করোনার সুবিধায় কমেছে খেলাপি ঋণ

খেলাপি ঋণ এখন ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা
করোনার সুবিধায় কমেছে খেলাপি ঋণ
প্রতীকী ছবি

করোনার কারণে বিশেষ সুবিধা এবং ছাড় দেওয়ার ফলে কমে এসেছে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ। তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা কমে ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বর মাস শেষে ছিল ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে শুরু হয় মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপ। এর প্রভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেরও নানা খাতে সংকট তৈরি হয়। এই সংকটকালে ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দেয় সরকার। এই সুবিধার ফলে ডিসেম্বর পর্যন্ত কিস্তি না দিলেও খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়নি তারা।

২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা সেই নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের কোনো কিস্তি পরিশোধ না করলেও গ্রহীতা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবেন না। এই সময়ের মধ্যে ঋণ বা বিনিয়োগের ওপর কোনো রকম দণ্ড, সুদ বা অতিরিক্ত ফি (যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন) আরোপ করা যাবে না।

এর আগে ২০১৯ সালের ১৬ মে ঋণখেলাপিদের মোট ঋণের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেয় সরকার। সরকারের দেওয়া ‘বিশেষ’ ঐ সুবিধার আওতায় গত বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলো নবায়ন করে, যার অর্ধেকই করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো।

এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েও গত বছর বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিল করা হয়েছে, যার পরিমাণ ৭৫ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে গত বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ অবলোপন (রাইট অফ) করেছে ব্যাংকগুলো। অর্থাত্, এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হিসাব থেকে এই অর্থ বাদ যাবে, যদিও তা শিগিগরই ফেরত আসছে না ব্যাংকগুলোর কাছে। এরপর গত বছরের শুরুতে করোনা শুরু হওয়ার পর আইনগত সুবিধার কারণে কোনো ঋণই খেলাপি হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। রাইট অফ করা ঋণ খেলাপি ঋণের সঙ্গে যোগ করলে মোট খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। এ সময় রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণ ২ লাখ ২ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের ২০২০ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬১ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংগুলোতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৪০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। আর দেশে পরিচালিত বিদেশি মালিকানার ব্যাংকগুলো ২০২০ সাল শেষে মোট ৮৫ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা বিতরণ করে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা।

ঋণ শ্রেণীকরণের তিনটি ধাপ। সেগুলো হলো—সাব-স্ট্যান্ডার্ড, সন্দেহজনক এবং মন্দমান। সব ধরনের চলতি ঋণ, ডিমান্ড ঋণ, ফিক্সড টার্ম লোন অথবা যে কোনো ঋণের কিস্তি তিন মাসের বেশি, কিন্তু ৯ মাসের কম অনাদায়ী থাকলে তা সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণ হিসেবে হিসাবায়ন করা হয়। ৯ মাসের বেশি কিন্তু ১২ মাসের কম অনাদায়ী থাকলে তা ডাউটফুল লোন বা সন্দেহজনক ঋণ হবে। আর ১২ মাসের বেশি অনাদায়ী ঋণ ব্যাড ডেবট বা মন্দ ঋণ হবে।

নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। নিম্নমান বা সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে রাখতে হয় ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে এই প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়। খেলাপি ঋণ বাড়লে আর সে অনুযায়ী ব্যাংকের আয় না হলে প্রভিশন ঘাটতি দেখা দেয়।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x