সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ছে

রাজস্ব আয় ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে
সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ছে
ছবি: সংগৃহীত

এক সময় সঞ্চয়পত্র বেশি বিক্রি হওয়ায় সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রমের ব্যয় মিটে যেত। ফলে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের প্রয়োজন হতো না। তবে সঞ্চয়পত্র বিক্রির কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাত থেকে ধার করে সরকারকে চলতে হচ্ছে। করোনার প্রভাবে মানুষের হাতে টাকা না থাকায় সঞ্চয়পত্র কিনতে পারছে না। অবশ্য করোনার আগ থেকেই সঞ্চয়পত্র বিক্রির প্রবণতা দেখা যায়। এর কারণ হিসাবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন যে, সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে কড়াকড়ির কারণেই এমন হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের প্রথম ২৬ দিনে ব্যাংক থেকে নিট ৬ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এতে এ সময়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। গত ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। ঋণের এই অঙ্ক আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১০৯ শতাংশ বেশি।

রাজস্ব আদায়ে নাজুক অবস্থা এবং সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমে যাওয়ায় গত অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের বেশি ঋণ নেওয়ার প্রবণতা ছিল। তার মধ্যে অর্থবছরের শেষ দিকে এসে করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে অর্থনীতির সব হিসাব এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় সেই ঋণনির্ভরতা আরো বেড়ে গেছে। নতুন অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমেছে ৭১ শতাংশ

২০১৯-২০ অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা ছিল। তবে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৮২ হাজার ৪২১ কোটি টাকা করা হয়। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির ঘোষণায় বলা হয়, অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। যার মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ ও ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুনে সেই প্রবৃদ্ধি আরো নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে। এটি চলতি মুদ্রানীতিতে প্রক্ষেপিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ কম। এটি এ যাবত্কালের সর্বনিম্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এত দিন সরকারের বাজেট ঘাটতির বড় অংশই জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে জোগান হচ্ছিল। ফলে সরকারকে আর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার দরকার হচ্ছিল না। সঞ্চয়পত্রে সরকারকে সুদ বাবদ দ্বিগুণ ব্যয় করতে হয়। ফলে তাতে সরকারের ওপর চাপ বাড়ে। এ জন্য সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ না নেওয়ার জন্য সঞ্চয়পত্রে নানা কড়াকড়ি আরোপ করে। অন্যদিকে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ঋণ পায় না। ফলে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

অবশ্য অর্থমন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অর্থ ছাড় করতে সময় লাগে, দৈনন্দিন কাজে অর্থের প্রয়োজন হয়; কিন্তু শুরুতেই আয় হয় না। তাই সবসময় অর্থবছরের শুরুর দিকে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়ে। বিভিন্ন প্রকল্প ও বরাদ্দের অর্থ পাওয়ার পর সেখান থেকে প্রয়োজন মেটানো ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা হয়, যার ফলে শুরুতে বাড়লেও পরবর্তী সময়ে তা কমে যায়। তারা জানান, মূলত বড় বড় প্রকল্প যেমন পদ্মা সেতু, এলএনজি টার্মিনাল, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অগ্রগতির ফলে সরকারের প্রচুর নগদ অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত