসা-শ্রদ্ধা অন্যত্রও ছিল। যিশুখ্রিষ্ট, গৌতম বুদ্ধ, শেক্সপিয়র, তানসেন, বৈজু বাওরা, আমির খসরু—সব ছবি বানানো। লালনের তিরোধানের পর ১৮৯০ থেকে ২০২০, সময় ১৩০ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে চর্চা বেড়েছে তার মূলে কিন্তু শুধু আখড়ার বাউল আর রেডিও-টিভি-মঞ্চের কণ্ঠশিল্পী নয়, পত্র-পত্রিকা, সংকলক, ফোকলোরিস্ট, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, ছায়াচিত্র সমানভাবে ভূমিকা রেখেছে। সহজেই বোঝা যায়, লালনচর্চা এখন চক্রাকারে বাড়ছে। এই যে বাড়া, লালনের এই যে খ্যাতি—এর পেছনে লুকায়িত আছে তাঁর তত্ত্বসমৃদ্ধ ও শিল্পসফল নানা পর্যায়ের গান। যে গানের মাধ্যমে তিনি প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন একটি মতবাদ, যার নাম ‘বাউল মতবাদ’।

বাউল শব্দের অর্থ নিয়ে নানা মতভেদ আছে। তবে এইটুকু বলা যায়, তাঁরা কোনো জাতিভেদ মানেন না। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে প্রায় সব ধর্মের মানুষ এই সম্প্রদায়ভূক্ত।

লালন বাণীতে গেয়েছেন—

ক. সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে

লালন বলে জাতের কীরূপ দেখলাম না এ নজরে॥

খ. লালন বলে হাতে পেলে

জাত পোড়াতাম আগুন দিয়ে॥

গ. জাতির উৎপত্তি কোথায়? সকলে শুধায়

বললে কবে লালন ফকীর কড়া কথা কয়॥

ঘ. সবায় শুধায় লালন ফকীর কোন জাতির ছেলে

কারে বা কি বলব আমি দিশা না মেলে॥

বাউলদের নানা শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন—দীক্ষিত বাউল। এঁরা একেবারে নাড়া বাঁধা, পোশাক-পরিচ্ছদসহ দলবদ্ধভাবে বাস করেন। এরপর পথের বাউল। পোশাক আর গোপীযন্ত্র হাতে পথই তাদের ঠিকানা। শখের বাউল আছে। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে যাঁরা লালনকে নব-নবভাবে তুলে ধরেছেন। ভাবের বাউলও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অবসর পেলেই গলা ছেড়ে গাইতে থাকেন—

মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি

মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি॥

তার মানে আমরা সবাই বাউল। মানুষ মাত্রই বাউল, বাউলদের ভজনাই মানুষ। এই ‘মানুষ’নিয়ে লালনের আগে মধ্যযুগের (১২০০-১৭৫০ খ্রি.) অন্যতম কবি চণ্ডীদাস বলেছেন—

শুন’হ মানুষ ভাই

সবার উপরে মানুষ সত্য

তাহার উপরে নাই॥

লালনের ওফাতের ঠিক নয় বছর পর ঊনবিংশ শতাব্দীর ঠিক শেষের বছর জন্মগ্রহণ করেন মানবতাবাদের আরেক দ্বীপ্যমান কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রি.)। তিনি বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে বলেন—

সবার উপরে মানুষ সত্য

তাহার উপরে নাই।

মানুষের মাঝে হে মানুষ তুমি

সত্যের দিও ঠাঁই॥

বাণী আলাদা কিন্তু প্রকাশভঙ্গি এবং মানুষকে নিয়ে এঁদের প্রত্যেকের জয়গানের সুর অভিন্ন। তাহলে লালন কি চণ্ডীদাস পড়েছিলেন? অথবা নজরুল কি লালন? সবার সবকিছু পড়া লাগে না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—

‘বিশ্ববিদ্যালয়ের তোলা জলে স্নান আমার নয়।’লালন শতবর্ষ ধরে ‘মানুষ’ও ‘জীবন’নামক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে হয়েছেন ‘বাউল ফকির লালন’। আমরা তাঁর গড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি।

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত