চক্রবৃদ্ধি সুদহার একটি জটিল বিষয়

চক্রবৃদ্ধি সুদহার একটি জটিল বিষয়
চক্রবৃদ্ধি সুদহার। ছবি: প্রতীকী

ব্যাংকিং সেক্টরে চক্রবৃদ্ধি সুদহারের নেতিবাচক প্রভাব এবং এর ক্ষতিকর দিক নিয়ে ইত্তেফাক পত্রিকায় (২ সেপ্টেম্বর, ২০২০) একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি নানা কারণেই বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।

চক্রবৃদ্ধি সুদহার ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য একটি ‘দুষ্টক্ষত’ হিসেবে অনেক দিন ধরেই বিদ্যমান রয়েছে। চক্রবৃদ্ধি সুদহার সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের ‘নিঃশব্দ ঘুণে পোকার মতো কুরে কুরে খাচ্ছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে যদিও চক্রবৃদ্ধি সুদহার নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়নি, তবুও বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসা হয়েছে এটাই বা কম কীসের?

করোনা সংক্রমণকালীন সময়ে ঋণগ্রহীতাদের নিরাপত্তা বিধানকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংক শিডিউল ব্যাংকসমূহকে বেশ কিছু ইতিবাচক নির্দেশনা দিয়েছে। যেমন—ঋণের কিস্তি পরিশোধে অপারগ উদ্যোক্তাদের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঋণখেলাপি না করা, ঋণের ওপর আরোপিত সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ এবং আমাদের ওপর প্রদেয় সুদের সর্বোচ্চ হার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে সাড়ে ৫ শতাংশ এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়া ইত্যাদি।

যদিও অনেক ব্যাংক এখনো এসব নির্দেশনা পুরোপুরি পরিপালন করেনি। এমনকি ব্যাংকগুলোকে করোনাকালীন সময়ে বিভিন্ন সেক্টরের জন্য যে আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কার্যকর করা হয়নি। এসব প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের জন্য চক্রবৃদ্ধি সুদহারের পরিবর্তে সরল সুদ আরোপের ইস্যুটি আলোচনায় এসেছে।

চক্রবৃদ্ধি সুদ কী তা উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারে: মনে করি মি. করিম কোনো একটি ব্যাংক থেকে বার্ষিক ১০ শতাংশ সুদ প্রদানের শর্তে ১০০ টাকা ঋণ গ্রহণ করলেন। চারটি ত্রৈমাসিক কিস্তিতে এই ঋণ পরিশোধ করবেন। প্রতি কিস্তি হতে পারে সাড়ে চার টাকা (দুই টাকা আসল + ২.৫০ টাকা সুদ = ৪.৫০ টাকা)। কিন্তু মি. করিম যে কোনো কারণেই হোক, প্রতি ত্রৈমাসিকে দুই টাকা পরিশোধ করতে সমর্থ হলেন। তাহলে এই দুই টাকা তার পাওনার সুদের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা হবে। তাহলে বছরান্তে মি. করিমের কাছে ব্যাংকের পাওনা মোট সুদের পরিমাণ কমে দাঁড়াবে দুই টাকা। কারণ তিনি যে আট টাকা পরিশোধ করেছেন তা সুদের সঙ্গে সমন্বয় করার পর আরো দুই টাকা সুদ থেকে যাবে।

পরের বছর ব্যাংক মি. করিমের কাছে ১০০ টাকা মূল ঋণ + দুই টাকা অনাদায়ী সুদ অর্থাত্ মোট ১০২ টাকার ওপর সুদ আরোপ করবে। পরবর্তী বছর আবারও যদি তিনি আট টাকা পরিশোধ করেন তাহলে সেই বছরের জন্য ব্যাংক মোট ১০৪ টাকার ওপর সুদ আরোপ করবে। অর্থাত্ ব্যাংক প্রদত্ত ঋণের ওপর আরোপিত সুদ পুরোটা আদায় না করে মূল ঋণাঙ্ক এক টাকাও কমাবে না। এভাবে একজন ঋণগ্রহীতা বছরের পর বছর কিস্তি পরিশোধ করেও ঋণের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পান না। অথচ ব্যাংক যদি সিম্পল ইন্টারেস্ট রেট প্রয়োগ করত তাহলে এই সমস্যা থেকে সহজেই একজন ঋণগ্রহীতা মুক্তি পেতে পারত। ঋণগ্রহীতার ঋণের কিস্তি পরিশোধ অধিকতর সহজীকরণ করা সম্ভব হতো। এতে ঋণগ্রহীতার খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যেত। অথচ ঋণ পরিশোধের এই পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে ঋণ আদায় কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।

খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন আইনি সুবিধা দিয়ে যেভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে তা মোটেও কাম্য হতে পারে না। কারণ এতে শুধু ব্যাংকের লেজার ক্লিন দেখানো যাবে কিন্তু কোনোভাবেই খেলাপি ঋণ আদায় হবে না। কৌশল প্রয়োগ করে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। বরং কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনাটাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।

প্রশ্ন হলো, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো সহজ উপায় আছে কি? আমরা কি চেষ্টা করলে চক্রবৃদ্ধি সুদহার থেকে ঋণগ্রহীতাদের মুক্তি দিতে পারি না? উল্লেখ্য, বর্তমানে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণকে কোনো দয়া বা করুণা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। বরং এটা একজন উদ্যোক্তা বা ঋণগ্রহীতার একধরনের রাষ্ট্রীয় অধিকার। কারণ একজন উদ্যোক্তা ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে তার নিজের আর্থিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাই প্রতিটি দেশেই একজন সত্ ও ভালো উদ্যোক্তাকে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির (সিআইপি) মর্যাদা দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে সম্ভাবনাময় অনেক উদ্যোক্তা এবং ঋণগ্রহীতা খেলাপিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছেন।

ঋণখেলাপি কালচারের জন্য শুধু ঋণগ্রহীতা এককভাবে দায়ী নন। ব্যাংকের একশ্রেণির অসত্ এবং অর্থলোভী কর্মকর্তাও কম দায়ী নন। অথচ ঋণখেলাপির পুরো দায়ভার ঋণগ্রহীতাকেই বহন করতে হয়। ব্যাংকের ঋণ হিসাব কার্যক্রমে নানা ধরনের মারপ্যাঁচ আছে। এসব মারপ্যাঁচের কারণে গ্রাহক অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হন। অথচ এসব গ্রাহকের প্রতি সহানুভূতি দেখানো হলে তারা ভালো গ্রাহক হিসেবে অবদান রাখতে পারেন। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, চক্রবৃদ্ধি সুদহার থেকে গ্রাহককে উদ্ধার করার জন্য কী করা যেতে পারে? ঋণ হিসাব ক্যালকুলেট করার পদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমে খুব সহজেই এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো যেতে পারে।

একজন ঋণগ্রহীতা প্রতি ত্রৈমাসিকে বা বছরে যে টাকা ব্যাংকে পরিশোধ করবে তা প্রথমেই তার কাছে পাওনা মূল ঋণ বা প্রিন্সিপাল লোনের সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে। আরোপিত কিন্তু অনাদায়ি সুদ একটি সুদবিহীন ব্লক অ্যাকাউন্টে রাখা যেতে পারে। মূল ঋণ পুরোটা পরিশোধিত হওয়ার পর ব্লক অ্যাকাউন্ট থেকে সুদ সমন্বয় করা যেতে পারে। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মি. করিম প্রথম বছর যে আট টাকা ব্যাংকে জমা দিলেন তা তার মূল ঋণের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করতে হবে। তার অ্যাকাউন্টের ওপর আরোপিত ১০ টাকা সুদ ব্লক অ্যাকাউন্ট থাকবে। তাহলে পরবর্তী বছর ব্যাংক তার মূল ঋণ ৯২ টাকা (১০০ টাকা-আট টাকা = ৯২ টাকার) ওপর সুদ আরোপ করবে।

দ্বিতীয় বছর তিনি আরো আট টাকা পরিশোধ করলে তার মূল ঋণ কমে আসবে ৮৪ টাকায়। এভাবে একসময় তার মূল ঋণের পুরোটাই সমন্বয় হয়ে যাবে। মূল ঋণ সমন্বয় সাধিত হওয়ার পর ব্যাংক মি. করিমের নামে সুদবিহীন ব্লক অ্যাকাউন্টে টাকা সমন্বয় করবে। এটা করা হলে গ্রাহক কিছুটা হলেও চক্রবৃদ্ধি সুদের হাত থেকে রেহাই পাবেন। অনেকেই বলে থাকেন আগে প্রিন্সিপাল লোনের সঙ্গে কিস্তি সমন্বয় করা হলে ব্যাংক আর্থিকভাবে কিছুটা হলেও ক্ষতির মুখোমুখি হবে। ব্যাংক কিছুটা কম লাভ করলেও অ্যাকাউন্ট ক্লিন রাখাটা কি বেশি জরুরি নয়?

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত