ঢাকা শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬
২৮ °সে


বাড়ছে না চিত্রকলার বাজার

বাড়ছে না চিত্রকলার বাজার
শিল্পের বাজার প্রতিষ্ঠায় এসব গ্যালারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের নিজেদের অস্তিত্বই সংকটের মুখে

দেশে গত দুই দশকে বেশ কিছু শিল্প গ্যালারি গড়ে উঠলেও প্রতিটি গ্যালারি রয়েছে অস্তিত্ব সংকটে। ছবি বিক্রি করে এসব গ্যালারি টিকে থাকতে পারছে না। বাংলাদেশের শিল্পীদের শিল্প প্রদর্শনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করা শিল্পকলাকে মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলা এবং শিল্পের বাজার প্রতিষ্ঠায় এসব গ্যালারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের নিজেদের অস্তিত্বই সংকটের মুখে।

গ্যালারি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ছবি বিক্রি করে এখনো একটি গ্যালারি টিকে থাকার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। শিল্পী ও গ্যালারির মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বাংলাদেশের শিল্পী ও বেশিরভাগ গ্যালারির মালিকদের মধ্যে প্রফেশনালিজম এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। বিদেশে একজন শিল্পীর পেছনে গ্যালারি টাকা লগ্নি করে। সেই শিল্পীও সেই গ্যালারি মাধ্যম ছাড়া ছবি বিক্রি করেন না। কিন্তু আমাদের শিল্পীদের মধ্যে সেই প্রফেশনালিজম গড়ে উঠছে না। তারাও সুযোগ পেলে গ্যালারিকে পাশ কাটিয়ে বাইরে ছবি বিক্রি করছেন। এর ফলে গ্যালারিগুলোও শিল্পীদের পেছনে লগ্নি করা টাকা দু-একটি প্রদর্শনী করেই তুলে ফেলতে চাইছে।

ছবি বিক্রি ও ছবির বাজার সৃষ্টির সঙ্গে একটি দেশের অর্থনীতি জড়িত। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর একটি ব্যবসায়ী শ্রেণির হাতে টাকা এসেছে। এরাই ‘চারু পুঁজি’র সৃষ্টি করেছে। যারা অরিজিনাল পেইন্টিং সংগ্রহে রাখাকে ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ হিসাবে দেখেন তারা এমন জিনিস সংগ্রহে রাখতে চান যা অন্যের কাছে নেই। অনেকটা মেয়েদের গয়না সংগ্রহের মতো। সংগ্রাহকদের এ নেশা অনেক সময়ে উন্মাদনায় পৌঁছায়।

সারাদেশে সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্যালারি ও কমার্শিয়াল গ্যালারি মিলিয়ে প্রায় ৪০টির মতো হবে। এখন চারুকলায় থেকে পাশ করে বের হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রতি বছর পাঁচশ থেকে সাতশ শিক্ষার্থী চারুকলা থেকে বের হন, তবে শেষ পর্যন্ত খুব কম জনই পেশা হিসেবে বেছে নেন এই মাধ্যমকে। এর কারণ ছবির বাজার সত্যিকার অর্থে বাড়েনি। তবে গত ২০ বছরে আর্টিস্টের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান ও গ্যালারির সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু ছবির বাজার আর বড়ো হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের শিল্পের বাজার এখনো ‘ইনফরমাল বাজার’। এই বাজারকে কাঠামো দিতে এবং বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশের শিল্পকে তুলে ধরতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। প্রয়োজন আইন করা। এর পাশাপাশি বড়ো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা’র পেছনে যে টাকা খরচ করে সেখানে শিল্পকলাকে অন্তুর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ উদ্যোগ নিলে শিল্পের প্রতি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ সৃষ্টি হবে।

গ্যালারি কায়ার পরিচালক শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী বলেন, একটা দেশের ছবির বাজার তৈরি হতে সময় লাগে। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের শিল্পকলার সংগ্রহ একটা কাঠামোর মধ্যে এসেছে। কিন্তু সেই শিল্পের বাজারকে বড়ো করতে হলে এতে বিনিয়োগ দরকার। দরকার পৃষ্ঠপোষকতা। আমাদের বড়ো পুঁজির মালিক যারা তাদের বার্ষিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় শিল্পকর্মের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার কোনো খাত নেই। কিন্তু পাশের দেশ ভারতেই আমরা দেখি, শিল্পের বাজারে প্রতি বছর তারা কত টাকা লগ্নি করবে—বড়ো ব্যবসায়ীরা বছরের শুরুতেই তার একটা পরিকল্পনা করেন। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

গ্যালারি শিল্পাঙ্গনের পরিচালক রুমী নোমান বললেন, সত্যিকার অর্থে ছবির বাজার ভালো না। কারণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে শিল্পকে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এর জন্য আমি দায়ী করব তরুণ শিল্পীদের। চারুকলা থেকে সদ্য পাশ করা শিল্পীরাও তাদের ছবির দাম ২০-২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেন। যেখানে বড়ো সিনিয়র শিল্পীদের কাজ বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। সেখানে তরুণ শিল্পীর সেই কাজ এত দাম দিয়ে কেউ সংগ্রহ করতে চান না। আর তরুণ শিল্পীরা মনে করছেন, ছবির দাম না বাড়ালে তাকে সবাই সস্তা দরের শিল্পী মনে করবে। সে কারণে, নতুন সংগ্রাহকও সৃষ্টি হচ্ছে না। জনপ্রিয় শিল্পীদের কাজের সংগ্রাহকও ঘুরে ফিরে সেই ১০ থেকে ১৫ জন। এই শিল্পীদের প্রদর্শনী হলে একই সংগ্রাহকরাই কেনেন। ফলে লাভ খুব একটা কিছু হচ্ছে বলে মনে হয় না।

বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার ছবি বিক্রি হচ্ছে। প্রধানত বিত্তশালী ও রুচিবান মানুষরাই শিল্পের ক্রেতা। কিন্তু বাংলাদেশ সৃষ্টির পরে যারা বিশাল অর্থের মালিক হয়েছেন এই ব্যবসায়ীদের দ্বিতীয় প্রজন্মই এখন ছবির ক্রেতা। একইসঙ্গে করপোরেট ক্রেতাও সৃষ্টি হয়েছে দেশে। ব্যাংক-বীমা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক একটি খাত থাকে যা এই শিল্প সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যয় করা হয়।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের হাত ধরে পঞ্চাশের দশকে চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ঢাকায় আধুনিক শিল্পচর্চা শুরু হয়। পরবর্তী চার দশক ঢাকায় কোনো গ্যালারি ছিল না। শিল্পীদের ছবি সংগ্রহের কোনো কাঠামো ছিল না। এখন যাদের আমরা মাস্টার পেইন্টার বলে চিনি এবং এখন যাদের ছবি লাখ ছাড়িয়ে কোটির টাকা দাম ওঠে, তাদের ছবি বিক্রি হতো পানির দামে।

গ্যালারি গড়ে ওঠায় শিল্পীদের ছবি প্রদর্শনের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে শুধু দেশি সংগ্রাহকেরাই নয়, বিদেশি সংগ্রাহকরাও ছবি সংগ্রহ করতে পারছেন। সেইসঙ্গে শিল্পীদের ছবি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে ষাট ও সত্তরের দশকে দেশে শিল্পের ক্রেতা খুব কম ছিল। তখন ক্রেতা ছিল মূলত বিদেশি ও অবাঙালিরা। মুক্তিযুদ্ধের পরেই দেশে সংগ্রাহক সৃষ্টি হতে শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা পায় সাজু আর্ট গ্যালারি। নাম গ্যালারি হলেও এটা ছিল মূলত ‘আর্ট শপ’। তবে, সাজু আর্ট গ্যালারি বাংলাদেশের অনেক শিল্পীকে ছবি বিক্রি করে বাঁচিয়ে রেখেছিল। বাংলাদেশে প্রথম গ্যালারির নাম ছিল ‘আনসাম্বল’। এ গ্যালারির সঙ্গে অনেক শিল্পীরাও যুক্ত ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ ‘গ্যালারি শিল্পাঙ্গন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিল্পকর্ম সংগ্রহের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। গ্যালারি শিল্পাঙ্গন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিল্পের প্রসারে যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল এক দশক পরে বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস সেই ধারাকেই যেন বহু দূর এগিয়ে নিয়ে এসেছে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ‘গ্যালারি কায়া’ বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রদর্শনী আয়োজন এবং তরুণ শিল্পীদের নিয়ে কাজ করছে।

১৯৪৮ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের লোকায়ত শিল্পধারাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠতে থাকেন তরুণ শিল্পীরা। বাংলাদেশের মাস্টার পেইন্টার জয়নুল-কামরুল-সুলতানকে সামনে পান তারা। ধীরে ধীরে একটি উজ্জীবিত তরুণপ্রজন্ম গড়ে ওঠে। আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়া, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, রশীদ চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, শহীদ কবীর—তখনকার এ তরুণ শিল্পীরাই আজকের বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার পথিকৃত্। তাদের অবলম্বন করেই বর্তমানের তরুণ শিল্পীরা গড়ে উঠছেন।

সাজু আর্ট গ্যালারি সূত্রে জানা যায়, একটা সময় ছিল যখন জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানের ছবি বিক্রি হতো ৫০০-৭০০ টাকায়। প্রথমে কিস্তিতে ছবি বিক্রি করতে হতো। কারণ সে টাকাটাও একবারে কেউ দিতে চাইত না। বিক্রিও হতো খুব কম। দেশের শিল্পীদের প্রধান ক্রেতা ছিল বিদেশিরা। এখন তো সে অবস্থা বদলে গেছে। বিদেশিরা তো কিনছেনই, তবে দেশের ক্রেতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

আরও পড়ুন: নগর কৃষি ও পরিবেশ সংক্ষরণে ছাদবাগান

বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বললেন, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পরে আমরা সচেতনভাবেই চেয়েছি দেশের শিল্পীদের মূল্যমান বাড়াতে। বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজের যে মান তা সেভাবে দেশে ও বিদেশে মূল্যায়িত হয়নি। শুধু ছবি বিক্রি করে একটি গ্যালারি টিকে থাকার মতো পরিস্থিতি এখনো সৃষ্টি হয়নি। ছবি বিক্রি করে কোনো গ্যালারি টিকে থাকতে পারছে না, কেননা সেই বাজার দেশে এখনো সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু আমরা এই অবস্থাটা পালটে দিতে চেয়েছি।

তিনি বলেন, যখন বেঙ্গল গ্যাালারি প্রতিষ্ঠা পায় তখন হাতেগোনা দু-একটি গ্যালারি ছিল। এখন দেশে প্রায় ৩০-৪০টি গ্যালারি। একইসঙ্গে, বেঙ্গল মোহাম্মদ কিবরিয়ার প্রথম প্রদর্শনীতে তার একেকটি ছবি বিক্রি হয়েছিল ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায়। আর মোহাম্মদ কিবরিয়ার মৃত্যুর পর ছবির দাম ৪৫ লাখ ছাড়িয়েছে। আমাদের আন্তর্জাতিক মানের শিল্পীদের ছবির মূল্যায়ন হওয়াটাও জরুরি। সেই মান নির্ধারণও গ্যালারির কাজ। সেইসঙ্গে আমরা বিদেশের শিল্পীদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করে দেশের শিল্পীদের জন্য যেমন একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করেছি, তেমনি দেশের শিল্পীদেরও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সৃষ্টি এবং সেসব দেশের কর্মশালায় অংশগ্রহণ ও বাংলাদেশের শিল্পীদের বহির্বিশ্বে প্রদর্শনীতে দেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করছি। সেদিক থেকে বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জন করেছে।

ইত্তেফাক/কেকে

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন