প্রভাবশালীদের জন্যই যত সুবিধা, ঋণ পাচ্ছেন না সব উদ্যোক্তা

ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ যথেষ্ট নয়
প্রভাবশালীদের জন্যই যত সুবিধা, ঋণ পাচ্ছেন না সব উদ্যোক্তা
অর্থনীতি অবনমনের চিত্র।

বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে অর্থনীতিবিদগণ বলেছেন, মন্দা আরো গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হবে। অর্থনীতির মরা গাছে যারা সবুজ প্রাণের ছোঁয়া দেখছেন তাদের আশাহত করে কেউ কেউ বলেছেন, তারা কী আগাছার মধ্যেই ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত খুঁজছিলেন? বিষয়টি সংবাদমাধ্যমেরও দৃষ্টি এড়ায়নি। এমন এক বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ নিজের অর্থনীতিকে টেনে তুলতে কতটা সক্ষম, কিংবা প্রস্তুতিই বা কতটুকু—সে প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। এর উত্তরে সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলেছেন, গভীর খাদে পড়ে যাওয়া অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বাংলাদেশের নেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজ কিংবা পুনরুদ্ধার কর্মসূচি মোটেই যথেষ্ট নয়। বরং যতটুকু সুবিধা পাওয়া যেত, তাও হচ্ছে না প্যাকেজটির কার্যকর বাস্তবায়ন না হওয়ায়। ঘোষিত প্যাকেজের অর্থও চলে যাচ্ছে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে। সব উদ্যোক্তা এই প্যাকেজের সুবিধা পাচ্ছেন না। ব্যাংকগুলোও প্যাকেজ বাস্তবায়নের শর্তে নেওয়া নানান সুবিধা গ্রহণ করে নিজেদের আর্থিক অবস্থান সুসংহত করেছে। ঋণ সহায়তা দিচ্ছে না। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, সার্বিক বিশ্ব পরিস্থিতি এখনো অনূকুলে নয়। করোনার ভ্যাকসিন বাজারে সহজলভ্য হলেও এর প্রভাবে সৃষ্ট মন্দা আরো গভীর হচ্ছে। তাই সামনের দিনগুলোতে শুধু টিকে থাকাই নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনে এখনই নীতিকৌশল প্রণয়ন করতে হবে।

এদিকে, উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা এখন ঋণ পেতে মরিয়া। এ সময়ে অর্থ যোগান সম্ভব হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো। উদ্যোক্তাদের অনেকেই ঋণসহায়তার বদলে ব্যাংক কর্তৃক হয়রানির শিকার হচ্ছেন—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করেছেন উদ্যোক্তা মো. মহিউদ্দিন। তিনি এইচ এম রহমান অটোসেন্টারের উদ্যোক্তা। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের গ্রাহক। ব্যাংকটি তাকে ঋণসহায়তা দেওয়ার কথা বলে এখন আর দিচ্ছে না। এ অবস্থায় সামান্য অর্থ পেলে যে ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াত, তা আর সচল রাখা যাচ্ছে না। বরং নির্ভরশীল পরিবারগুলোও জীবন-জীবিকার সংকটে রয়েছে।

লিখিত, অলিখিত এমন বহু অভিযোগ রয়েছে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বারংবার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা আমলেই নিচ্ছে না কোনো ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছেন, সরকার ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। কার্যত: এই প্যাকেজের অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে প্রভাবশালীদের মধ্যেই। যারা লবিং করতে পারছেন না, তারা সুবিধা পাচ্ছেন না। অথচ, প্রতিবেশি দেশগুলোও বিভিন্নভাবে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে। এমনকি একজন গৃহিণীকেও জীবিকা নির্বাহের জন্য তার হাতে থাকা স্বর্ণালংকারের মূল্যের ৯০ ভাগ অর্থ ব্যাংক থেকে দেওয়া হচ্ছে।

আপদকালীন এই সময়ে সবাইকে বাঁচিয়ে রাখতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গাড়ি-বাড়িতে ঋণ নিয়েছেন এমন গ্রাহকদেরও ঋণ পুনর্গঠন করে কিস্তি পরিশোধের সময় বৃদ্ধি এবং সুদ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রেস পিরিয়ডও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এক কথায় ব্যক্তিগত ঋণ, অতিক্ষুদ্র থেকে মাঝারি, বড় সব উদ্যোক্তার জন্যই আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নেওয়া উদ্যোগগুলো উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।

প্রণোদনা প্যাকেজ কেন দরকার:

দেশে করোনা শুরু হয়েছে মার্চ থেকে। এখন জুলাই। এ তিন-চার মাসে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই দুরূহ হয়ে পড়েছে। কলকারখানার চাকা ঘুরছে না। স্থবির হয়ে পড়ছে সব কার্যক্রম। এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে। ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে টেনে তুলতেই ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ’ জরুরি হয়ে পড়ে। কেউ কেউ এটিকে ‘বেইল আউট প্যাকেজও’ বলে থাকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ১৯টি প্যাকেজের আওতায় ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। যার মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই ৭৬ হাজার কোটি বা চার ভাগের তিন ভাগ অর্থ বিতরণ করা হবে। অর্থাত্ এ প্রণোদনা দেওয়ার মূল দায়িত্বই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর। কিন্তু প্যাকেজ ঘোষণার কয়েক মাস হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো ঋণই দিতে পারেনি ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলো অজুহাত দিচ্ছে যে, ঋণের আবেদন যাচাইবাছাই করতে বেশ সময় লেগে যাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ অনুমোদন হয়েছে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। বিতরণ হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা।

বড়দেরই সুবিধা: ক্ষুদ্র-মাঝারিদের নেই গুরুত্ব

খাতভিত্তিক বড়, ছোট ও মাঝারি—সবার জন্যই ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেজ দেওয়া হয় এবং এসব প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট দূর করতে বেশকিছু সুবিধাও প্রদান করা হয়। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সে উদ্দেশ্যই ভেস্তে যেতে বসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এ অর্থ ‘ভাগাভাগি’ হচ্ছে এমনভাবে যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারিদের গুরুত্বই থাকছে না।

এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বড় তথা প্রভাবশালীরা বরাবরই ব্যাংক থেকে নানা সুবিধা পেয়ে থাকেন। ঋণপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে সুদ মওকুফ, ঋণ ফেরতে ৩০ বছর পর্যন্ত বর্ধিত সময়, খেলাপি হলেও মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে নিয়মিতকরণসহ নানা সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু ছোট ও মাঝারিরা সবসময়ই বিপাকে। ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে গিয়ে নিজেরাই নিস্ব হয়ে যাচ্ছেন। অথচ সারা বিশ্বে এই ছোট ও মাঝারিদের অনেক কদর। এদেরকে এগিয়ে নিলে অর্থনীতি এগুবে—অন্যথায় নয়।

উদ্যোক্তারা যা বলছেন:

উদ্যোক্তারা বলছেন, আশ্বাস দিতে দিতে তো শিল্পই শেষ হয়ে যাবে। এখন টাকার প্রয়োজন। এখন না দিয়ে পরে দিলে তো কোনো কাজে লাগবে না। এখন আপত্কালীন সময়। এই বিশেষ সময়ে ব্যাংকগুলোর বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত ঋণ বিতরণ করা উচিত। এমনকি যারা ব্যবসায় লোকসান করে খেলাপি হয়ে গেছে, তাদেরও ঋণসহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্বজুড়ে তেমনটিই করা হচ্ছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতার কথা উল্লেখ করে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ সময় তিনি যেসব ব্যাংক অসহযোগিতা করছে সেগুলো থেকে সরকারি আমানত উত্তোলন করে নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি শামস মাহমুদ ইত্তেফাককে বলেন, এ মুহূর্তে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না বলে প্রচুর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ঋণ প্রাপ্তি আরো সহজ করার জন্য ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ডিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে ঋণ সমস্যা সমাধানের জন্য একটি হেল্প ডেস্ক খোলা হয়েছে বলেও জানান এ ব্যবসায়ী।

বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যাংকগুলো সরকারের কাছ থেকে বেশ কিছু সুবিধা নিলেও উদ্যোক্তাদের ঋণসহায়তা দিচ্ছে না। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সুস্পষ্ট যে, মন্দা আরো গভীর হবে। সেক্ষেত্রে ঘোষিত প্যাকেজের অর্থ মোটেই যথেষ্ট নয়। সার্বিকভাবে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে ক্রেতাভোক্তা থেকে শুরু করে উত্পাদক পর্যন্ত নগদ অর্থজোগান দরকার। তা না হলে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। তিনি ব্যাংকগুলোকে অসহযোগিতার বদলে জাতীয় স্বার্থেই ঋণসহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবু ফারাহ মো. নাসের বলেন, কোভিড পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার জন্যই মূলত প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাংকসমূহকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

আগস্টের মধ্যে প্যাকেজের সব ঋণ বিতরণের নির্দেশ:

প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ব্যাংকগুলোকে বারবার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। সে সবও আমলে নিচ্ছে না ব্যাংকগুলো। গত জুলাইয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে আগস্টের মধ্যে প্যাকেজের সব ঋণ বিতরণ করতে হবে। ওইদিন গভর্নর ফজলে কবির ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ঋণ বিতরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে প্রণোদনা প্যাকেজে ঋণের অগ্রগতি জানাতে প্রতি ১৫ দিন অন্তর বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। আগে যা এক মাসে একবার দিতে হতো।

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত