প্রণোদনা :স্বস্তির বদলে আস্থা ও প্রত্যাশার সংকট

আসছে ঘুষ প্রসঙ্গ, নীতিমালায় সংস্কার চান ব্যবসায়ীরা
প্রণোদনা :স্বস্তির বদলে আস্থা ও প্রত্যাশার সংকট
প্রতীকি ছবি।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) বলেছিল, বছরে বিশ্বে পণ্য বাণিজ্য ১৩ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পরিস্থিতির যদি আশাব্যঞ্জক উন্নতি হয়, সেক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ কমবে। কিন্তু মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে তা ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তখন পরিস্থিতি এমন খারাপ ছিল না। তবু পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, অর্থনীতির সব ক্ষেত্রেই বাণিজ্য কমবে, অটোমেশনের মতো জটিল সরবরাহব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাস্তবে এখন পরিস্থিতি আরো খারাপ। দীর্ঘ মেয়াদে করোনার নেতিবাচক প্রভাব সব খাতে। এর মধ্যে উদ্যোক্তা-বিশ্লেষকরা বলছেন, মন্দা আরো প্রলম্বিত হবে। যদিও রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পনির্ভর হওয়ায় কেউ কেউ আশাবাদী হয়ে উঠছেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম রিটেইল জায়ান্ট জেসিপেনি যখন দেউলিয়া হওয়ার আবেদন করে তখন সেই স্বস্তিতে থাকার কোনো অবকাশ নেই। অভ্যন্তরীণভাবে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের নেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজেরও সঠিক বাস্তবায়ন নেই। ধরনের পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা ঘিরে বসে ব্যবসায়ীদের, বেড়ে যায় আস্থার সংকট।

এমসিসিআই প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার নিহাদ কবিরের মতে, প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণাটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু এর বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে একটি অস্পষ্ট বার্তা গেছে যেটি ব্যবসায়ীদের ব্যবসাসংক্রান্ত আস্থা প্রত্যাশায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণসহায়তা সবাই তো পাচ্ছেই না, বরং ঋণ পেতেঘুষচাওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণসুবিধা পেতে হলে ব্যাংক কর্মকর্তাদের খুশি করতে হবে। তাই অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। আবার অনেক খাত প্যাকেজের বাইরে রয়ে গেছে। এক জরিপেও দেখা গেছে, ২৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী প্রণোদনার অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা কর্তৃক ঘুষ চাওয়ার কথা বলেছেন যা প্যাকেজ বাস্তবায়নে অন্যতম অন্তরায়।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বিদ্যমান নীতিমালায় সংস্কার আনার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, যারা সুবিধার দাবিদার, তারা পাচ্ছেন না। এছাড়া ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তাদের যে অংশ এই ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে আছেন, তাদের বিষয়টি দেখা দরকার।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা . মসিউর রহমানের মতে, যাদের জন্য প্রণোদনা সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তাদের কাছে যাচ্ছে কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেখা দরকার। কোনো ব্যত্যয় হলে যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ সদ্ব্যবহার করা গেলে এবং সময়মতো ঋণসহায়তা পেলে ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হতো। কিন্তু ব্যাংকগুলো তা বুঝতে চাইছে না বরং যাচাইবাছাইয়ের নামে কালক্ষেপণ করে দিন পার করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইত্তেফাককে বলেন, কেউ অপ্রয়োজনে ঋণ নিলে তা ফেরত দেবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক প্যাকেজে পুনঃ অর্থায়ন করলেও তা আদায় করতে হবে ব্যাংকগুলোকেই। সেজন্যই এত যাচাইবাছাই।

কিন্তু ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে যা- বলা হোক না কেন, কোভিড-১৯ অতিমারির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ব্যবসার ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছেই। ব্যবসায়ীদের আস্থা প্রত্যাশার ওপরে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সরকার অর্থনীতি চাঙ্গা করতে যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, তাতে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৮৪ শতাংশ বলেছেন, তাদের খাতের জন্য কোনো বরাদ্দ ছিল না। ৮০ শতাংশ মনে করেন, এটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া এবং ৭৮ শতাংশ মনে করেন, ব্যাংক সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সুবিধা নেওয়া যাচ্ছে না।

জরিপ রিপোর্টের এই তথ্য উদ্যোক্তাদের বক্তব্যে প্রকৃত চিত্র উঠে আসে যে, প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ সবাই পাচ্ছে না যা উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় আস্থা সূচককে ঋণাত্মক করেছে। অথচ সরকার এই প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলোকে বেশ কিছু সুবিধা দিয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেবাংলাদেশ ব্যাংক নগদ জমার হার (সিআরআর) শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। আবার ঋণ আমানত অনুপাত সীমা (এডিআর) শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। নীতি সুদহার বা রেপো দশমিক ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্যের জোগান বেড়েছে।

তদুপরি ১৯টি প্যাকেজের মধ্যে প্রায় সবগুলোতেই পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে টাকা দেবে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক। মোট প্রণোদনা প্যাকেজের প্রায় অর্ধেকই আসবে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে। করোনার অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বড় শিল্প সেবা খাতের জন্য চলতি মূলধন বাবদ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং এসএমই খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণের সুদের অর্ধেক পরিশোধ করবে সরকার, বাকি অর্ধেক গ্রাহক। ব্যাংকগুলোতে যাতে তারল্যসংকট না হয়, সে জন্য বড় অঙ্কের পুনঃ অর্থায়ন তহবিলও গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এতসব সুবিধার পরও ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতায় প্রণোদনা প্যাকেজের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে, সামনের দিনগুলো নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ বিজনেস কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান লাইট ক্যাসল পার্টনার্স (এলসিপি)- তথ্যেও দেখা যায়, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় আস্থা সূচক মাইনাস ১৯ দশমিক ২৭ পয়েন্টে নেমে আসে। অথচ ২০১৮ সালের একই সময়ে বেসরকারি খাতে এই সূচক ছিল প্লাস ৪৩ পয়েন্ট। তাই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে এখনই।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত